Advertisement

কাহিনী (চতুর্থ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চতুর্থ পর্ব


— 'ওরে আমার কোশ্চেন ব্যাঙ্ক, সব উত্তর দেব, আগে ওইদিকে দেখ।' 

কাহিনী একেবারে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে ছিল। রুমকির কথা ও এতটাই অবাক হয়ে শুনছিল যে ও যে এগোতে এগোতে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে তা ও খেয়ালই করেনি। রুমকির কথায় ও যেই খাদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছে, অমনি রুমকি আর হিয়া পিছন থেকে ধাক্কা দিল ওকে। কাহিনী টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল গভীর খাদে। রুমকি হাসতে লাগল, 'বাই বাই আমার প্রিয় বোন, এবার সব সম্পত্তি শুধু তোর্সা চৌধুরীর, কাহিনী চৌধুরী আজ মৃত, মৃত, মৃত! উফ কতদিন ধরে যে এই দিনটার অপেক্ষায় আছি আমি!' 

— 'শুধু কি আপনি রুমকি দি? ওই কাহিনীটা সেই ক্লাস ওয়ান থেকে কম জ্বালিয়েছে আমায়! সবাই শুধু ওকে নিয়ে ন্যাকামি করত, আমার দিকে কেউ ফিরেও তাকাত না! কেন? কি আছে ওই ফালতু মেয়েটার মধ্যে? ফাইনালি আমি শান্তিতে বাঁচতে পারব!' 

— 'হ্যাঁ হিয়া, একদম ঠিক বলেছ তুমি। দাঁড়াও ওদিকে মা অপেক্ষা করছে, মা কে সবটা জানাই আমি আগে।'

_________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________


কাকলি দেবী সবটা শুনে ভীষণ খুশি হলেন, 'পথের কাঁটাটা সরল তাহলে রাস্তা থেকে!'

ফোনটা রেখে রুমকি বলল, 'তোমার মনে আছে তো হিয়া এবার কি করতে হবে?' 

— 'আছে রুমকি দি, এবার আমায় কাহিনী হয়ে চৌধুরীবাড়িতে এন্ট্রি নিতে হবে, তাই তো?' 

— 'একদম তাই! এই নাও, কাহিনী যে ধরণের জামাকাপড় পরে সেরকমই একটা জামা এনেছি তোমার জন্য, চটপট রেডি হয়ে নাও। আর শোনো হিয়া, কাহিনী চৌধুরীবাড়িতে বড়ো হয়নি ঠিকই, কিন্তু বীণামাসির দৌলতে বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষকে ও চেনে। আমি ফ্যামিলি অ্যালবাম নিয়ে এসেছি, কলকাতায় পৌঁছানোর আগেই চৌধুরীবাড়ির প্রত্যেকটা মানুষকে তোমায় চিনে রাখতে হবে, রীতিমতো মুখস্থ করে রাখতে হবে। পারবে তো?' 

— 'রুমকিদি, আমি ক্লাসের সেকেন্ড স্টুডেন্ট, কোনো ফেল করা ব্যাকবেঞ্চার নই যে এই সামান্য ব্যাপারগুলো আমার মনে থাকবে না!'

— 'আচ্ছা বেশ বেশ, কনফিডেন্স ভালো, ওভার কনফিডেন্স না! তুমি যেমন বোকা নও, চৌধুরীবাড়ির মানুষগুলোও বোকা নয়, যদি ধরা পড়ো না, তাহলে আমরা দুজনে ডুবব তো বটেই, সাথে জেলেও যেতে হবে!' 


হিয়া চুপচাপ শুনছিল রুমকির কথাগুলো। রুমকি বলে যেতে লাগল, 'আর আমায় সব সময় আপনি আজ্ঞে না করে তুমি করে বলা প্র‍্যাকটিস করো যাতে বাড়িতে কখনো ভুল না হয়, ওকে?' 

— 'ওকে বস।' 


আসলে রুমকির উদ্দেশ্য, যখন সম্পত্তি ভাগ বাঁটোয়ারা হবে, তখন কাহিনীর প্রাপ্য ভাগটা হিয়া নিয়ে রুমকিকে দিয়ে দেবে, তার পরিবর্তে হিয়া পাবে মোটা অংকের টাকা, আর সেই সাথে চৌধুরী বাড়ির মতো এক খ্যাতনামা পরিবারের মেয়ের পরিচয়, আর একটা বিলাসবহুল জীবন। 


খাদে পড়ে থাকা কাহিনীর জ্ঞানহীন রক্তাক্ত শরীরটার দিকে তাকিয়ে ক্রূর হাসি হেসে সেখান থেকে চলে গেল রুমকি আর হিয়া। 


রাত শেষ হল। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই মনোরমা আগুন জ্বালানোর জন্য কাঠ, শুকনো পাতা জোগাড় করতে বেরিয়ে পড়ল। কাহিনীকে যে পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকেই কিছুটা দূরে যে প্রত্যন্ত গ্রাম আছে, সেখানেই বাস করে মনোরমা আর তার স্বামী উৎপল। উৎপল ভ্যান চালানোর কাজ করে, আর মনোরমা বাড়ি বাড়ি কাজ করে যেটুকু টাকা আয় করে তাতে দুটো পেট কোনোরকমে চলে যায়। 


অন্যদিনের মতো সেদিনও মনোরমা কাকভোরে বেরিয়ে পড়েছে কাঠ, শুকনো পাতা জোগাড় করতে। যে খাদে কাহিনী পড়ে ছিল, সেই খাদে এসেই ও দেখতে পেল কাহিনীর রক্তাক্ত জ্ঞানহীন শরীরটা। দেখেই চমকে উঠল ও। চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করল ও, তারপর কাহিনীকে নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে। 


— 'ডাক্তারবাবু, কেমন দেখলেন ওকে? বাঁচবে তো?' শঙ্কিত মনোরমা জিজ্ঞেস করল।

— 'দেখুন, সেটা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে যেহেতু গাছের ডালে ওর ওড়না জড়িয়ে গিয়েছিল, তাই খাদের গভীরে ও পড়ে যায়নি, তাই মারাত্মক চোট ও পায়নি, তবে মাথার আঘাতটা বেশ গুরুতর, তাই কিছুটা ভয় তো থেকেই যাচ্ছে।' 

— 'কি রকম ভয় ডাক্তারবাবু?' 

— 'ও যদি বেঁচেও যায়, মেমরি লস হওয়ার একটা চান্স তো রয়েই যাচ্ছে।' 


ডাক্তারের কথাটাই পুরোপুরি ফলে গেল। বেশ কিছুদিন চিকিৎসা চলার পর কাহিনী সুস্থ হয়ে উঠল ঠিকই, কিন্তু সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলল সে। 


— 'কি আবোলতাবোল বকছ তুমি? একটা অচেনা অজানা মেয়ে, তাকে তুমি নিজের মেয়ের পরিচয়ে এবাড়িতে রাখবে? দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনো বড়োলোক ঘরের মেয়ে ও, শেষে ওর বাড়ির লোক যদি কোনো ঝামেলায় ফেলে আমাদের, কি করবে তখন তুমি?'

— 'থাক থাক, থামো তুমি। ওর বাড়ির লোক যে কত ভাবে ওকে নিয়ে সেটা এই এক হপ্তায় হাড়ে হাড়ে বুঝলাম। পুলিশকে তো হাসপাতালে ভর্তি করার সময়ই খবর দেওয়া হয়েছিল, পুলিশ খুঁজে পেয়েছে ওর বাড়ির লোককে?'

— 'আরে বাবা, এখনও কেউ ওর খোঁজ করেনি মানে কি কোনোদিনই খোঁজ করবে না?'

— 'মেলা তর্ক কোরো না বুঝলে শিউলির বাপ। মেয়েটার মুখখানা দেখেছ? কি অসম্ভব মায়াজড়ানো, একেবারে আমাদের শিউলিটার মতো।' 

— 'যে বরাবরের মতো চলে গেছে আমাদের ছেড়ে, তাকে নিয়ে আর কেন...' 

— 'কে বলেছে চলে গেছে? আমার মেয়ে মরেনি গো, মরেনি। পরশুই তাকে আমি ফিরিয়ে আনব আমার সংসারে।' 


মনোরমার মেয়ে শিউলি গতবছর ব্রেন টিউমারে মারা গেছে, সন্তানহারা মা তাই মেয়ের বয়সী আরেক অসহায় মেয়েকে বুকে টেনে নিল। মনোরমাদের দরমা দেওয়া বাড়িতে যেখানে যেখানে শিউলির ছবি ছিল, সব লুকিয়ে রাখল মনোরমা। কাহিনীকে সে ঘরে তুলল তার মেয়ে শিউলির পরিচয়ে। কাহিনীর যেহেতু অতীতের কোনো কথাই মনে ছিল না, তাই সে মনোরমার সব কথা বিশ্বাস করল। উৎপলের একদমই সমর্থন ছিল না এসবে, কিন্তু স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা তাকে কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে দেয়নি, তাই উৎপলকে কাহিনী নিজের বাবা হিসেবে চিনল।


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : পঞ্চম পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ