কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দ্বিপঞ্চাশৎ পর্ব
— 'স্বর্ণ কেমন আছে?'
— 'ট্যাবলেটগুলো ওয়াশ করা হয়েছে, সি ইজ আউট অফ ডেঞ্জার, তবে এখনো জ্ঞান ফেরেনি ওঁর।'
— 'আমি কি ওঁকে একবার দেখতে যেতে পারি?'
— 'যান, তবে কথা বলবেন না কিন্তু।'
— 'আমিও যেতে চাই ম্যাডাম।' আকাশ উদগ্রীব হয়ে পড়ল।
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
সঞ্জয় আর আকাশ ঢুকলেন ঘরে। সোনালি অঘোরে ঘুমোচ্ছিলেন। ডাক্তারও ছিলেন ঘরে, ওঁরা ঘরে ঢুকতেই তিনি প্রশ্ন করলেন, 'উনি কি ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন?'
— 'না স্যার, মামণি তো দিব্যি হাসিখুশি ছিল, একবারের জন্যও মনে হয়নি মনে কোনো কষ্ট জমে আছে, এমনকি আজ আমরা যখন কলেজে যাব বলে বেরোচ্ছিলাম, তখনও তো মামণি হাসিমুখেই বিদায় দিল আমাদের।'
— 'আকাশ!' সঞ্জয় শ্লেষের হাসি হাসল, 'তুমি তোমার মাকে এখনও চিনতে পারোনি। হাজার দুঃখ বুকে চেপেও কিভাবে হাসিমুখে থাকতে হয়, তা ওর চেয়ে ভালো আর কে জানে! তবে হ্যাঁ', একটু থেমে সঞ্জয় বলল, 'তবে এটুকু জানি ও খুব লড়াকু মানুষ। হাজার অপমান, না পাওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করেও ও প্রত্যেকটা দিন লড়াই করে গেছে, কখনো নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি, এমনকি তোমার কাছ থেকে আঘাত পেয়েও আকাশ, তবে আজ এমন কি হল বলো তো, যাতে!'
— 'আমিও তো সেটাই ভাবছি।'
— 'যা হয়ে গেছে তা তো গেছে, তবে চেষ্টা করবেন যাতে আর এরকম ঘটনার রিপিট না হয়। যদি একবারের জন্যও মনে হয়, উনি মানসিক অবসাদে রয়েছেন, সাথে সাথেই সাইকোলজিস্টের সাথে যোগাযোগ করবেন, কেমন? ওখানে ডিপ্রেশন থেকে বের করে আনার দায়িত্ব কিন্তু আপনাদেরই।'
আকাশ আর সঞ্জয় বেরিয়ে আসার পরেই স্মৃতি গেল সোনালিকে দেখতে। সোনালির কপালে হাত বুলিয়ে ও বেরিয়ে আসতেই দেখে পুলিশ এসে হাজির।
— 'এ কি, পুলিশ কেন?'
— 'আমিও তো সেটাই ভাবছি স্মৃতি, হঠাৎ হসপিটালে পুলিশ কেন?'
একটু পরেই পুলিশরা প্রশ্ন করল, 'এখানে আকাশ ব্যানার্জী কে আছেন?'
আকাশ এগিয়ে গেল, 'আমিই আকাশ, কি দরকার বলুন!'
— 'মিস্টার ব্যানার্জী, মিস সোনালি মৈত্রকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে আপনাকে অ্যারেস্ট করা হচ্ছে।'
— 'হোয়াট?'
— 'কি বলছেন অফিসার? কোনো প্রমাণ ছাড়া এভাবে আকাশকে আপনি অ্যারেস্ট করতে পারেন না!'
— 'প্রমাণ ছাড়া তো আমরা কাজ করি না ম্যাডাম। এই নিন প্রমাণ!'
অফিসার একটা রেকর্ডিং চালালেন। রেকর্ডিংয়ে শোনা যাচ্ছে সোনালির গলা।
— 'হ্যাঁ আকাশ, ফোন করলি কেন বাবা? তোরা কলেজে সাবধানে পৌঁছেছিস তো?'
— 'এই সোনালি মৈত্র, একদম ন্যাকামি করবে না! নোংরা ক্যারেক্টরলেস মহিলা কোথাকার, বাড়িতে বর রেখেও বাইরের পুরুষমানুষের সাথে ঢলাঢলি করে আমায় জন্ম দিয়েছ, তারপরেও এসেছ মায়ের অধিকার দাবি করতে? উফ কি কুক্ষণে তোমাকে প্রতিদিন চোখের সামনে দেখতে হচ্ছে!'
— 'আকাশ এসব কি বলছিস তুই? তুই আমায় পছন্দ করিস না তা আমি জানি, তাই বলে তুই মায়ের সাথে এরকম ভাষায় কথা বলবি?'
— 'কে মা? কিসের মা হ্যাঁ? শোনো, আমি তোমায় দুদন্ডও সহ্য করতে পারি না ওই বাড়িতে, নেহাত স্মৃতি কষ্ট পাবে বলে কিচ্ছু বলি না আমি! আর তুমি কি সাংঘাতিক মহিলা, স্মৃতিকে সহজ সরল পেয়ে এমন মাথাটা চিবিয়ে খেলে ওর যে তোমার বিরুদ্ধে একটাও নেগেটিভ কথা ও নিতে পারে না ও!'
— 'আমি কারোর মাথা চিবিয়ে খাইনি আকাশ, স্মৃতি খুব বুদ্ধিমতী আর সেন্সিবল মেয়ে, তাই আমার কষ্টটা বুঝেছে ও। অথচ তুই আমার পেটের ছেলে হয়েও আমাকে বুঝলি না, উলটে অপমান করছিস এভাবে! আকাশ, নিজের মাকে অপমান করলে যে সেই কাদা নিজের গালেই লাগে, তা তুই জানিস না?'
— 'না জানি না আমি! আর তুমি একদম এসব জ্ঞান দেবে না আমায়! আমার কোনো মা নেই, আর যদি কেউ থেকেও থাকে, সে আমার কাছে মৃত।'
— 'তুই আমার মৃত্যু কামনা করছিস আকাশ?'
— 'হ্যাঁ করছি! এত লোক রোজ মরে, তুমি মরতে পারো না? তাহলে অন্তত আমার বুকের জ্বালাটা একটু জুড়োত।'
— 'বেশ, তুই যখন চাস, আমি মরেই যাব। আর এই পোড়া মুখ তোকে দেখতে হবে না রে!' সোনালির কান্নার আওয়াজ শোনা গেল।
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ তাই যাও! আর তুমি যদি না মরো, তাহলে আমিই সুইসাইড করব!'
— 'না বাবা, তোর সামনে লম্বা জীবন পড়ে আছে, তোর স্ত্রী আছে, একটা বাচ্চা আছে, তাদেরও যে তোকেই দেখতে হবে, তাই তোর বেঁচে থাকাটা খুবই জরুরি। বরং আমিই মরে যাই, এই দুনিয়ায় আমায় কেউ চায় না, আমি না থাকলেও কারোর কিছু এসে যাবে না, হ্যাঁ শুধু সঞ্জয়ই একটু কাঁদবে, এই যা। কিন্তু ওর জীবনেও তো ওর মা আছে, বোন আছে, ছেলে আছে, ছেলের বৌ এমনকি নাতনীও আছে, তাই আমাকে ভুলতে বেশি সময় লাগবে না ওর। তুই চিন্তা করিস না বাবা, আজ বাড়ি ফিরে আর এই অভাগী মা টাকে আর তোকে দেখতে হবে না রে। ভালো থাকিস তোরা। রাখছি।'
— 'কি ম্যাডাম, এটা আপনার হাজব্যান্ডেরই গলা তো?'
— 'হ্যাঁ, এটা আকাশেরই গলা, কিন্তু ও এভাবে মামণির সাথে কথা বলতেই পারে না, আমি তো চিনি ওকে!'
— 'হ্যাঁ স্মৃতি, বিশ্বাস করো, আমি এসব বলিনি!'
সঞ্জয় এগিয়ে এসেই আকাশকে এক চড় মারলেন।
— 'তুমি স্বর্ণকে যখন এতই ঘৃণা করো, ওর ফ্ল্যাট থেকে চলে গেলেই পারতে! তা না করে ওকে সুইসাইড করতে বাধ্য করলে তুমি? কেন করলে? আজ মনে হচ্ছে, ওকে যদি অ্যাবরশন করাতে বলতাম, ওর জীবনটা অনেক সুখের হত!'
কান্নায় ভেঙে পড়লেন সঞ্জয়। স্মৃতি এগিয়ে এল, 'তুমি ভুল বুঝছ আকাশকে আঙ্কেল, যে নিজের স্ত্রীর অপমানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, সে নিজের মাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে? না না আঙ্কেল, আমার বিশ্বাস, কেউ আকাশকে ফাঁসাচ্ছে।'
— 'ম্যাডাম, আইন প্রমাণে বিশ্বাস করে, কারোর মুখের কথাকে নয়। এটা যে আকাশ ব্যানার্জীর গলা সেটা তো প্রমাণিত, আর শুধু তাই নয়, সোনালি দেবীর ফোন চেক করে আমরা জানতে পেরেছি লাস্ট কলটা এসেছিল আকাশ ব্যানার্জীর মোবাইল থেকে, আর তারপরেই....' একটু থেমে অফিসার বললেন, 'সব প্রমাণই আকাশ ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে, তাই ওনাকে নিয়ে যেতে আমরা বাধ্য। চলুন আকাশবাবু, দেরি করবেন না।'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ত্রিপঞ্চাশৎ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ