Advertisement

কাহিনী (একাদশ পর্ব)

 কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
একাদশ পর্ব


— 'হ্যাঁ ও ই আসছে! তেরো বছর আগে খুব চ্যালেঞ্জ করেছিল, আঠারো বছর বয়স হলে নাকি আমি তোকে চিনতেই পারব না! ওকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিস তো, ও কতটা ভুল!'
প্রমাদ গুনল হিয়া। একমাত্র বীণামাসিই জানে কাহিনীর আসল চেহারা। ও আর দেরি না করে কাকলির ঘরে গেল, রুমকিকে ওখানেই পাওয়া যাবে এখন তা ও জানে।

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_______________________________


— 'রুমকিদি, বড়মা, আর উপায় নেই। এখনই ব্যাগপত্র সব গুছিয়ে ফেলো, আজ রাতেই চলো বাড়ি থেকে চুপিচুপি বেরিয়ে যাই আমরা।'
— 'মানে? তোমাকে নিয়ে আসা হয়েছে কি সবাই মিলে বাড়ি ছেড়ে পালাব বলে?'
— 'ওসব সম্পত্তি-টম্পত্তি ছাড়ো না এখন, আগে তো পুলিশের হাত থেকে বাঁচি! তাও একটা উপায় হত যদি ওই হতভাগী কাহিনীটাও আমাদের বাড়িতে এসে না উঠত! বীণামাসি কাল এসে ওকে দেখলেই তো সব খতম্!'
— 'তোমার রুমকিদিকে কি এতটাই ব্রেনলেস মনে হয় হিয়া? আমাদের কোথাও যেতে হবে না, যাবে ওই শিউলি, যাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ।'
হিয়া মাথা চুলকে শুতে চলে গেল।
পরেরদিন রবিবার। সকাল হতে না হতেই রুমকি শিউলিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল শপিং মলে। প্রায় দু তিন ঘন্টা ধরে মন ভরে শপিং করল রুমকি, তারপর সব ব্যাগগুলো ধরিয়ে দিল শিউলির হাতে।
— 'এই শোনো, আজ আমার একটা ফ্রেন্ডের বিয়ে। এই সব জামাকাপড় আর খাবারদাবার ওর বাড়িতে তোমায় পৌঁছে দিতে হবে, ওকে?'
— 'ওকে রুমকিদি।'
— 'ওর অ্যাড্রেসটা আমি তোমার মোবাইলে এস.এম.এস করে দিয়েছি, এখান থেকে অনেকটা দূর কিন্তু, বাসে প্রায় দেড় ঘন্টা লাগবে, পারবে তো?'
শিউলি মাথা নাড়ল।
— 'বেশ, দিয়ে এসো।'
রুমকি উঠে পড়ল বাড়ির গাড়িতে, আর শিউলি রওনা দিল বাসস্ট্যান্ডের দিকে।
রুমকি বাড়িতে ঢুকেই দেখে, বীণাপাণি বসার ঘরে বসে চা খাচ্ছে আর গল্প করছে সায়নীর সাথে। রুমকি আসতেই বীণাপাণি বলে উঠল, 'এই যে রুমকি ম্যাডাম এলেন! কি ব্যাপার বল্ তো তোদের দুই বোনের? এখানে এসে থেকে না তো সেভাবে ফোন করিস, আর না তো খোঁজখবর নিস! মাসিটা মরে গেছে না বেঁচে আছে সেসব নিয়ে কোনো চিন্তাই নেই তোদের! বাড়িতে এসেও দেখা নেই তোদের, এসেই শুনলাম তুই নাকি শপিং করতে বেরিয়েছিস সকাল সকাল, আর তোর বোন তো সেই যে এসে থেকে শুনলাম স্নানে ঢুকেছে, আর বেরোনোরই নাম নেই তার!'
— 'বীণামাসি তোমার চা খাওয়া হয়ে গেলে একটু কাহিনীর ঘরে এসো।' রুমকি বলল।
অন্যদিকে রুমকি এত ব্যাগ ধরিয়ে দিয়েছে শিউলিকে যে ও বইতেই পারছে না এত ব্যাগ। অনেক কষ্টে বাসে উঠল ও ব্যাগগুলো নিয়ে। প্রায় দেড়ঘন্টা পর যখন বাস থেকে নামল শিউলি, ঘেমেনেয়ে একাকার ও। রুমকি এত তাড়া দিয়েছে যে সকালে কিছু না খেয়েই বেরোতে হয়েছে ওকে। বাস থেকে নেমে কোনোরকমে কষ্ট করে হাঁটছিল শিউলি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, হঠাৎই একটা গাড়ির সামনে পড়ল ও। হাত থেকে সব ব্যাগ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল রাস্তায়, শিউলি নিজেও পড়ে গেল, হাঁটুতে চোট পেল ও।
গাড়ি থেকে নেমে এল আকাশ ব্যানার্জী, 'এই তুমি আমাদের কলেজের স্টুডেন্ট না? এইভাবে কেউ রাস্তা দিয়ে হাঁটে? এক্ষুণি তো একটা বড়ো অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারত নাকি!'
পরক্ষণেই আকাশের চোখ পড়ল রাস্তায় ছড়িয়ে পড়া ব্যাগগুলোর দিকে।
— 'বাপরে এত ব্যাগ একা বইছ? সাথে কেউ নেই?'
— 'আসলে স্যার, এগুলো দিদির কেনা, আমাকে বলল একটা জায়গায় পৌঁছে দিতে, তাই আর কি....'
— 'বাহ, তোমার দিদির বিবেচনা বোধ তো দারুণ! শপিং উনি করলেন, আর নিজে একটাও ব্যাগ না নিয়ে সব ব্যাগ তোমায় দিয়ে দিলেন বইতে? আর তুমিও তেমনি, ঘাড় নেড়ে নিয়েও নিলে, বইতে পারবে না জেনেও!'
— 'আসলে স্যার, ওই চৌধুরীবাড়ির প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই, ওরা যদি না থাকত, আমায় হয়ত রাস্তায় এসে দাঁড়াতে হত আজ। সেই বাড়ির মেয়েকে আমি কোন্ মুখে না বলব স্যার?'
— 'ব্যাস, তাহলে আর কি! ওরা যদি বিষও খাওয়ায়, কৃতজ্ঞতার বশে সেটাও খেয়ে নিও! শোনো স্মৃতি, সবসময় অত শান্তশিষ্ট হয়ে থাকলে চলে না, কিছুক্ষেত্রে না বলাও শিখতে হয়! যাক এখন এসব জ্ঞানের কথা থাক, তুমি গাড়িতে ওঠো।'
— 'স্মৃতি নয় স্যার, শিউলি।'
— 'হ্যাঁ ওই হল, এখন গাড়িতে ওঠো দেখি চুপচাপ!'
শিউলির হাঁটুতে চোট লেগেছে, ও ঠিকভাবে হাঁটতে পারছিল না, কোনোরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠল ও। আকাশ ব্যাগগুলো তুলে গাড়িতে রাখল।
গাড়িটা রুমকির দেওয়া অ্যাড্রেসে পৌঁছল।
— 'এই তুমি গাড়িতেই বোসো, পায়ের এই অবস্থা নিয়ে আর নামতে হবে না, তোমার দিদির বন্ধুর বাড়িতে আমিই দিয়ে আসছি এগুলো।'
শিউলি বারণ করল, কিন্তু আকাশ ওর আপত্তি কানেই নিল না। ব্যাগগুলো নিয়ে রুমকির বান্ধবীর বাড়ির দিকে চলল ও। শিউলি মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল আকাশের হেঁটে যাওয়া। যে মানুষটাকে কাল ওর রূঢ় মনে হয়েছিল, আজ তাকেই বড্ড কেয়ারিং মনে হল ওর।
অন্যদিকে বীণাপাণিকে দোতলায় কাহিনীর ঘরে নিয়ে গিয়ে রুমকি একটা মেডিকেল রিপোর্ট দিল বীণাপাণির হাতে। রিপোর্টে লেখা ছিল, একটা অ্যাক্সিডেন্টে কাহিনীর মুখটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল একেবারে, তাই ডাক্তার বাধ্য হয়েই প্লাস্টিক সার্জারি করতে বাধ্য হয়েছেন, আর যার ফলে কাহিনীর মুখটা পুরোপুরি বদলে গিয়েছে।
— 'সে কি রে! এসব কিভাবে হল? আর আমায় কিছু জানাসনি কেন?'
— 'আসলে বীণামাসি, বাঁকুড়া থেকে ফেরার পথে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল গো কাহিনীর। ও পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল খাদে। আর বীণামাসি', একটু থেমে রুমকি বলল, 'তুমি এমনিতেই কাহিনী চলে যাচ্ছে শুনে খুব মন খারাপ করছিলে, তাই আর কষ্ট দিতে চাইনি তোমায় গো! আর বীণামাসি, আমার একটা রিকোয়েস্ট রাখবে গো?' রুমকি বীণাপাণির হাতদুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে বলল।
— 'কি রিকোয়েস্ট বল্।'
— 'কাহিনীর এই অ্যাক্সিডেন্টের খবরটা আমি এবাড়ির কাউকে জানাইনি গো। আমি চাইনা কেউ টেনশন করুক কাহিনীকে নিয়ে।'
— 'বেশ, তাই হবে।'

— 'কেমন আছো গো বীণামাসি?' বীণাপানির সামনে এসে দাঁড়াল হিয়া।

পরবর্তী ভাগ পড়ুন : দ্বাদশ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. ভীষন ভালো লাগছে পড়তে, পরের পর্ব তাড়াতাড়ি চাই 🧡🧡🧡

    উত্তরমুছুন