Advertisement

কাহিনী (পঞ্চদশ পর্ব)

 কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
পঞ্চদশ পর্ব



আকাশ এসে বসল শিউলির পাশে। গাড়িটা একটু স্পিডে চলছিল, আর ব্যাথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল শিউলি, গাড়ির হাতলটা চেপে ধরছিল ও যন্ত্রণায়।

— 'গাড়িটা আস্তে চালাও বিকাশদা।'

— 'কিন্তু তাতে যে তোমার বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাবে দাদাবাবু?'

— 'তা হোক, বাড়ি ফেরার কোনো তাড়া নেই আমার আজ।'

— 'আচ্ছা।'

বিকাশ গাড়ির স্পিড কমিয়ে দিল। শিউলি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।


____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


— 'এখন ঠিক লাগছে?'

— 'হ্যাঁ স্যার।'

আরও কিছুক্ষণ পর এসে গেল চৌধুরীবাড়ি।

— 'আজ আমি আর বাড়ির ভেতর যাব না, ভয় নেই। তুমি একাই যাও।'

শিউলির খুবই খারাপ লাগল, কিন্তু কিছু বলতে পারল না ও।

— 'আপনাকে যে নিজের বাড়িতেই এনে বসাব, সেই অধিকারটুকুও বোধহয় নেই আমার!' মনে মনে বিড়বিড় করে শিউলি নামতে গিয়েই দেখে, সর্বনাশ! ও যেখানে বসেছিল, সেই সিটটা রক্তে ভিজে গেছে।

ভীষণভাবে লজ্জিত হয়ে শিউলি বাড়ির দিকে চলে গেল।

আরও বেশ কিছুক্ষণ পরে আকাশের বাড়ি চলে এল। আকাশ ততক্ষণে হাতে রুমাল বেঁধে নিয়েছে।

— 'একি দাদাবাবু, এখানে এত রক্ত কেন? কোনোভাবে চোট পেয়েছ?'

আকাশ হাতে বাঁধা রুমালটা দেখিয়ে বলল, 'আর বোলোনা, হাত কেটে গেছে।'

  শিউলি কলেজ থেকে ফিরেই ফ্রেশ হয়ে খেয়ে সবে একটু শুয়েছে, হঠাৎই মোবাইলে টুংটাং শব্দ। মোবাইলটা খুলে শিউলি দেখে, আকাশের মেসেজ। 

— 'গাড়ি থেকে নামার সময় তুমি যেভাবে লজ্জা পাচ্ছিলে এটা ততটাও লজ্জা পাওয়ার মতো বিষয় নয়, খুবই নর্মাল একটা ব্যাপার এটা যেটা সব মেয়েদেরই হয়ে থাকে। যাই হোক, এখন থাক এসব, কেমন আছো এখন সেটা বলো।'

মুগ্ধ হয়ে গেল শিউলি। প্রথম দিনের পরিচয়ে মানুষটাকে যতটা নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল, আজ ততটাই কেয়ারিং মনে হল মানুষটাকে। মন থেকে স্যার হিসেবে যে সম্মানটা ছিল এনার প্রতি, সেটা দ্বিগুণ হয়ে গেল শিউলির।

— 'ভালো আছি স্যার।' শিউলি রিপ্লাই দিল।

— 'বাড়িতে আবার কোনো ঝামেলা হয়নি তো?'

— 'না স্যার, সব ঠিকঠাকই আছে বাড়িতে।'

— 'যাক, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।'

মেসেজে কথোপকথন শেষ হওয়ার পর অজান্তেই একটা হাসি খেলে গেল শিউলির মুখে। এক অজানা আনন্দে মন ভরে উঠল ওর। মনোরমা মারা যাওয়ার পর এই আনন্দটাই কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল ওর জীবন থেকে।

হিয়া ভেবেছিল, আকাশ আজ অপমান করবে শিউলিকে, তাই ওর মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে সেটাই দেখতে এসেছিল ও, কিন্তু এসে দেখে ওর মুখে কোথাও দুঃখের লেশমাত্র নেই, বরং গোটা মুখ জুড়ে খেলছে হাজার রঙের রামধনু। দেখেই মাথা গরম হয়ে গেল হিয়ার, রাগীস্বরে বলল, 'কলেজ থেকে ফিরেই পাটরানীর মতো বিছানায় শুয়ে পড়লি যে? সন্ধ্যেবেলায় যে আমি চিকেন স্টু খাই, জানিস না? ওটা কে বানাবে আমি?'

অন্যদিন হলে হয়তো শিউলি কিছু না বলে চুপচাপ চলে যেত রান্নাঘরে, কিন্তু সত্যিটা জানার পর থেকে কিছুটা হলেও প্রতিবাদ করতে শিখেছে ও, আর আজ মনের মধ্যে একটা আলাদাই সাহস জন্মাল কোনো এক অজ্ঞাত কারণে। ও শান্ত গলায় বলল, 'আজ আমার শরীর ভালো নেই কাহিনী, তুমি অন্য কোনো মেডকে বলো বানিয়ে দিতে।'

এই সাহসের উৎসটা কি সেটা হিয়া কিছুটা হলেও আন্দাজ আগেই করতে পেরেছে ওর হাসিমুখটা দেখে, তাই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল ও।

— 'কি? এত বড় সাহস তোর যে আমায় মুখের ওপর পারব না বলিস?'

— 'শরীর ভালো না থাকলে তো তুমিও রেস্ট নাও কাহিনী, নাও না?'

— 'এই তুই আমায় আগে কাহিনী দিদি বলতিস না? আজ নাম ধরে ডাকছিস যে বড়?'

— 'হুম ডাকতাম, কিন্তু ভেবে দেখলাম তুমি তো আমার সমবয়সী, আর সমবয়সীকে কেউ দিদি বলে?'

— 'বটে! বড্ড সাহস বেড়েছে তো তোর! দাঁড়া এক্ষুণি মাকে সবটা বলছি আমি, তারপর দেখব কিভাবে এই বাড়িতে থাকিস তুই!'

হিয়া গটগট করে চলে গেল সায়নীর কাছে, আর তারপরেই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সবটা বলল।

কিন্তু সবটা শুনে সায়নী মোটেও রাগ করল না, বরং বলল, 'রাগ করছিস কেন কাহিনী? শিউলি ভুলটা কি বলেছে?'

হিয়া এবার রাগে কাঁপতে কাঁপতে গেল রুমকির কাছে।

পরেরদিন এক নতুন সমস্যায় পড়ল শিউলি। বাস থেকে নেমে হাঁটা পথে কলেজ যাচ্ছিল সে, হঠাৎ পথ আটকে দাঁড়াল কয়েকটা বখাটে ছেলে। ওদের মধ্যে সুদীপ গুছাইত ওরফে দিপুও ছিল।

দিপুর কলেজে খ্যাতি আছে, কুখ্যাতি। কখনোই তাকে ক্লাসরুমে কেউ দেখেনি, তবে ইউনিয়ন রুমে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে, ক্যাম্পাসে বসে মেয়েদের টোন টিটকিরি কাটতে, কখনও বা ক্যান্টিনে বসে মাদক খেতে বা নতুন স্টুডেন্টদের র‍্যাগিং করতে তাকে হামেশাই দেখা যায়। বাবার টাকা আর ক্ষমতা আছে বলে বছরের পর বছর ফেল করেও দিব্যি কলেজে টিকে আছে সে। শুরু থেকেই শিউলির প্রতি নজর ছিল ওর, তবে শিউলি কখনই বিশেষ পাত্তা দেয়নি বলে আর চৌধুরীবাড়ির মানুষেরা, যাদের কথা শহরের সবাই না জানলেও অধিকাংশ মানুষ জানে, তারা শিউলির পাশে থাকায় ওর কাছাকাছি ঘেঁষার বিশেষ সাহস পায়নি দিপু। তবে এবার রাগের বশবর্তী হিয়া আর রুমকি ইন্ধন জুগিয়েছে দিপুকে, জানিয়েছে শিউলির পাশে আর চৌধুরী পরিবার নেই, তাই এই সুযোগটা যেন দিপু লুফে নেয়।

— 'কি মামনি, কলেজ যাওয়ার এত কিসের তাড়া তোমার? একটু দাঁড়িয়ে যাও না!'

— 'দিপুদা এক্ষুণি ক্লাস শুরু হয়ে যাবে আমার, প্লিজ যেতে দাও!'

— 'আহা, যাবে তো, আমি কি তোমায় আটকে রাখব নাকি হুঁ? আর তুমি তো এমনিতেই এত্ত বুদ্ধিমান, একটা দুটো ক্লাস না করলেও টপার তো তুমিই হবে, এই অধমের দুটো কথা শুনলে এমন কিছু সময় নষ্ট হবেনা।'

শিউলি পাশ কাটিয়ে চলে আসছিল, কিন্তু দিপু ওর হাতটা ধরল।

— 'কিসের এত তেজ হ্যাঁ? তুমি যতই অ্যাটিচুড মারো, আসলে তো চৌধুরীবাড়ির কাজের লোক ছাড়া আর কিছুই নও তুমি। তার চেয়ে আমার কথাটা মন দিয়ে শোনো, তুমি আমায় বিয়ে করে নাও, একদম সোনা গয়নায় মুড়ে দেব, রাজরানীর মতো পায়ের ওপর পা তুলে বসে খাবে। আমার মতো আশিক থাকতে তুমি কিনা চৌধুরীবাড়িতে লাথিঝাঁটা খেয়ে এককোণে পড়ে থাকবে? আমি কি সেটা হতে দিতে পারি বলো সোনা?'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ষোড়শ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. আকাশ এর চরিত্র কে খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরে হয়েছে, বড়ই উদার মনের পরিচয় দিয়েছে আকাশ নিজের ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে, এবং সেটাই তো হওয়া উচিত একজন শিক্ষক এর, উদার, অনুসন্ধিৎসু মনন এবং নিজের জ্ঞান এর আলোকে ছাত্র এবং ছাত্রীদের কেও আলোকিত করে তোলা। আকাশ সেই গুরুদায়িত্ব বড়ই সুন্দর ভাবে পালন করেছে। এর সাথে সায়নীর ব্যবহারের ও প্রশংসা করতেই হয়। সায়নী হিয়াকে সঠিক শিক্ষাই দিয়েছে, একজন মা হিসেবে উনি শিউলি কে মেইড হিসেবে না বরং নিজের মেয়ের চোখে দেখছেন এবং হিয়া কেও তাই করতে বলেছেন, এটা বড়ই সুন্দর লাগলো। সব মিলিয়ে দারুন, অসাধারণ একটা পর্ব আবারও। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম ❤️❤️❤️❤️

    উত্তরমুছুন