Advertisement

কাহিনী (চতুঃষষ্টি পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চতুঃষষ্টি পর্ব



প্রকাশ নিজের মোবাইলটা উকিলবাবুর হাতে তুলে দিলেন, 'এখানে দীপকের সাথে সব কথার রেকর্ডিং আছে। আমি জানতাম ও যা ধড়িবাজ, ধরা পড়লে ও আমাকেই ফাঁসিয়ে নিজের পিঠ বাঁচাবে, তাই ওর আর আমার সব কথা আমি রেকর্ড করে রেখেছি।' ভাবলেশহীন কন্ঠে বললেন প্রকাশ।


রেকর্ডিংটা চালানো হল, আর তাতে স্পষ্ট হয়ে গেল যে দীপকের বলা সব কথাই মিথ্যে। তিনি স্বেচ্ছায় প্রকাশের পরিকল্পনায় সামিল হয়েছিলেন অর্থলোভে।

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


— 'মিলর্ড,' আকাশের পক্ষের উকিল বলতে লাগলেন, 'প্রকাশ ব্যানার্জীই যে আসল অপরাধী এবং আমার মক্কেল আকাশ ব্যানার্জী যে সম্পূর্ণ নির্দোষ সেটা প্রমাণিত। আমি আমার মক্কেলের মুক্তি চাই, আর সেই সাথে ওই প্রকাশ ব্যানার্জীর কঠিন শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। আর দীপক কুমার দাস পুলিশ হয়েও যেভাবে অন্যায় করেছেন, নিজের উর্দির চূড়ান্ত অপমান করেছেন, নির্দোষ মানুষকে লকাপে টেনে এনেছেন, ওনারও যথাযোগ্য শাস্তির দাবি করছি মিলর্ড।'

— 'আপনার আর কিছু বলার আছে?' প্রকাশের পক্ষের উকিলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন জজসাহেব।

— 'হ্যাঁ মিলর্ড।'

— 'বলুন।'

— 'মিলর্ড, আমি জানি আমার প্রতিপক্ষীয় বন্ধু অনেক সাক্ষী, তথ্যপ্রমাণ পেশ করেছেন যাতে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে আকাশ ব্যানার্জী নির্দোষ আর আমার মক্কেল প্রকাশ ব্যানার্জীই মাস্টারমাইন্ড। তবুও আমার বুদ্ধি বলছে, এখানে যা যা দেখানো হচ্ছে, শোনানো হচ্ছে, এর সবটাই সত্যি নয়, অর্ধসত্য দেখছি আমরা এখানে। তাই আমি মনে করি...'

— 'সরি তো ইন্টারাপ্ট মিলর্ড, কিন্তু আইন প্রমাণে বিশ্বাসী, কারোর মনে করা দিয়ে আদালত চলে না। আর তাছাড়া মিলর্ড, প্রকাশ ব্যানার্জী যেরকম ভয়ঙ্কর একজন লোক, ওনাকে আর একটাদিনও যদি ছেড়ে রাখা হয়, উনি যে আরও কত মানুষকে বিপদে ফেলবেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আর তাছাড়া এই যে মানুষগুলো, কাহিনী চৌধুরী, ডক্টর মিশ্র, ইন্দ্রজিৎ দস্তিদারসহ স্কলাররা, বনশ্রী মুর্মু, তোর্সা চৌধুরী যাঁরা ওনার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছেন, প্রমাণ জোগাড় করেছেন, এনাদের সুস্থভাবে বাঁচতে দেবেন ওই প্রকাশ ব্যানার্জী? দেবেন না। ওনাদের জীবন উনি হেল করে দেবেন। শুধু তাই নয়, আকাশ ব্যানার্জী, সোনালি মৈত্র এঁদেরও ছাড়বেন উনি? আমার বিশ্বাস উত্তরটা হবে না।' একটু থেমে বলতে লাগলেন তিনি, 'আর তাছাড়া একটু আগে তো প্রকাশবাবু নিজের মুখেই স্বীকার করলেন সত্যিটা যে ওনার প্ল্যানে দীপকবাবু স্বেচ্ছায় ইনভলভড হয়েছিলেন, তাহলে প্ল্যানটা যে ওনারই তাতে তো কোনো সন্দেহই নেই আর!'

গোটা কোর্টরুম জুড়ে এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল। স্মৃতি আর আকাশের মুখে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল, একে অপরের দিকে তাকাল ওরা।

নিস্তব্ধতা ভাঙল জজসাহেবের গলায়। সবাই আগ্রহভরে তাকাল জজসাহেবের মুখের দিকে। তিনি বললেন, 'সব সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এটা স্পষ্ট যে আকাশ ব্যানার্জী সম্পূর্ণ নির্দোষ, সোনালি মৈত্রকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দিয়েছেন প্রকাশ ব্যানার্জী। শুধু তাই নয়, থিসিস চুরি, আদালতকে ভুল পথে পরিচালনা করা, জয়ন্ত মুর্মুকে ঘরে আটকে রাখা, এইসবের জন্যও তাঁর যথোচিত শাস্তি প্রাপ্য। তাই এই আদালত আকাশ ব্যানার্জীকে বেকসুর খালাস করার আদেশ দিচ্ছে, আর সেই সাথে প্রকাশ ব্যানার্জী, আর ইন্দ্রজিৎ দস্তিদারকে গ্রেপ্তার করার আদেশ দিচ্ছে। আর দীপক কুমার দাস আইনের রক্ষক হয়েও যেভাবে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে একজন নির্দোষ মানুষের সাথে অন্যায় করেছেন, আদালতকে অপমান করেছেন, এর জন্য তাঁকে শো কজ করার আদেশ দিচ্ছে।'


আকাশ, স্মৃতি, সোনালি, সঞ্জয়সহ চৌধুরীবাড়ির সকলের মুখে ফুটে উঠল হাসি। প্রকাশ ব্যানার্জী আর ইন্দ্রজিৎ দস্তিদারের হাতে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। দীপকও মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলেন কোর্টরুম থেকে। প্রকাশের পক্ষের উকিলও গজগজ করতে করতে গেলেন ওদের পেছন পেছন, 'দুই বন্ধু নিজেদের চাকরি তো হারালই, সাথে আমার নাকটাও এমন কাটল যে এরপর ক্লায়েন্ট পাওয়াই মুশকিল হবে আমার!'


আকাশ এসেই স্মৃতিকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। কান্নায় ভেঙে পড়ল ওরা, কিন্তু এই কান্না কষ্টের নয়, দুঃখ বা যন্ত্রণারও নয়, এই কান্না আনন্দের, ভালোবাসার মানুষটিকে আবারও স্বাভাবিকভাবে ফিরে পাওয়ার সুখানুভূতির।

— 'এই ক'দিন তোমার ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে আকাশ, খাওয়া ঘুম কিচ্ছু ঠিকভাবে হয়নি, তোমার প্রপার রেস্টের দরকার খুব!'

— 'যাব তো স্মৃতি, আমিও তো আমার স্মৃতিকে ছাড়াই দিনগুলো কাটিয়েছি, আজ আবার তাকে ফিরে পেলাম আগের মতোই,' চোখের জল মুছে নিয়ে আকাশ বলল, 'মেঘা কই স্মৃতি?'

স্মৃতি হাসিমুখে ডাকল, 'কাবেরীদি!'

কাবেরী মেঘাকে আকাশের কোলে দিল।

— 'জানো আকাশ, মেঘা এই ক'দিন বড্ড কান্নাকাটি করেছে, বোধহয় বাবার অভাবটা ফিল করেছে খুবই।'

— 'হ্যাঁ দাদাবাবু', কাবেরী বলল, 'এই দেখো একটু আগেও খুকুমণি কাঁদছিল, এখন দেখো কান্না থেমে গেছে, আর মুখে হাসি ফুটেছে।'


আকাশ মেঘার কপালে স্নেহচুম্বন করল।


— 'আকাশ, স্মৃতি,' এগিয়ে এলেন সোনালি, 'আমার জন্য তোদের দুটিকে অনেক সইতে হয়েছে, আর নয়। আমার ফ্ল্যাটটা আমি তোদের নামে লিখে দিয়েছি, আর আমি কলকাতা থেকে চলে যাচ্ছি অনেক দূরে, ব্যাঙ্গালোরে। ওখানে একটা কলেজে অ্যাপ্লাই করব ভাবছি, আশা করি পেয়েও যাব। ওখানে পেলেই এখানকার কলেজের চাকরিটা ছেড়ে ওখানেই চলে যাব। আমার এই কালো অপয়া ছায়া আর তোদের জীবনে পড়বে না দেখিস!'

সোনালি এগিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ আকাশের গলা শোনা গেল, 'মা!'

সোনালি ফিরে তাকালেন, 'তুই আমায় মা বলে ডাকলি বাবা!'

— 'হ্যাঁ, মাকে মা বলে ডেকেছি, এটাই তো স্বাভাবিক! আর তুমি যদি আমাদের ছেড়ে দূরে চলে যাও, তবে আমরা যে মরে বেঁচে থাকব মা, সেটা কি আদৌ জীবন হবে কোনো?'

— 'আকাশ একদম ঠিক বলছে গো মা!' স্মৃতি হাসল।

— 'স্মৃতি, তুইও আমায় মা বলে ডাকলি?'

— 'ওমা, তুমি কি কেবল আকাশের মা? আমার মা নও?' স্মৃতি এগিয়ে গেল সোনালির দিকে, 'মা কখনো সন্তানের জন্য অপয়া হয় না গো মা। আর তুমি যখন হসপিটালাইজড ছিলে, আকাশ কত কেঁদেছে, টেনশন করেছে তুমি জানো? এসব শুনেও তুমি চলে যাবে?


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : পঞ্চষষ্টি পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ