শত্রুমিত্র
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চতুর্থ পর্ব
পরেরদিন ক্লাসে গিয়ে রিমঝিম দেখে,আবার জটলা হচ্ছে ঝুম্পাকে ঘিরে।সৌরভ নাকি সামনের সোমবার কলেজের সামনে যে পার্কটা আছে ওখানে ঝুম্পাকে প্রোপোজ করবে,এই কথাটা ঝুম্পা এসে বলতেই সবাই ঘিরে ধরেছে ওকে।
— 'এই তো সুবর্ণ সুযোগ!'রিমঝিম মনে মনে হাসল,'শিপ্রা মামণি,সেদিন আমায় অনেক কথা শোনালে,এবার তোমায় প্রমাণ আমি দেবই।'
সৌরভ সেদিনও কলেজ আসেনি।শিপ্রা ক্যান্টিনে একাই বসেছিল।রিমঝিম তাড়াতাড়ি ক্যান্টিনে ঢুকেই শিপ্রার পাশে এসে বসল।শিপ্রা দেখে বেশ বিরক্ত হল,'কি ব্যাপার!তুই আমার পাশে?'
— 'আমি প্রমাণ দেব তোকে।এই সোমবারই দেব!'
— 'কি!' শিপ্রা ভীষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রিমঝিমের দিকে।
— 'আমার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই,সোমবার ঠিক বিকেল পাঁচটায় গ্রিনস পার্কে আসিস,ওখানেই দেখা হবে,আর প্রমাণও ওখানেই দেব।এখন চলি।বাই।' রিমঝিম চলে এল ক্যান্টিন থেকে।
যথারীতি নির্দিষ্ট দিনে বিকেল পাঁচটায় পার্কে এসে হাজির হল শিপ্রা।রিমঝিম আগে থেকেই উপস্থিত ছিল সেখানে।শিপ্রা আসতেই ওর হাত ধরে টেনে একটা ঝোপের আড়ালে নিয়ে গেল ওকে রিমঝিম।
প্রায় আধঘণ্টা হয়ে গেল,তবু ঝুম্পা বা সৌরভ কারোরই দেখা নেই।
— 'ধুর,দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পা ব্যথা হয়ে গেল।'শিপ্রা বিরক্ত হয়ে উঠল,'আর ঝোপের মধ্যে কি মশা,আমার হাত পা ফুলিয়ে দিল কামড়ে,কখন দিবি তুই প্রমাণ?'
— 'আরে দাঁড়া না,আর একটুখানি দাঁড়া,সবটা প্রমাণ হয়ে যাবে তোর চোখের সামনে।' রিমঝিম মুখে এতটা নিশ্চিন্তি দেখালেও ভেতরে ভেতরে ও ও বেশ অস্থির হয়ে উঠল, ভাবল,'ব্যাটাচ্ছেলে কি টের পেয়ে গেছে নাকি?আজ কি ঝুম্পাকে নিয়ে ও এখানে আসবে না?'
— 'ধুর,কেন যে তোর কথা শুনে এখানে এলাম!এবার মশার কামড়ে ডেঙ্গু না হয়!'
— 'আরে দাঁড়া দাঁড়া!চুপ কর!ওই দেখ!'
শিপ্রা রিমঝিমের ইশারা মতো তাকাল,দেখল সৌরভ আর ঝুম্পা আসছে,একে অপরের হাত ধরে,আর দিব্যি খোশগল্পে মগ্ন।শিপ্রা সৌরভকে ডাকতে যাচ্ছিল,কিন্তু রিমঝিম ওকে তাড়াতাড়ি টেনে নিয়ে এল ঝোপের আড়ালে।
— 'তুই না বুদ্ধুই থেকে গেলি জানিস তো!তোকে এখানে আনলাম প্রমাণ দেওয়ার জন্য,আর তুই কিনা সবটা গুবলেট করে দিবি!আপন ভালো পাগলেও বোঝে,কিন্তু তুই...'
— 'থাক,থাক আর জ্ঞান দিয়ে কাজ নেই!তা এই মেয়েটা কে?একে তো চিনিনা আমি!'
— 'আরে ও ই তো ঝুম্পা,আমার ক্লাসমেট।'
— 'আচ্ছা এই সেই মেয়ে?'
— 'হ্যাঁ,এবার চুপচাপ দেখ কি হয়!'
সৌরভ আর ঝুম্পা এরপর হাত ধরে এগিয়ে এল,রিমঝিম আর শিপ্রা যে ঝোপের আড়ালে ছিল,সেই ঝোপের কাছাকাছি এসে দাঁড়াল ওরা।
এরপর সৌরভ হাঁটু গেড়ে বসল ঝুম্পার সামনে,একতোড়া গোলাপ দিয়ে প্রোপোজ করল ওকে।ঝুম্পাও সলজ্জ হেসে বলল,'লাভ ইউ টু।'
— 'দেখ,দেখ শিপ্রা,তোর ভালোমানুষ সৌরভের আসল চরিত্রটা দেখ!'
শিপ্রা তখন অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে সৌরভের দিকে।যাকে ও সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছিল,সেই মানুষটার এই আচরণ দেখে থ হয়ে গেল ও।ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ও।
— 'ছিঃ!সৌরভ! তুমি এতটা নীচ!'
শিপ্রার এই চিৎকারে হকচকিয়ে গেল সৌরভ আর ঝুম্পা।
— 'শিপ্রা,তুমি!' এক ভয়ার্ত গলায় বলল সৌরভ।
— 'হ্যাঁ আমি!কেন আমায় এক্সপেক্ট করোনি বুঝি এখন?ভুল সময়ে এন্ট্রি নিয়ে ফেললাম বুঝি?'
— 'শিপ্রা আমার কথাটা একবার....'
— 'ব্যস সৌরভ! একজন ঠগ,জোচ্চোরের কাছ থেকে কিচ্ছু শোনার নেই আমার!'
— 'সৌরভ ও কে?' ঝুম্পা অবাক গলায় প্রশ্ন করল।
— 'আমি বলছি আমি কে!' শিপ্রা বলে যেতে লাগল,'আমি ওর অন্য এক প্রেমিকা,তোমার মতোই ওকে ভালোবেসে ঠকেছি!'
— 'কি!' ঝুম্পার গলায় তখনও বিস্ময়।
— 'হ্যাঁ,ও যা বলছে সব সত্যি।'রিমঝিম বলল,'না জানি তোর আর শিপ্রার মতো আর কত মেয়েকে ও ঠকিয়েছে!'
— 'কি বলছিস টা কি তুই রিম?' সৌরভের দিকে তাকিয়ে বলল ঝুম্পা,'এসব কি শুনছি!'
সৌরভ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল,কিন্তু ওকে থামিয়ে দিয়ে রিমঝিম বলল,'শিপ্রা আর আমি যা বলছি সবটা সত্যি।আমার কাছে প্রমাণও আছে ঝুমি,দেখ,' বলেই সেদিন রেস্টুরেন্টে শিপ্রা আর সৌরভের তোলা ছবিটা ঝুম্পাকে দেখাল রিমঝিম।
— 'এবার দেখলি তো ঝুমি,শিপ্রা,যাকে তোরা ভালোবাসিস,সে আসলে কেমন ভালোমানুষ!'
— 'ছি!সৌরভ!' বলেই ঝুম্পা আর এক মিনিটও দাঁড়াল না সেখানে,চলে গেল দৌড়ে।
— 'ঝুম্পা!' বলে ডাকতে ডাকতে সৌরভও চলে গেল ওর পিছন পিছন।
আর শিপ্রা সেখানে বসে পড়ল একবুক হতাশা নিয়ে।
— 'শিপ্রা!' রিমঝিম ছুটে এল ওর কাছে, 'শিপ্রা শান্ত হ!'
— 'কি শান্ত হব আমি রিমঝিম! কি শান্ত হব বল্!যাকে সবটুকু উজাড় করে ভালোবাসলাম,সে এভাবে নিঃস্ব করে চলে গেল!এখন আমি কি নিয়ে বাঁঁচব বল তো রিমঝিম,কি নিয়ে বাঁঁচব!মাম্মাম বাপি ওর ব্যাপারে সবটুকু জানে,বাড়ি ফিরে ওদের আমি কি জবাব দেব বল!'
— 'শিপ্রা,দোষ সৌরভ করেছে,তুই তো কোনো দোষ করিসনি,তাহলে তোকে জবাবদিহি কেন করতে হবে?আর কিসব বলছিলি বাঁচব না টাচব না,এসব কি কথা!ওই ফালতু ছেলেটার জন্য তুই কেন মরতে যাবি রে মাথামোটা মেয়ে!'
— 'তুই বুঝবি না রে,তুই তো ভালোবাসিস নি কাউকে!' শিপ্রা কেঁদে ফেলল এবার।
— 'ধুস,রাখ তো তোর ভালোবাসা টালোবাসা,' রিমঝিম দু হাতে চোখের জল মুছিয়ে দিল শিপ্রার,'এইভাবে কেউ কাঁদে বোকা!'
শিপ্রা আর সামলাতে পারল না নিজেকে,রিমঝিমের বুকে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে শুরু করল ও শিশুর মতো।ওর কান্না দেখে রিমঝিমও নিজেকে সামলাতে পারল না,ওর চোখেও জল এল।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : পঞ্চম এবং অন্তিম পর্ব
1 মন্তব্যসমূহ
Asadharon lekhoni apnar.
উত্তরমুছুন