Advertisement

সত্যিই?

                             

সত্যিই?
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


কথায় বলে রজস্বলা না হলে নাকি মেয়েরা মা হতে পারে না,অনেকে এমন ধারণাও পোষণ করেন যে রজস্বলা না হলে মেয়েরা নারীত্বই অর্জন করতে অক্ষম।
সত্যিই কি তাই?
মেয়েটার নাম দীপিকা বর্মন,বয়স পঁচিশ বছর।এখনো পর্যন্ত রজস্বলা হয়নি সে।পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে যখনই তাকে,তার পরিবার সবসময়ই এই কথাটা লুকিয়ে রেখেছে পাত্রের পরিবারের কাছ থেকে,ঠিক যেভাবে অপরাধীরা নিজেদের অপরাধ লুকোয়।দীপিকা জানে,এ সমাজ আজও নারীকে সন্তান তৈরির মেশিন বলেই গণ্য করে,সন্তান না হওয়ার 'অপরাধে' আজও লাঞ্ছিত হতে হয় নারীকে,সমাজ সেই নারীকে তকমা দেয় 'বাঁজা মেয়েমানুষ'।অবশ্য অনেকে তো দীপিকার মতো মেয়েদের 'মেয়েমানুষ' বলেই গণ্য করতে চান না!যে মেয়েমানুষের প্রত্যেক মাসে রক্তক্ষরণই হয় না,সে কিসের নারী!নারীত্ব অর্জনে ব্যর্থ সে!এসব কথাই দীপিকা শুনে বড়ো হয়েছে।দীপিকা যখন হাইস্কুলে পড়ত,সে দেখত তার প্রতিটা বান্ধবীই মাসের কিছুদিন স্কুলে আসত না।কারণটা যতদিনে জানতে পেরেছে সে,ততদিনে তার বান্ধবীরাই শুরু করেছে কথায় কথায় তাকে অপমান করা,ঠাট্টা করা,তাচ্ছিল্য করা!অনেক বান্ধবী তাকে হাসতে হাসতে বলেছে, 'তোর আবার এসব প্রেম-ট্রেমের প্রতি আগ্রহ কিসের?তোর তো....'
 কথাটা শেষ করার আগেই কাঁদতে কাঁদতে ক্লাস থেকে ছুটে বেরিয়ে এসেছিল সে।কত রাত যে সে বালিশ ভিজিয়েছে সে শুধু দীপিকার চোখদুটোই জানে।সমাজ প্রতি মুহূর্তে তাকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়েছে,যে মেয়ে রজস্বলা হয়নি,যে মেয়ে গর্ভধারণে অক্ষম,প্রেম ভালোবাসা তার জন্য নয়।ডাক্তারের কাছেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাকে,কিন্তু ডাক্তার চিকিৎসার পর জানিয়েছেন,কিছু শারীরিক ত্রুটির জন্য সে কোনোদিন রজস্বলা হতে পারবে না,পারবে না গর্ভধারণ করতে।
 কেটে গেছে বেশ কয়েকটা বছর।দীপিকা যখনই রাস্তায় কোনো মেয়েকে দেখে সন্তানকোলে,এক অজানা কষ্টে হু হু করে ওঠে ওর বুকটা,চোখে জল আসে অজান্তেই!
  আজ সকাল থেকেই দীপিকার বাড়িতে ব্যস্ততার শেষ নেই,পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে যে তাকে।এই নিয়ে এগারোবার পাত্রপক্ষ আসার জন্য সাজানো হচ্ছে তাকে।
— 'ধুর,কেমন গোমড়া মুখ করে আছে দেখ শুধু!একটু হাস না রে দীপু,মনে হচ্ছে যেন একটা কাঠের পুতুলকে সাজাচ্ছি আমি!' দীপিকার চুল বেঁধে দিতে দিতে তার মা বললেন।
কোনো উত্তর দিল না দীপিকা।কথা যা বলার তা সে আসল জায়গাতেই বলবে।গত দশবার পাত্রপক্ষ ওকে পছন্দ করার পরেই যখন পাত্রকে পাঠানো হয়েছে দীপিকার সাথে আলাদা কথা বলার জন্য,দীপিকা সমস্ত সত্যিটা পাত্রকে জানিয়েছে।আর পরেরদিনই ফোন এসেছে পাত্রের বাড়ি থেকে,কোনো না কোনো অজুহাত দিয়ে বিয়ে ক্যান্সেল করে দিয়েছে পাত্রপক্ষ।দীপিকার বাড়ির মহিলা মহল সবই বোঝেন।যতবারই পাত্রের বাড়ি থেকে ফোন আসে,ততবারই দীপিকাকে মারধর করেন ওর মা, 'সত্যবাদী যুধিষ্ঠির সাজা না সবসময়?কে বলেছে পাত্রকে সবটা বলতে?'
দীপিকা কান্না ভেজা গলায় জবাব দিয়েছে, 'বিয়ের পর  এই বিষয়টা নিয়ে সমস্যা হোক আমি চাইনা,তাই সব সত্যি আমি জানিয়ে দিতে চাই বিয়ের আগেই!'
— 'হ্যাঁ বড্ড বেশি জেনে গেছিস তাই না?মায়ের থেকে বেশি জানিস তো!আমি তোকে পেটে ধরেছিলাম না তুই আমাকে,সেটাই বোঝা দায়!'
— 'মা তুমি শুধু শুধু....'
— 'থাম তো!একবার বিয়েটা হয়ে গেলে ওরা কিছুই করতে পারত না!আমরা তো ঠিকই করে রেখেছি,বিয়ের দিনই রেজিস্ট্রি ম্যারেজটাও করিয়ে নেব!'
— 'মা,জোর করে কি কোনো সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠে?ভালোবাসা কি আইন করে হয় মা?'
— 'এই রাখ তো যত নীতিকথা!খালি জ্ঞান আর জ্ঞান!' 
তবুও এবারেও পাত্রকে সবটা জানাবে দীপিকা,এটাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
 একটু পরেই পাত্ররা এল।পাত্র সুজয় সামন্ত,হাইস্কুলের শিক্ষক,তার বাবা প্রাক্তন ব্যাঙ্ক কর্মচারী অখিল সামন্ত,আর মা নয়না সামন্ত,গৃহবধূ।পাত্র এবং পাত্রী দুজনেরই পছন্দ হল দুজনকে,আলাদা ঘরে সুজয় এবং দীপিকাকে পাঠানো হল কথা বলার জন্য,যদিও এবার দীপিকার বাড়ির মানুষদের মোটেই ইচ্ছা ছিল না ওদের আলাদা কথা বলতে দেওয়ার,কারণ তাঁরা জানেন দীপিকাকে হাজার বারণ করা সত্ত্বেও সে সত্যিটা জানাবেই পাত্রকে।কিন্তু দীপিকা বলল যে সে কিছু কথা বলতে চায় সুজয়কে।ঘরে পাঠানো হল তাদের।ঘরে যাওয়ার আগে বাড়ির মহিলা মহলের মানুষদের রাগে রক্তবর্ণ হয়ে গেছে চোখমুখ,সেটা চোখ এড়াল না দীপিকার।বিশেষ করে মা রক্তচক্ষু মেলে তাকিয়েছিলেন দীপিকার দিকে,কিন্তু মায়ের সেই রাগী দৃষ্টি অগ্রাহ্য করেই সুজয় আর সে একটা ঘরে গেল আলাদাভাবে কথা বলার জন্য।
 — 'দীপিকা ম্যাডাম,আমার মা বাবার আপনাকে খুবই পছন্দ হয়েছে আমার স্ত্রী হিসেবে,আপনার আচার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছেন তাঁরা।'
 — 'আর আপনার?'
 — 'হ্যাঁ আমারও!' লাজুক মুখে বলল সুজয়।
 — 'আই অ্যাম সরি সুজয়বাবু,বাট আমি বলব,এই বিয়েটা আপনি করবেন না,তাহলেই ভালো হবে আপনার পক্ষে!'
 — 'কেন?আপনার বুঝি পছন্দ হয়নি আমাকে?'
 — 'না না ছি ছি,একেবারেই তা নয়।'
 — 'তাহলে?ও আচ্ছা আচ্ছা এইবার বুঝেছি,সবটা ক্লিয়ার আমার কাছে!'
 — 'মানে?'
 — 'আপনার কোনো প্রেমিক আছে তাই তো?আর সেজন্যই অন্য কাউকে বিয়ে করা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়!'
 সজোরে হেসে উঠল দীপিকা, 'আমার আবার প্রেমিক?আমাদের মতো মেয়েদের জীবনে প্রেম-ভালোবাসা এসব আসতে আছে নাকি?'
 — 'আপনাদের মতো মেয়ে বলতে?'
 — ওহ সরি সরি!মাফ করবেন,একটা বড়ো ভুল হয়ে গেছে!আমরা তো মেয়েই নই!'
 — 'মানে?কি বলতে চাইছেন আপনি?'
 — 'আমি কোনোদিন রজস্বলা হইনি সুজয়বাবু,তাহলে কিভাবে নারী হলাম আমি বলুন?মা হতেও পারব না কোনোদিন আমি!তাই তো বলছি সুজয়বাবু, আপনি অন্য জায়গায় বিয়ে করুন,আমাকে বিয়ে করলে আপনার ক্ষতি বই লাভ হবে না।আমার মতো মেয়েদের প্রেম,ভালোবাসা,সংসার,সন্তান এসবের স্বপ্ন দেখাও পাপ!'
 — 'এই তো বড় ভুল করে ফেললেন আপনি!অবশ্য আপনার ভুল কেন বলছি,এটা তো সমাজেরই দোষ!সমাজ বড়ো বিচিত্র জানেন তো দীপিকা ম্যাডাম,রজস্বলা নারী অপবিত্র তাদের চোখে,এদিকে যে নারী কখনো রজস্বলা হয়নি,সেও সমাজের চোখে ঠাট্টার পাত্র।আর আপনি বললেন কখনো মা হতে পারবেন না,এত বড়ো মিথ্যেটা আপনি বললেন কিভাবে?'
 — 'মিথ্যে?'
 — 'হ্যাঁ মিথ্যেই তো!আপনি এক্ষুনি বললেন আপনি মা হতে পারবেন না!কেন?গর্ভধারণ না করলে বুঝি কেউ মা হতে পারে না?'
 — 'সুজয়বাবু!'
 — 'আর কোনো কথা নয়,এক্ষুনি বাইরে যাব আমরা!' বলেই সুজয় দীপিকার হাত ধরে বাইরে এল,বলল, 'আমি আমার সিদ্ধান্ত জানাতে চাই সকলকে!'
 সুজয়কে এরকম কথা বলতে শুনে দীপিকার বাড়ির মানুষদের বুক দুরুদুরু করতে লাগল,সুজয়ের মা-বাবা হাসিমুখে বললেন, 'বিয়ে তোমরা করবে,তাই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তোমরাই নেবে।শুধু এটুকুই জানবে,আমরা সারাজীবন তোমাদের পাশে থাকব।আর দীপিকাকে সারাজীবন আমাদের মেয়ে বলেই জানব,ভালোবাসব,আগলে রাখব।'
 সুজয় বলল, 'আমি দীপিকা ম্যাডামকে বিয়ে করতে চাই।'
 দীপিকার বাড়ির মানুষেরা এমন কথা শুনে যত না খুশি হলেন,তার চেয়েও বেশি অবাক হলেন।আর দীপিকা,সে শুধু একদৃষ্টে তাকিয়েছিল সুজয়ের দিকে,জীবনে প্রথমবারের জন্য কোনো পুরুষের প্রেমে পড়ল সে।
 সাতটা বছর কেটে গেছে।দীপিকা আজ দশজন শিশুর মা,অনাথ আশ্রমের দশজন শিশুর দায়িত্ব নিয়েছে সুজয়-দীপিকা।সুজয়ের মা বাবা সবটা জানেন,দীপিকাকে মেয়ের মতো আগলে রেখেছেন তাঁরা বুকে।
  আজ দীপিকা আর সুজয়ের সপ্তম বিবাহবার্ষিকী।লং ড্রাইভে গিয়েছিল ওরা,ফেরার পথে একটা রেস্টুরেন্টে  ডিনার করতে গিয়েছিল।দিব্যি খুনসুটি-প্রেম সহযোগে ডিনার করছিল ওরা,হঠাৎ করেই একটা কান্নার আওয়াজে পিছন ফিরল দীপিকা।তাকিয়ে দেখে দুজন ছেলে আর মেয়ে বসেছে একদম দীপিকার পিছনের টেবিলেই,মেয়েটা কাঁদছে অবিরাম,আর ছেলেটা তাকে বলছে, 'সবসময় এত ইমোশনাল হোয়ো না মৌ,বুঝলে তো!এখনো বিয়ে হয়নি আমাদের,তুমি এখনই মা হলে লোকে কি বলবে?আর আমি কিন্তু একদম ঝামেলায় জড়াবো না আগেই বলে দিলাম!তখন যেন আবার কাঁদতে কাঁদতে আমাদের বাড়িতে চলে এসো না!'
  — 'রাজ তুমি এইভাবে বলছ আজ আমায়!'
  — 'ভালোভাবেই তো বলছি,তুমিই তো শুনছ না!বারবার বলছি,এখনো এমন কিছু দেরি হয়ে যায়নি,কালই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব তোমায়....'
  — 'রাজ কিন্তু আমাদের প্রথম সন্তানকে এভাবে শেষ করে দেব আমরা?'
  — 'ধুস,আবার সেই এক ইমোশন আর ড্রামা!'
  — 'ইমোশন,ড্রামা,তাই না?' 
  রাজ আর মৌ পিছন ফিরে তাকাল।দীপিকা বলে যেতে লাগল, 'তোমাদের কোনো ধারণা আছে,কত মেয়ে হাজার চেষ্টা করেও গর্ভধারণ করতে পারে না!আর তুমি কিনা বলছ ড্রামা,ইমোশন?'
  — 'তা নয়ত কি?এই যে আপনি এত লেকচার দিচ্ছেন এসে,আপনি দায়িত্ব নেবেন মৌয়ের?' বিরক্তমুখে রাজ বলল।
  — 'হ্যাঁ নেব,শুধু মৌয়ের না,ওর সন্তানেরও!' সুজয় এগিয়ে এল, 'মৌ আজ থেকে আমাদের কাছেই থাকবে,ওর সমস্ত দায়িত্ব আজ থেকে আমাদের!'
  রাজ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল,ওকে থামিয়ে দিয়ে সুজয় বলল, 'যে কাজটা তোমার করা উচিত ছিল সেটাই আমরা করছি মাত্র!তুমি আর কোনো কথা বোলো না,কাপুরুষ কোথাকার!'
  দীপিকা প্রেমমাখা দৃষ্টিতে দেখছিল তার মনের মানুষকে।এক সময় সে পুরুষের দিকে তাকাতেও ভয় পেত,যদি প্রেমে পড়ে যায়!কিন্তু আজ সে বুঝেছে, সে যাদের থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখত,তারা আসলে রাজদের মতো কাপুরুষ।সুজয়ের মতো মানুষের ভালোবাসার থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে সে নিজেকে,এমন সাধ্য যে তার নেই!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ