Advertisement

কাহিনী (ষোড়শ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ষোড়শ পর্ব


— 'দিপুদা তুমি বোধহয় শুনতে পাওনি যে আমার ক্লাস আছে এখন, তোমার এসব আবোলতাবোল কথা শোনবার সময় বা ইচ্ছে কোনোটাই আমার নেই, সরে যাও!'
— 'তবে রে! মিষ্টি করে দুটো কথা বলেছি বলে খুব সাহস বেড়ে গেছে না? বেশ, সোজা কথায় যদি ঘি না ওঠে তবে আঙুল বেঁকাতেও জানে এই সুদীপ গুছাইত।' বখাটে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে দিপু বলল, 'এই, মালটাকে গাড়িতে তোল্ তো!'

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


সাথে সাথেই অন্য বখাটে ছেলেগুলো শিউলির হাতদুটো চেপে ধরল, তারপরেই টানতে টানতে নিয়ে চলল হুডখোলা গাড়িটার দিকে।
শিউলি চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু সেসময় রাস্তা ফাঁকা ছিল, তাই কেউই শুনল না ওর চিৎকার।
— 'যতখুশি চেঁচা তুই, কেউ বাঁচাতে আসবে না তোকে।' তারপরেই দিপু ক্রূর হাসি হেসে বলল, 'আজ তোকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করব, তারপর দেখি তুই কলেজ কি করে আসিস আর পড়াশুনাই বা কিভাবে করিস!'

হঠাৎই সেখানে হাজির আকাশ। ও এসেই সপাটে এক চড় মারল দিপুর গালে।
— 'একটা মেয়েকে একা পেয়ে অসভ্যতা করছিস জানোয়ার?'
দিপু কিছু না বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। রাগে তার চোখমুখ লাল হয়ে গেল।
দিপুর বখাটে বন্ধুদের দিকে ফিরে আকাশ বলল, 'তোদেরও কি ওর মতো করে বোঝাতে হবে?'
বখাটে বন্ধুগুলো তৎক্ষণাৎ শিউলির হাত ছেড়ে দিল।
 — 'স্মৃতি, এসো।'
 আকাশ শক্ত করে ওর হাতটা ধরল, দুজনে রওনা দিল কলেজের পথে।

ওরা চলে যাওয়ার পর দাঁত কিড়মিড় করে দিপু বলতে লাগল, 'নেহাত তুমি স্যার, তাই তোমায় কিছু বললাম না আমি! তবে তোমায় আমি দেখে নেব আকাশ ব্যানার্জী, সুদীপ গুছাইতকে তুমি চেনো না!'

— 'এই কাহিনী, কাহিনী রে, ওইদিকে দেখ!'
বন্ধুদের ইশারা বরাবর তাকিয়েই পা থেকে মাথা পর্যন্ত রি রি করে জ্বলতে লাগল হিয়ার।
— 'কোথায় আমরা ভাবলাম, ওই শালা শিউলিটাকে স্যার পছন্দই করবেন না, এ তো দেখি উলটপুরাণ রে!' 
— 'সিরিয়াসলি ভাই, স্যার হাত ধরার জন্য আর কোনো মেয়েকে পেলেন না? শেষে ওই চাকরানীর মেয়েটার হাত ধরে কলেজে ঢুকছেন? ছি ছি!'
বন্ধুদের এইসব আলোচনা আরও মাথা গরম করে দিচ্ছিল হিয়ার, তাই ও আর কলেজের বারান্দায় দাঁড়াল না, ক্লাসরুমে চলে গেল মনে মনে দিপুকে গালমন্দ করতে করতে।

অন্যদিকে শিউলি মনে মনে ঠিক করল, ও নিজের আর হিয়ার দুজনেরই ডি.এন.এ টেস্ট করাবে, তারপর রিপোর্টদুটো তুলে দেবে সায়নী আর অনন্তর হাতে। সেই মতো সকলের অলক্ষ্যে ও সায়নী, অনন্ত, আর হিয়া তিনজনেরই মাথার চুল জোগাড় করল, তারপরেই সেসব নিয়ে একদিন গোপনে বেরিয়ে পড়ল। 

বেশ কিছুদিন পর শিউলির মোবাইলে মেসেজ ঢুকল, যে রিপোর্ট তৈরি, ও যেন এসে নিয়ে যায়।

সেদিন সন্ধ্যেবেলায় চৌধুরীবাড়ির সকলে বসার ঘরে হাজির। শিউলিই ডেকেছে সকলকে। সকলে এসে হাজির হতেই শিউলি বলল, 'তোমাদের সবাইকে কিছু বলার আছে আমার।'
— 'হ্যাঁ বল্ দিদিভাই।' ত্রিদিববাবু বললেন।
শিউলি হিয়ার কথা, রুমকির ওকে পাহাড় থেকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার ঘটনা থেকে শুরু করে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। সবটা শুনে সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল, গোটা বাড়ি জুড়ে এক ভয়ানক নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল।
কাকলিই প্রথম নিস্তব্ধতা ভাঙল।
— 'বাহ, দারুণ গল্প বানাতে পারিস তো তুই! লেখালেখি শুরু করে দে, ফেমাস হয়ে যাবি!'
— 'তুই যে এত কথা বললি, আমার নামে অপবাদ দিলি, প্রমাণ আছে কিছু?' রুমকি বলল।
— 'অবশ্যই আছে!'
শিউলি ডি.এন.এ রিপোর্টদুটো তুলে দিল অনন্তর হাতে।
অনন্ত দুটো রিপোর্টই ভালোভাবে পড়ল, তারপর বলল, 'এই দুটো রিপোর্ট থেকে কিছুই প্রমাণ হয় না রে শিউলি!'
— 'কি?' শিউলি তাড়াতাড়ি রিপোর্টদুটো দেখতে লাগল।
রিপোর্ট দেখেই শিউলি হতবাক। রিপোর্টে লেখা আছে, শিউলির সাথে সায়নী আর অনন্তর ডি.এন.এ ম্যাচ করেনি, কিন্তু হিয়ার করেছে।
— 'এ-এটা কিভাবে সম্ভব? এটা ভুল রিপোর্ট বিশ্বাস করো তোমরা, ভুল রিপোর্ট এটা, আমি আবার অন্য কোথাও টেস্ট করাব!'
— 'মোটেই না!' কাকলি গর্জে উঠল, 'এটাই সঠিক রিপোর্ট, কারণ ও ই আমাদের কাহিনী, তোর মতো রাস্তার মেয়ে কেন চৌধুরীবাড়ির মেয়ে হতে যাবে রে?'
— 'দেখো মা, আমাদের সম্পত্তির ওপর শিউলির কত নজর! এই মেয়ের হয়ে তুমি সবসময় কথা বলো মা, যে তোমার নিজের মেয়ের জায়গা নিতে চায়?' কাঁদোকাঁদো সুরে বলে উঠল হিয়া।
— 'একদম বাজে কথা বলবে না তুমি হিয়া!' শিউলি রাগীস্বরে বলে ওঠে।
— 'এনাফ ইজ এনাফ!' সায়নী শিউলির হাত ধরে একপাশে টেনে নিয়ে গিয়ে বলল, 'তোর যদি টাকার এতই দরকার ছিল, তুই আমায় বলতিস, এবাড়ির সম্পত্তির একটা ভাগ তোকেও দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন বাবা! কিন্তু তা না করে তুই কিনা এবাড়ির মেয়ের জায়গা নিতে চাইলি? ছি‌! তোকে আমি অন্যরকম ভেবেছিলাম রে, কিন্তু এখন দেখছি ভুল চিনেছিলাম!'
শিউলিকে হাত ধরে টেনে নিয়ে এল কাকলি, 'শেষমেশ বুঝলি তো ছোট, এ মেয়ে কতটা সাংঘাতিক! বাইরে শান্তশিষ্টের মুখোশ পরে ভেতরে ভেতরে কালসাপ! তোকে আর এক মুহূর্তও এই বাড়িতে রাখা যাবে না! চল্ এক্ষুণি বেরো, বেরো বলছি!'
কাকলি শিউলির হাত ধরে ঠেলে দিল ওকে, আর শিউলি পড়ল মেঝেতে।
— 'প্লিজ দিদি, আমার আর এত অশান্তি ভালো লাগছে না! আর শোন্ শিউলি তোকেও বলি', সায়নী বলে যেতে লাগল, 'এটাই শেষবার যে তোকে আমরা ক্ষমা করলাম, এরপর যদি আবার এরকম কোনো অন্যায় করিস তুই তাহলে আর দিদিকে বাধা দিতে পারব না আমি, মাথায় রাখিস!' সায়নী সহ বাড়ির সকলে যে যার ঘরে চলে গেলেন।
কাকলি বলল, 'শুধু ছোট বলল তাই এবারের মতো তোকে ছেড়ে দিলাম, এরপরেও যদি বেশি বেগড়বাই করেছিস, চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে রাস্তায় বের করে দেব, মাথায় থাকে যেন কথাটা!'

পরবর্তী ভাগ পড়ুন : সপ্তদশ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ