Advertisement

কাহিনী (পঞ্চম পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
পঞ্চম পর্ব


অন্যদিকে চৌধুরী বাড়িতে এখন বইছে খুশির হাওয়া। রুমকি হিয়াকেই কাহিনী হিসেবে পরিচয় দিয়েছে সকলের কাছে, আর সকলে সেটাই বিশ্বাস করেছেন। চৌধুরীবাড়ির কেবল তিনজনেই সত্যিটা জানে, কাকলিদেবী, রুমকি আর হিয়া।

— 'সত্যি মাইরি, ভাগ্যিস চুলটা কাহিনীর মতো লালচে কোঁকড়ানো বানিয়েছ, তাই তো এত সহজে এই বাড়ির লোকগুলোকে বোকা বানানো গেল!' হিয়ার পিঠ চাপড়ে বলল রুমকি।

হিয়া কিছু না বলে জয়লাভের হাসি হাসল।

_________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________


কেটে গেল কয়েকমাস। হিয়া আর রুমকির জীবন মসৃণভাবে চললেও কাহিনীর জীবনে নেমে এল এক বড়োসড়ো বিপর্যয়। পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হল উৎপলের। উৎপলই ছিল সংসারে আসল রোজগেরে, তাই তার মৃত্যুতে মাথায় হাত পড়ল মনোরমার। কিভাবে যে সংসারের খরচাপাতি জোগাড় হবে এই চিন্তাই কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল ওকে। প্রত্যন্ত গ্রামে বেশিরভাগ মানুষই গরীব, অল্প মধ্যবিত্ত কিছু বাড়িতে কাজ করে যে টাকাটুকু পায় ও তা সংসার চালানোর পক্ষে একেবারেই যথেষ্ট নয়। যখন মনোরমা এর ওর কাছে অনুরোধ করছে, বাড়ি বাড়ি ছুটছে বেশি মাইনের কাজের জন্য, তখনই ওর কাছে এল সুযোগটা। ওর কানে এল, কলকাতার এক বড় বাড়িতে রাঁধুনি খুঁজছে, যে রাঁধুনির কাজ করবে তাকে ওই বাড়িতে থাকতে হবে চব্বিশ ঘণ্টা। 


মনোরমা ঠিক করল, থাকা-খাওয়া ফ্রি যেখানে আর মোটা মাইনেও দেবে মাস গেলে, সেখানকার কাজটা ওকে যে করেই হোক নিতেই হবে। অনেক কষ্টে বাড়ির ঠিকানাটা জোগাড় করল ও। 

— 'শিউলি, তৈরি হয়ে নে মা।'

— 'এত সকালে তৈরি হতে বলছ যে মা? কোথায় যাব আমরা?'

— 'কলকাতার একটা বড় বাড়িতে রান্নার কাজের জন্য লোক খুঁজছে রে মা, মোটা মাইনে দেবে সাথে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করে দেবে, একবার যদি কাজটা পেয়ে যাই না মা, তাহলেই আর চিন্তা থাকবে না।' 


যে বাড়ির কথা বলছিল মনোরমা, সেটা আসলে আর কোনো বাড়ি নয়, চৌধুরী বাড়ি। 


কলকাতা পৌঁছানোর পর একটা হোটেলে খেতে ঢুকল মনোরমা আর কাহিনী ওরফে শিউলি। হোটেলে টিভি চলছিল, খেতে খেতে শিউলির চোখ গেল সেদিকে। টিভিতে দেখাচ্ছিল, একটা লোককে কিছু লোক মিলে পাহাড় থেকে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে খাদের দিকে। দৃশ্যটা দেখেই শিউরে উঠল শিউলি, মনোরমার আঁচল চেপে ধরল ও। 

— 'ওকে তো খাদেই পেয়েছিলাম আমরা, তাহলে কি ওকেও কেউ এইভাবেই ফেলে দিয়েছিল খাদে?' মনোরমার মনের অতল থেকে উঠে আসে প্রশ্নের বুদবুদ। 


মনে একরাশ প্রশ্ন নিয়েই মনোরমা শিউলির হাত ধরে রওনা দিল চৌধুরীবাড়ির পথে। 


চৌধুরীবাড়ির রান্নার কাজটা পাকা হয়ে গেল মনোরমার। বাড়ির একটা গেস্টরুমে থাকার ব্যবস্থা করা হল ওদের। সৌভাগ্যক্রমে রুমকি আর হিয়া ওই সময় বাড়িতে ছিল না, পার্টিতে গিয়েছিল ওরা, নইলে এত সহজে এই কাজটা পাকা হত না ওদের। শিউলির এই বাড়িটা, বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষজনকে খুব চেনা চেনা লাগছিল, তবে এই কথাটা ও কাউকেই জানাল না, এমনকি মনোরমাকেও না। তবু মনের মধ্যে একটা খুঁতখুঁতানি রয়েই গেল ওর। 


— 'এতটা রাস্তা এলে, দুপুরটা বিশ্রাম নিয়ে নাও, তারপর বিকেল থেকেই কাজে লেগে পড়ো, কেমন?' হেমনলিনী দেবী বললেন।

— 'তাই হবে গিন্নিমা।' 


দুপুরে শিউলির ভালোভাবে ঘুমই হল না। বারবার স্বপ্নে ঘুরেফিরে আসছিল টিভিতে দেখা দৃশ্যটা, আর সেই সাথে এই বাড়ির মানুষগুলোও। বাধ্য হয়েই শিউলি ঘরময় ঘুরে বেড়াতে লাগল। 


বাড়ির বড়ো ঘড়িটা জানান দিল, পাঁচটা বেজে গেছে। মনোরমা তখনও অঘোরে ঘুমোচ্ছে। শিউলি মনোরমাকে ডাকতে গিয়ে দেখে, গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। শিউলি ভয় পেয়ে গেল, কিন্তু ঘরের বাইরে গিয়ে ও কাউকেই দেখতে পেল না। মনে একরকম দ্বিধা নিয়েই ও বসার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল পায়ে পায়ে। বসার ঘরে গিয়েই ও মুখোমুখি হল সায়নীর। বাড়ির মধ্যে এই মানুষটিকে বড্ড বেশি আপন বলে মনে হল শিউলির, মনে হল এই মানুষটার কাছে মন খুলে দুটো কথা বলা যায়।


— 'এই মেয়ে, দাঁড়িয়ে কি অত ভাবছ?' 

সায়নীর কথায় ঘোর ভাঙল শিউলির। ও বলল, 'আসলে ম্যাডাম, মায়ের খুব জ্বর।' 

— 'ওহ এই কথা বলতে এত হেজিটেট করছ? এক মিনিট দাঁড়াও।' 

সায়নী একটা প্যারাসিটামল এনে শিউলির হাতে দিল, 'শোনো মেয়ে, ম্যাডাম ম্যাডাম করে ডেকো না তো, বড্ড অস্বস্তি হয় আমার। তুমি বরং আমায় ছোটমা বলে ডেকো।' 

— 'আচ্ছা।' শিউলি হেসে চলে গেল গেস্টরুমের দিকে। 


'এই মেয়েটার সাথে কথা বলে কেন জানিনা মনটা এক অজানা আনন্দে ভরে উঠল, ঠিক যেমনটা হয় কোনো চেনা মানুষের সাথে বহুদিন পর কথা হলে, শিউলির সাথে কথা বলে এরকমটা কেন হল আমার?' মনে মনে গুনগুনিয়ে উঠল সায়নী। 


জ্বর আসায় সেদিন সন্ধ্যেতে শিউলি আর মনোরমাকে কাজ করতে দেয়নি, সেদিনের জন্য ও নিজেই রান্নার দায়িত্বটা নিয়েছিল। সন্ধ্যেবেলায় যখন সকলের জন্য চা আর কফি বানাচ্ছিল শিউলি, সেই সময়েই রুমকি আর হিয়া বাড়িতে ঢুকল। বাড়িতে ঢুকে ফ্রেস হয়েই ওরা চলল রান্নাঘরে। শিউলি তখন ওদের উল্টোদিকে ঘুরে কাজ করছিল তাই শিউলির মুখ দেখতে পায়নি ওরা। 

— 'শোনো, আমি ব্ল্যাক কফি খাই, আমার জন্য একটা ব্ল্যাক কফি হবে।' রুমকি বলল।

— 'আর আমার জন্য লেবু চা করবে, বুঝলে?' হিয়া বলল।

— 'আজ্ঞে ম্যাম!' ওদের দিকে মুখ না ঘুরিয়েই জবাব দিল শিউলি।


রুমকি আর হিয়া ডাইনিংয়ে বসল।

— 'কি রে, আজ কেমন এনজয় করলি তোরা?' প্রশ্ন করল অনন্ত।

— 'দারুণ ড্যাডি, দারুণ!' হিয়া হেসে জবাব দিল।

রুমকি হিয়াকে খোঁচা মেরে নিচুগলায় বলল, 'এখানে সবাই মা আর বাবা বলে, কেউ মম ড্যাড বলে না, কে তোমায় আগ বাড়িয়ে কাকুকে ড্যাডি বলতে বলেছে?'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ষষ্ঠ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ