অণুগল্পের সংগ্রহ (১)
১)
রংবদল
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'এই যে কাকা,দেখো অনেকবার ভালোভাবে বলেছি বাড়িটা ছেড়ে দাও।এখানে ফ্ল্যাট উঠবে।আশি লাখ তো দেব বললাম,সেই সাথে দুটো ফ্ল্যাটও।'
— 'অনির্বাণ,একটা সময় তুই আমার ডানহাত ছিলি,মনে পড়ে?কত টাকা খেয়েছিস আমার হয়ে ছাপ্পা দেবার জন্য,আজ যেই দল পাল্টালো অমনি তুইও পাল্টালি?'
— 'শোনো কাকা,সেদিন মন্ত্রী তুমি ছিলে,তোমার হাতে বহুত পাওয়ার ছিল,টাকাও পেতে উপরি,তাই সেদিন তোমার সাথে ছিলাম।কিন্তু আজ দল পাল্টেছে,তোমার সাথে থেকে কি লাভ বলোতো?আর শিরীষবাবু তোমার চেয়েও বেশি টাকা দেয় আমায় ছাপ্পা দেওয়ার সময় গুন্ডামো করার জন্য,বুঝলে?'
— 'বাহ,রে বাহ!তোরা আসলে শয়তানের বাচ্চা,টাকা পেলে নিজের বাবাকেও ছেড়ে দিতে পারিস,বল্?'
— 'দেখো কাকা,নীতিকথা অন্যকোথাও শুনিও।টাকা ছাড়া কি আছে লাইফে বলোতো?নেহাত তুমি আমার পরিচিত বলেই না এখনও ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করিনি বাড়িটা থেকে।শোনো,দশটা দিন সময় দিলাম,এ বাড়ি খালি করতেই হবে।শিরীষবাবুর প্রোমোটারের কাছ থেকে দু লাখ খেয়েছি,পরে আরও দেবে বলেছে।'
অনির্বাণ চলে যাওয়ার পর সুরেশবাবু ভাবতে বসলেন,একদিন এই ছেলেটাকে দিয়েই কত মানুষের বাড়ি এইভাবে কমদামে নিয়ে নিয়েছিলেন জোর করে,ভিটেছাড়া করেছিলেন কত অসহায় মানুষকে।আজ তাঁর দল হেরে গেছে,তাই অনির্বাণও তাঁকে চেনে না আর।এই অনির্বাণ সেদিন তাকে আপনি,স্যর বলে সম্বোধন করত,কিন্তু আজ কাকা বলে,তুমি সম্বোধন করে।
২)
কনকাঞ্জলি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
কনকাঞ্জলির সময় তিতাসের বুক চাপড়ে কান্না দেখে রীতিমতো বিরক্তই হয়েছিল তার স্বামী অরুণাভ।
— 'বাড়ি ছাড়তে যখন এত মড়াকান্না,তো বিয়ে না করলেই হত।'
স্বামীর মুখে কথাটা শুনে এতটাই হকচকিয়ে গিয়েছিল তিতাস যে কাঁদতে ভুলে গিয়েছিল।
আজ তিতাস আর অরুণাভর মেয়ে কেয়ার বিয়ে। কিন্তু রাত যত বাড়ছে,একটা চাপা কান্না যেন দৈত্যের মতো অপ্রতিরোধ্যভাবে গলা-বুক ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে অরুণাভর,কিন্তু সে কাঁদলে যে কেয়াও কষ্ট পাবে,তাই সে প্রাণপণে নিজের দুঃখকে বন্দি করে রেখেছে।আজ বারবার নিজের বিয়ের সময়ের কথা মনে পড়ছে,আর তিতাসের কান্নাটাও।
৩)
অসুবিধা
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'বাবু,আমার প্রেসারের ওষুধটা ফুরিয়ে গেছে।অফিস থেকে ফেরার পথে নিয়ে আসিস না বাবা।'
— 'পারবোনা গো।আর কতদিনই বা বাঁচবে তুমি!তোমার পেছনে এত টাকা নষ্ট করতে পারব না।'
— 'বাবু আমি তোর মা!'
— 'তো?তুমিই তো আমায় শিখিয়েছিলে কাউকে হেল্প করতে গিয়ে যদি নিজের অসুবিধা হয়,সেই হেল্প যেন না করি।'
নিখিলেশের মা তখনও অবাকচোখে দেখছেন ছেলেকে,আর ভাবছেন তাঁর শ্বশুরের মৃত্যুসজ্জায় একই ব্যবহার করেছিলেন তিনি,নিখিলেশ তখন শিশু।বাইরে নিখিলেশের আট বছরের ছেলে তখনও দাঁড়িয়ে।
আরো পড়ুন : অণুগল্পের সংগ্রহ (২) , অণুগল্পের সংগ্রহ (৩)
0 মন্তব্যসমূহ