Advertisement

কাহিনী (তৃতীয় পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
তৃতীয় পর্ব


রুমকি হিয়ার সম্বন্ধে আরও ডিটেলে জানতে চায় কাহিনীর কাছ থেকে, এমনকি ওর বাড়ির ঠিকানাটা পর্যন্ত। 


পরেরদিন সকাল হতে না হতেই রুমকি রওনা দিল হিয়াদের বাড়ির পথে। অনেক আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে রুমকি এসে দাঁড়াল একটা সাদামাটা রংচটা একতলা বাড়ির সামনে। রুমকি সবে কলিং বেলটা টিপতে যাবে হঠাৎ করেই বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে এল কর্কশ কন্ঠ। এক নারীকন্ঠ চিৎকার করে উঠল, 'শোনো ঠাম্মি, একদম জ্ঞান দেবে না আমায় বলে দিচ্ছি! ওই কাহিনীকে দেখলেই আমার গা পিত্তি জ্বলে যায়, ইচ্ছে করে ওকে খুন করে ফেলি আমি! শয়তান মেয়ে একটা, আমার লাইফটা হেল করে দিল ও! যেখানেই যাই, সবাই শুধু কাহিনী, কাহিনী আর কাহিনী করে! বাড়িতে পর্যন্ত এতটুকু শান্তি নেই! এখানেও কাহিনীর গুণগান শুনতে হচ্ছে! অসহ্য!' 

— 'বাপ রে, এ মেয়েকে যতটা ভেবেছিলাম এ তো তার চেয়েও বেশি সাংঘাতিক! এত ঝগড়াটে মেয়ে যে বাড়িতে কাক চিল পর্যন্ত বসতে ভয় পায়!' রুমকি বিড়বিড় করে উঠল। 

রুমকি কলিং বেলটা বাজাতেই একজন বয়স্ক মহিলা বেরিয়ে এলেন। ইনিই যে হিয়ার ঠাম্মি সেটা বুঝতে বাকি ছিল না রুমকির।

_________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________


— 'তুমি কে? তোমায় তো ঠিক চিনলাম না।'

— 'আমি আসলে কাহিনীর দিদি ঠাকুমা, হিয়ার সাথে একটু দরকার ছিল।' 

— 'ও আচ্ছা আচ্ছা, এসো না, ভেতরে এসো।' 


রুমকি এসে ভেতরে বসতেই হিয়ার ঠাম্মি উমা দেবী জলখাবার আনতে রান্নাঘরের দিকে গেলেন, যাওয়ার আগে হিয়াকে ডেকে দিলেন।


হিয়া এসে দাঁড়াল রুমকির সামনে। রুমকি কিছু একটা বলতে যাবে কিন্তু ওকে থামিয়ে দিয়ে হিয়া বলে যেতে লাগল, 'আপনার বোনকে দিয়ে তো উঠতে বসতে আমায় কম অপমান করাননি, তারপরেও শান্তি হয়নি? আবার নিজে বাড়ি বয়ে চলে এসেছেন আমায় অপমান করতে?' 

হিয়া রেগে মেগে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু রুমকি ওকে আটকাল। 

— 'আমি কাহিনীর গুনগান গাইতে আসিনি ম্যাডাম, এসেছি ওকে শেষ করে দিতে।'

হিয়া চমকে তাকাল রুমকির মুখের দিকে। 

— 'হ্যাঁ হিয়া, তুমি ঠিকই শুনেছ। আমিও কাহিনীর শত্রু, আর তুমিও তাই। শত্রুর শত্রু তো বন্ধুই হয় তাই না বলো?' 

হিয়া হাঁ করে রুমকির কথাগুলো গিলছিল। রুমকি ওর সবটা প্ল্যান রসিয়ে রসিয়ে বলল হিয়াকে। হিয়া এককথায় রাজি হয়ে গেল রুমকির কথায়। 

— 'তাহলে ম্যাডাম, তোমায় যেখানে আসতে বললাম আজ বিকেলে, সেখানে আসছ তো?'

— 'একদম রুমকিদি, আপনি চিন্তা করবেন না, আমি ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব সঠিক জায়গায়।' 

উমা দেবী দরজার আড়াল থেকে সবটা শুনলেন। শিউরে উঠলেন তিনি। মা বাবা মরা হিয়াকে সেই এতটুকু বয়স থেকে বড়ো করে তুলেছেন উমা আর তাঁর স্বামী হরিশচন্দ্র। ছোট থেকে সুশিক্ষা দিয়ে বড় করা সত্ত্বেও যে কিভাবে তাঁর নাতনী এমনটা তৈরি হল সেটা ভেবেই অবাক হলেন তিনি। 


রুমকি বাড়িতে ফিরতেই বীণাপানি প্রশ্ন করল, 'সাতসকালে কোথায় বেরিয়েছিলি?'

— 'আসলে বীণামাসি', রুমকি ঢোক গিলে বলল, 'কলকাতায় তো আর এত সুন্দর সকাল দেখতে পাইনা, তাই সকালটা এনজয় করব বলেই বেরিয়েছিলাম গো, কি সুন্দর সকাল দেখলাম আজ, মনটা একেবারে ভরে গেল আহা।'

— 'তা বেশ করেছিস, আমি চা করেছি, আয় খেয়ে নে চটপট।' 


সারাটাদিন রুমকির রীতিমতো টেনশনে কাটল, বিকেলে যে প্ল্যানটা ও সাজিয়েছে সেটা সফল হবে কিনা সেই চিন্তাতেই মগ্ন রইল ও। 


বিকেল হতেই রুমকি দুরুদুরু বুকে কাহিনীর ঘরে এল, 'কি রে বোন, এবার রেডি হ! বেরোতে হবে তো নাকি!' 


কাহিনী আর রুমকি দুজনেই তৈরি হল বেরোবে বলে। বীণাপানিকে প্রণাম করে ওরা রওনা দিল। মনে একরাশ কষ্ট জমে থাকলেও হাসিমুখে বিদায় দিল বীণাপাণি দুজনকে, 'সাবধানে ফিরিস, আর বাড়ি পৌঁছে জানাস।' 

— 'একদম বীণামাসি, তোমায় জানাব সবটা।' রুমকি বলল। 


অন্যদিকে হিয়া তৈরি হয়ে যেই বেরোতে যাবে, উমা দেবী ওকে আটকালেন। 

— 'আমি তোর আর রুমকির সব কথা শুনেছি দিদিভাই, তোরা কাহিনীর সর্বনাশ করতে চাস না রে?'

— 'কি আশ্চর্য! আমি একটু নিজের দরকারে বেরোচ্ছি, ওর ক্ষতি কেন করতে যাব?'

— 'আজ তোকে কোথাও বেরোতে হবে না। কি দরকার আছে বল, তোর দাদু নিয়ে আসবে, কিন্তু তোর কোথাও যাওয়া হবে না।' 

— 'মানে টা কি? এটা কি বাড়ি না জেলখানা?' 

— 'ওসব শক্ত কথা বলে কোনো লাভ নেই দিদিভাই, তুমি আজ কোথাও যাচ্ছ না ব্যাস।' উমাদেবী শক্ত করে হিয়ার হাতটা ধরলেন, কিন্তু আটকাতে পারলেন না। 

হিয়া এক ঝটকা মারল উমা দেবীকে। উমা দেবী ছিটকে পড়লেন মেঝেয়। এমনিতেই হার্টের রুগী তিনি, এই ধাক্কাটা আর সহ্য করতে পারলেন না তিনি, শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। দুর্ভাগ্যবশত হরিশচন্দ্রবাবু সেই সময় বাড়িতে ছিলেন না, তাই হিয়ার বেরোনোটা কেউই আটকাতে পারলেন না। 


বাইরে বেরিয়েই রুমকি একগাল হেসে বলল, 'এ কাহিনী, এবার তুই আমায় শহর ঘুরিয়ে দেখা। জানিস বোন, আমার পাহাড় বড্ড প্রিয়। একটু শহরটা ঘুরে নিই আমরা, তারপরেই কলকাতার দিকে রওনা দেব।' 

— 'তাই? তাহলে বলব আজ তুমি খুব খুশি হবে, এত্ত পাহাড় দেখাব না আজ, শুধু দেখো!' 

একটু পরেই ওরা এসে দাঁড়াল একটা পাহাড়ের সামনে। 

— 'এই নাও রুমকিদি, তোমায় পাহাড়ে নিয়ে এলাম, এবার মন ভরে দেখো।' 

— 'সে তো দেখব, তার আগে তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ  আছে, দেখবি?'

— 'সারপ্রাইজ পেতে কার না ভালো লাগে! কি সারপ্রাইজ দেখি!' 

— 'ওদিকে দেখ, কাহিনী!' 

রুমকির আঙুল বরাবর কাহিনী তাকিয়ে দেখে, হিয়া দাঁড়িয়ে আছে। 

— 'এ কি হিয়া, তুই এখানে কি করছিস?' 

হিয়া কিছু না বলে শুধু বাঁকা হাসি হাসল। রুমকি উত্তর দিল, 'আমি ডেকেছি ওকে কাহিনী!'

— 'তুমি ডেকেছ? ওয়েট, এইজন্যই কি তুমি ওর সম্পর্কে....'

— 'হ্যাঁ রে আমার বুদ্ধিমতী বোন, সেইজন্যই ওর সম্পর্কে সবকিছু আমি জানতে চেয়েছিলাম, যাতে আমার উদ্দেশ্য সফল হয়।'

— 'তোমার উদ্দেশ্য? কি তোমার উদ্দেশ্য? আর তাতে হিয়াকে কিসের দরকার পড়ল তোমার?'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : চতুর্থ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ