Advertisement

কাহিনী (দ্বাদশ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দ্বাদশ পর্ব


— 'ও কে রে রুমকি?'

— 'চিনলে না তো? ও ই তো আমাদের কাহিনী গো বীনামাসি, মুখটা বদলে গেছে ঠিকই, কিন্তু চুলটা সেম রয়ে গেছে দেখো।'


হিয়া প্রণাম করল বীণাপানিকে।

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_______________________________


বীণাপানি হিয়ার কপালে স্নেহচুম্বন করল, তারপর বুকে টেনে নিল ওকে। কিন্তু মনের মধ্যে একটা খটকা রয়েই গেল ওর। এই মেয়েটার চুল, পোশাক, পছন্দ সবটাই কাহিনীর মতো হলেও কাহিনীর মুখে যে একটা কমনীয়তা ছিল, চোখ দুটো মায়াময় ছিল, হাসির মধ্যে কোমলতা ছিল, শান্তশিষ্ট স্বভাব ছিল, এই মেয়েটার মধ্যে সেগুলো কই? অথচ রুমকির কথাও অবিশ্বাস করতে পারছে না ও। সব মিলিয়ে মনের মধ্যে একটা চাপা অস্বস্তি নিয়েই বীণাপানি রওনা দিল চৌধুরীবাড়ি থেকে।

— 'কি হিয়া, কেমন দিলাম চালটা?' বাঁকা হাসল রুমকি।

— 'সত্যি তুমি একটা জিনিস মাইরি! ফেক মেডিকেল রিপোর্টও যে বানিয়ে রেখেছ কই জানাওনি তো আমায়?'

— 'তাহলে? রুমকি চৌধুরীকে কি এতটাই কাঁচা খেলোয়াড় মনে হয় তোমার?' রুমকি ক্রুর হাসি হেসে বলতে লাগল, 'আমি জানতাম এরকম সিচুয়েশন একদিন আসবেই, তাই আগে থেকেই ফেক মেডিকেল রিপোর্টটা বানিয়ে রেখেছি আমি! আর দেখো, শিউলিকেও আমি সকাল সকাল বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে গেছি, পাঠিয়ে দিয়েছি কোন্ দূরে আমার এক বান্ধবীর বাড়ি, যাতে ও ফিরে আসার আগেই বীণামাসি বেরিয়ে যেতে পারে এখান থেকে।'

— 'সত্যি গুরু, তোমার চরণে শতকোটি প্রণাম!'


অন্যদিকে রুমকির বান্ধবীর বাড়ি থেকে শিউলি যখন ফিরছিল আকাশের গাড়িতে, পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল ট্যাক্সি। ট্যাক্সিতে বীণাপানি স্টেশন যাচ্ছিল। আকাশের গাড়ির কাচ নামানো ছিল, তাই গাড়িতে বসে থাকা শিউলিকে এক ঝলকের জন্য দেখতে পেল বীণাপানি। দেখেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল বীণাপাণির। হিয়াকে নিয়ে মনের মধ্যে যে সন্দেহের বুদ্বুদ দানা বেঁধেছিল, সেটা আরও জোরদার হল। কিন্তু ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে যে দেখবে ও মেয়েটাকে সেটাও সম্ভব ছিল না। তাই মনের যাবতীয় প্রশ্ন মনে চেপেই বীণাপানি ফিরে গেল বাঁকুড়ায়।


চৌধুরীবাড়ির মেইন গেটের সামনে গাড়িটা থামল। কোনোরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গাড়ি থেকে নামল শিউলি।

— 'পায়ের যা অবস্থা, হেঁটে যেতে পারবে বলে তো মনে হচ্ছে না। আমার হাতটা ধরো।'

— 'স্যার আমি ঠিক চলে যেতে পারব। আপনি এতটা রাস্তা পৌঁছে দিলেন আমায়, এর জন্য অনেক ধন্যবাদ স্যার, কিন্তু....'

— 'কি কিন্তু? বেশি কথা বোলো না, চলো।'

আকাশ শিউলির হাতটা শক্ত করে ধরল। শিউলি এখনো ভোলেনি অভিজিতের সঙ্গে ওকে জড়িয়ে কত খারাপ কথা বলা হয়েছিল ওকে, সারারাত কেঁদেছিল ও সেই অপমানের জ্বালা ভুলতে। আকাশকে সব কথা খুলেও বলতে পারছে না ও, এদিকে বুক দুরু দুরু করছে ভয়ে।

— 'যে বাড়ি না থাকলে তোমায় রাস্তায় দাঁড়াতে হত, সেই বাড়িতে ঢুকতে এত ভয় যে হাত পা কাঁপছে? বুঝতেই পারছি চৌধুরীবাড়ির মানুষেরা কত্ত মানবিক।'

— 'না স্যার, বাড়ির মানুষেরা সত্যিই খুব ভালো, শুধু কয়েকজন একটু রাগী।'

— 'হুম তার নমুনা তো সকাল থেকেই দেখছি। আর বেশি কথায় কাজ নেই, চলো বাড়ির ভেতরে।'


চৌধুরী বাড়ির কলিং বেলটা বেজে উঠল। দরজা খুলতেই দেখা গেল, শিউলি আর আকাশ দাঁড়িয়ে আছে একে ওপরের হাত ধরে।

— 'কি রে শিউলি সকাল সকাল কোথায় ঘুরতে গেছিলি রে? বাড়ির এত কাজ কর্ম কি আমি করব?' ঝাঁঝিয়ে উঠল কাকলি।

আকাশ কিছু বলতে যাবে তার আগেই সায়নী বলে উঠল, 'ওকে বকছ কেন দিদি? তোমার মেয়েই তো নিয়ে গিয়েছিল ওকে, কোন এক বন্ধুর বাড়িতে জামাকাপড় পৌঁছে দেওয়ার জন্য। সকালে কিছু খেয়েও যেতে পারেনি ও।'

— 'তা শিউলি, কাজটা ঠিকঠাক করে আসতে পেরেছিস তো? কোনো গন্ডগোল পাকাসনি তো?' রুমকি প্রশ্ন ছুড়ে দিল।

— 'ওহ, আপনিই তাহলে ওর সেই দিদি, যে নিজে একটাও ব্যাগ না নিয়ে সব ব্যাগ ধরিয়ে দিয়েছিলেন ওর হাতে। অবশ্য আপনাকে আর কি দোষ দেব', আকাশ কাকলির দিকে তাকিয়ে বলল, 'যেমন শিক্ষা পেয়েছেন কাজটাও তো তেমনই করবেন, এতে আশ্চর্য কি?' 

রুমকি এবার তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল, রাগত স্বরে বলে উঠল, 'এই কে বলুন তো আপনি? বাড়ি বয়ে এসে এভাবে আমাদের অপমান করছেন?'

আকাশ হেসে বলল, 'অধমের নাম আকাশ ব্যানার্জী।'

হিয়া দোতলার ঘরে বসে পড়ছিল, গন্ডগোল শুনে তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল।

— 'সে আপনি যেই হন, এভাবে আমাদের কথা কেন শোনাচ্ছেন?' কাকলি বলে উঠল।

— 'আরে কাকে কি বলছ তোমরা? উনি আমাদের কলেজের স্যার, ওনার সাথে এভাবে কেউ কথা বলে?' হিয়া মনে মনে নিজের কপাল চাপড়াল, 'ভেবেছিলাম এঁকে ঠিক পটিয়ে বিয়ে টিয়ে করব, তা আর হতে দেবেনা দেখছি এই রুমকিদি আর বড়মা!' তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য হিয়া ছুটে এল, 'স্যার আপনি দাঁড়িয়ে কেন? আসুন না, ভেতরে এসে বসুন।'

— 'আরে তুমিও তো আমাদের কলেজে পড়ো না?'

— 'হ্যাঁ স্যার, আমার নাম কাহিনী চৌধুরী।' নতমুখে বলল হিয়া।

— 'হ্যাঁ হ্যাঁ, সিলভার মেডেল উইনার তুমি, মনে আছে। তা গোল্ড মেডেলটা ওকে দিয়েছ?'

— 'না মানে আমি ভুলে গিয়েছিল স্যার, এক্ষুনি দিচ্ছি!' হিয়া গোল্ড মেডেলটা নিজের ঘরে রেখে দিয়েছিল, তাড়াতাড়ি ওটা আনতে ছুটল।

শিউলির দিকে ফিরে আকাশ হাসল, 'ভালোই আশ্রয় জুটিয়েছো দেখছি! কেউ ব্যাগপত্র বওয়াচ্ছে , কেউ তোমার পাওয়া প্রাইজ  দিব্যি দিনের পর দিন নিজের কাছে রেখে দিচ্ছে আনন্দমনে, আবার কেউ কেউ তো দেখছি তোমায় প্রাপ্য সম্মানটা পর্যন্ত 

দিচ্ছে না! যাদের জন্য এতো ছোটাছুটি করছ, তারা একবারও খোঁজ নিচ্ছে না যে তুমি কেমন আছো? আবার তাদের বাড়িতে ঢুকতে তোমার এতই ভয় যে হাত পা কাঁপে তোমার! ধন্য এই চৌধুরীবাড়ি!'

— 'আপনি কাহিনীর কলেজের স্যার? বিশ্বাস করুন আমি বুঝতে পারিনি, আই এম এক্সট্রিমলি সরি!' রুমকি কোনোরকমে ঝোক গিলে বলল।

— 'হুম, ভাগ্যিস জানতেন না! নইলে আপনাদের আসল চেহারাটাই তো জানা হত না! আর দ্বিতীয়ত আমি শুধু কাহিনীর কলেজের স্যার নই, আমি কাহিনী আর স্মৃতির কলেজের স্যার। ওকে বাড়ির একজন বলে না ই ভাবুন, অন্তত মানুষ হিসেবে তো ভাবুন!'

— 'আমি স্মৃতি নই স্যার, আমার নাম শিউলি।'

— 'ওহ সরি, আমি বারবার ওই নামটাই বলে ফেলি, স্মৃতি নয়, শিউলি।'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ত্রয়োদশ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

4 মন্তব্যসমূহ

  1. পুরো জমে ক্ষীর, পরের পর্ব পিলিজ 🧡🧡

    উত্তরমুছুন
  2. আমার মতে আমরা এখানে আকাশ এর চরিত্রে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। কারণ আমরা আকাশকে এখনো অবধি খুব কড়া একজন শিক্ষক হিসেবে দেখেছি, যেখানে সে শিউলি কে ক্লাস কামাই করায় তিরস্কার করেছে আর হিয়া কে attendance না দেওয়ার জন্যে। কিন্তু এই পর্বে আমরা সেই আকাশকেই দেখছি শিউলির পাশে এসে দাঁড়াতে এবং এখানে আমরা আকাশ এর softer side টা দেখছি। সব মিলিয়ে দারুন লাগছে পড়তে, পরের পর্বের জন্যে অপেক্ষায় থাকলাম ❤️

    উত্তরমুছুন