Advertisement

কাহিনী (দ্বিতীয় পর্ব)

কাহিনী

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দ্বিতীয় পর্ব


— 'হাসব না বীণামাসি? আজ জানো কি হয়েছে স্কুলে?' 

— 'কি মুশকিল, তুই না বললে কিভাবে জানব বল দেখি?'

— 'জানো বীনামাসি, হিয়া আজকেও স্কুলে এসেছিল হুবহু আমারই মতো চুল বেঁধে, ইভেন একটা ব্যাগ কিনেছে ও, সেটাও একদম আমার ব্যাগটার মতো। এসব দেখে সবাই যেই না বলেছে, কি রে হিয়া তুই আবার কাহিনীকে কপি করেছিস? সেটা শুনেই ম্যাডামের সে কি গোঁসা! বলে, আমি কেন ওকে কপি করতে যাব? ও কি কোনো ফিল্মস্টার? সে কথা শুনে সবাই যেই বলেছে, বাজে বকিস না তো, কপি করে আবার অস্বীকার করা হচ্ছে! সে কথা শুনেই ম্যাডাম গটগট করে হেঁটে কোথায় যেন চলে গেলেন, আর তাকে খুঁজেই পাওয়া গেল না।' 

— 'হিয়া? মানে যে মেয়েটা তোকে হিংসে করে সেই ক্লাস ওয়ান থেকে? ব্যাপারে বাপ্, মেয়েটার এলেম আছে বটে! যার ওপর রাগ, তাকেই কিনা সে অনুকরণ করে! সত্যি হাসির মতোই কান্ড বটে!'

_________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________


ওদিকে চৌধুরী বাড়িতে কাহিনীকে ফিরিয়ে আনার তোড়জোড় চলছে। রুমকি জেদ ধরেছে, সে ই যাবে কাহিনীকে ফিরিয়ে আনার জন্য, আর শেষমেশ বাড়ির সবাই মত দিয়েছেন এতে। 

— 'সত্যি দিদিভাই, ছোট বোনকে বড্ড ভালোবাসো না?' স্নেহমাখা গলায় বললেন হেমনলিনী দেবী। 

— 'আর বলবেন না মা, সেই ছোট থেকে আজ পর্যন্ত ও কাহিনীকে বড্ড মিস করে জানেন? আমায় তো প্রায়ই বলে, মা, যদি আমি আর কাহিনী একসাথে বেড়ে উঠতাম, কত ভালোই না হত!' বললেন কাকলি। 

— 'আর তো মাত্র ক'টা দিন দিদি, তারপরেই তো তোমরা দুই বোন একসাথেই থাকবে গো!' বলে উঠলেন ত্রিদিব বাবু। 


বাড়ির সকলেই ভীষণ আনন্দিত রুমকির বোনের প্রতি এত টান দেখে। কিন্তু এত টানের নেপথ্যে যে কারণ আছে, সেটা যদি সকলে জানতেন তবে কখনোই রুমকিকে যেতে দিতেন না বাঁকুড়ায় কাহিনীকে আনতে। সকলেই জানে, চৌধুরীবাড়ির অতুল ঐশ্বর্য দুজন বংশধর কাহিনী আর রুমকির মধ্যে সমান দুভাগে ভাগ হবে, আর এতেই সমস্যা বাড়ির দুই সদস্য কাকলি আর তাঁর সুযোগ্য মেয়ে রুমকির। দুজনের মনের ইচ্ছে, রুমকি সব সম্পত্তি একা ভোগ করুক, আর তাই মা-মেয়ে প্ল্যান এঁটেছে, কাহিনীকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেবে বরাবরের মতো, আর সেজন্যই কাহিনীকে আনতে যাওয়ার জন্য রুমকির এত আগ্রহ।

— 'তোর রাজরানী হওয়া আর তো মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষা, উফ ভাবতেই যে কি আনন্দ হচ্ছে!'

— 'আমারও তাই গো মা, দেখো না গায়ে কাঁটা দিচ্ছে রীতিমতো।'


কেটে গেল কয়েকমাস। কাহিনীর বয়স আঠারো পূর্ণ হয়েছে ইতিমধ্যে। আজ উচ্চমাধ্যমিকের ফল প্রকাশিত হয়েছে, কাহিনী আবারও স্কুলে ফার্স্ট হয়েছে, আর রুমকিও আজকেই আসছে বাঁকুড়ায়, তাই সব মিলিয়ে কাহিনী খুবই খুশি, তার আনন্দ আর ধরে না। 

— 'কি রে, মায়ের কাছে যাবি বলে তো ভীষণ খুশি, তা কলকাতায় ফিরে এই অভাগী বীণামাসিকে ভুলেই যাবি, তাই না?' 

কাহিনী বীণাপাণির গলা জড়িয়ে ধরে বলল, 'কি যে বলো না তুমি, তোমায় আমি ভুলে যাব? সেটাও সম্ভব?'

হঠাৎই দরজায় কলিং বেলের শব্দ। কাহিনী ছুটে গিয়ে দরজা খুলল। 

— 'আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না! কে আপনি?' 

বীণাপানি এসেও একই প্রশ্ন করল আগুন্তুককে। 

— 'বোঝো কান্ড! তোমরা আমায় চিনলে না তো! আরে বাবা, আমি তোর্সা চৌধুরী, কাহিনীর রুমকি দিদি।'

— 'আরে রুমকি তুই? দেখ দেখি, কত বড়ো হয়ে গেছিস, চিনতেই পারিনি একদম।'

— 'তুমিই আমার রুমকিদি?'

—  'হ্যাঁ রে পাগলী হ্যাঁ, আমিই তোর দিদি। ভেতরে আসতে বলবি না?' 


রুমকি, কাহিনী আর বীণাপানি টেবিলে লাঞ্চ করতে বসল। রুমকি বলল, 'বাঁকুড়ায় কখনো আসিনি আগে, এখন এসেছি যখন, কাহিনীর সাথে গোটা শহরটা আগে ভালো ভাবে ঘুরব, তারপরেই কলকাতা রওনা দেব।'

— 'সে তোরা যতখুশি কাল ঘুরিস কিন্তু আজ একদম নয়, তুই অনেক জার্নি করেছিস রুমকি, সেই কোন সকালে রওনা দিয়েছিস বাড়ি থেকে, আজ তুই ফুল রেস্ট নিবি, কাল যেখানে খুশি ঘুরবি তোরা।' 

— 'আচ্ছা বীণামাসি, তাই হবে। এতবছর পরে আমি আমার বোনকে কাছে পেলাম, আজ শুধু গল্প আর গল্প করব ওর সাথে। কি কাহিনী, আপত্তি নেই তো?' 

— 'আপত্তি?' রুমকির গালদুটো টিপে দিয়ে বলল কাহিনী, 'এত মিষ্টি দিদি আমার, তার সাথে গল্প করতে আবার আপত্তি কিসের হ্যাঁ? তুমি এসো তো, আমার ঘরে এসো, আমার জীবনের সওওব গল্প তোমায় বলব।' 

লাঞ্চ সেরে কাহিনী আর রুমকি সবে বিছানায় বসেছে, অমনি সেখানে এসে হাজির বীণাপানি, 'কি রে কাহিনী, আজ তোদের হিয়া কিছু কান্ড ঘটায়নি?' 

— 'ওর কথা আর কি বলব বলো বীণামাসি, আজকেও সেই এক কান্ড। ক্লাসে আমি হয়েছি ফার্স্ট, আর ও হয়েছে সেকেন্ড, তা সে কি রাগ ওর! বলছে, খাতা দেখা, মার্কস ডিস্ট্রিবিউশন সব নাকি ভুল হয়েছে, তাই নাকি আমি ফার্স্ট হয়েছি, নইলে ও ই নাকি ফার্স্ট হত! ভাবো শুধু!' 

— 'তা তোদের অন্য ক্লাসমেটরা কিছু জবাব দেয়নি?'

— 'দেয়নি আবার? বলল, তুই আর বকিস না তো কাহিনীর কার্বন কপি! সবসময় তুইই তো কাহিনীকে কপি করিস, এতটাই যে চুলটা পর্যন্ত ওর মতো লালচে কোঁকড়ানো বানিয়েছিস, এর মানে কি বল তো? তুই ই কাহিনীকে ফলো করবি আজীবন, ও তোকে করবে না, আর তাই ও ফার্স্ট, আর তুই সেকেন্ড। এই সহজ কথাটা মেনে নে বুঝলি হিয়া!' 

— 'ও ব্বাবা! তা হিয়া ম্যাডাম কি বললেন?' 

— 'আর কি বলবেন? মুখ কালো করে বেরিয়ে গেল হেঁটে, যাওয়ার আগে বলে গেল, 'সময় সবসময় সমান যায় না রে কাহিনী, একদিন আমারও সময় আসবে, সেদিন তোকে আমি দেখে নেব!' বলেই হেঁটে বেরিয়ে গেল ও।' 

— 'বাবা, ধন্যি মেয়ে বটে ওই হিয়া!' 

— 'হিয়া কে রে কাহিনী?' রুমকি জিজ্ঞাসু মুখে তাকায় কাহিনীর দিকে। 

— 'আর বলিস না রুমকি, কাহিনীর এক ক্লাসমেট আছে, কাহিনীকে একেবারে দু'চক্ষে দেখতে পারে না সে মেয়ে। এদিকে কাহিনীর মতোই সে সাজে, এমনকি চুলটাও ওর মতো করেছে, ও বোধহয় ভাবে যে কাহিনীর মতো সাজলেই কাহিনী হতে পারবে ও!' 

সবটা শুনে রুমকি মনে মনে হাসে, 'এ তো দেখি মেঘ না চাইতেই জল! আমার প্ল্যানটা এবার পুরোপুরি ছকে ফেলেছি।'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : তৃতীয় পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ