কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ত্রিপঞ্চাশৎ পর্ব

— 'কিন্তু স্যার, অভিযোগটা করল কে? আর রেকর্ডিংটা কে দিল? এটা তো বলে যান!'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
কিন্তু পুলিশ ততক্ষণে আকাশকে নিয়ে রওনা দিয়ে দিয়েছে, স্মৃতি আর প্রশ্নের উত্তর পেল না।
— 'আচ্ছা আঙ্কেল, পুলিশের কাছে কি তুমি অভিযোগ করেছ?'
— 'না গো স্মৃতি, আমি তো জানতামই না এসব, এই তো অফিসার আসার পরেই সবটা জানলাম আমি!'
— 'তাহলে কে বলো তো? আকাশ জেলে গেলে কার লাভ?'
— 'সেটাই তো ভাবছি!'
— 'জানো আঙ্কেল, আজ সকালে আমরা যখন কলেজ যাচ্ছিলাম, কিছু লোক এসে আকাশের মোবাইলটা কেড়ে নিয়েছিল, আবার একটু পরে একটা বাচ্চা ছেলের হাত দিয়ে মোবাইলটা ফেরতও দিয়ে যায়, ব্যাপারটা গোলমেলে না?'
— 'হ্যাঁ, শুধু গোলমেলেই নয়, সাথে এটাও পরিষ্কার যে আকাশকে ফাঁসানো হয়েছে।' একটু থেমে সঞ্জয় বললেন, 'অফিসারকে এসব বললে না কেন তুমি?'
— 'ওনারা তো কিছু শুনলেনই না, তুমি তো দেখলে!'
— 'শোনো স্মৃতি, আমি এখানে রইলাম, তুমি বরং এক্ষুণি থানায় যাও, আর সবটা বলো অফিসারকে।'
— 'হুম আঙ্কেল, আমি এক্ষুণি সৌনকদাকে ফোন করেই যাচ্ছি।'
স্মৃতি সবে সৌনককে ফোন করতে যাবে হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন প্রকাশ ব্যানার্জী। এসেই তিনি স্মৃতিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'বৌমা, সোনালি খুব অসুস্থ শুনলাম, কেমন আছে ও এখন? কি হয়েছে গো ওর?'
প্রকাশবাবুর এখানে আসাটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল, তাই স্মৃতি আর সঞ্জয় একেবারে হতবাক হয়ে গেল।
— 'তুমি কিভাবে জানলে প্রকাশ, যে স্বর্ণ হসপিটালে আছে?'
— 'আরে সঞ্জয় যে! ভালো আছো?'
— 'চলে যাচ্ছে। তুমি কেমন?'
— 'আমারও চলেই যাচ্ছে।' প্রকাশ বাঁকা হাসলেন, 'আর তুমি কি যেন আস্ক করছিলে? আমি কিভাবে জানলাম। সঞ্জয়, আমি জানি সোনালি কোনোদিন আমায় ভালোবাসেনি, ও তোমাকেই ভালোবেসেছে, কিন্তু আমি তো ওকে ভালোবেসেছি! আমার প্রথমা স্ত্রী ও, ও আমার খোঁজ রাখেনি বলে কি আমিও ওর খোঁজ রাখব না?'
— 'হুম, সেই!' শ্লেষের হাসি হাসল সঞ্জয়।
স্মৃতির ভীষণ বিরক্ত লাগছিল এসব শুনতে, সোনালির জীবনের কোনো ঘটনাই ওর অজানা নয়। কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ করা ওর স্বভাব নয়, তাই মনের রাগ চেপে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল ও।
এদিক ওদিক তাকিয়ে প্রকাশ বললেন, 'আকাশ কোথায় বৌমা? সত্যি এই ছেলেটাকে নিয়ে আর পারলাম না আমি! আরে বাবা মাকে যতই অপছন্দ করিস তুই, সে তো তোর নিজের মা, তার এতবড় সংকটের দিনেও তুই তাকে দেখতে আসবি না?'
— 'আপনি যেরকম ভাবছেন প্রকাশ আঙ্কেল আকাশ সেরকম মানুষ নয়', বিরক্তির সুরে বলল স্মৃতি, 'ও এসেছিল মামণিকে দেখতে, কিন্তু পুলিশ ওকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে চলে গেছে।'
— 'সে কি কথা? পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে? কেন?' প্রকাশবাবু নকল দুশ্চিন্তার সুরে বললেন।
সঞ্জয় বিরক্ত হয়ে চলে যাচ্ছিলেন, স্মৃতি ডাকল, 'কোথায় যাচ্ছ আঙ্কেল?'
— 'আমার এই পরিবেশে বড্ড দম আটকে আসছে স্মৃতি, তাই একটু বাইরে যাচ্ছি।'
— 'আসলে বৌমা, আমি এসেছি তো, তাই ও চলে যাচ্ছে। আমাকে একদমই পছন্দ করে না কিনা!'
সঞ্জয় আর দাঁড়ালেন না, বেরিয়ে গেলেন বাইরে। স্মৃতিও আর দেরি না করে রওনা দিল থানার দিকে।
— 'আকাশ ব্যানার্জীর সাথে আমি দেখা করতে চাই অফিসার।'
— 'যান, তবে পাঁচ মিনিটের বেশি নয় কিন্তু।'
স্মৃতি একরকম দৌড়ে গেল লকাপের দিকে। আকাশ ভেতরে মুখ গুঁজে বসে ছিল।
— 'আকাশ!'
স্মৃতির ডাকে আকাশ মুখ তুলল, তারপরেই ছুটে এল স্মৃতির দিকে। স্মৃতির হাতদুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে আকাশ বলল, 'বিশ্বাস করো স্মৃতি, আমি ফোনটা করিনি মামণিকে, ওইসব খারাপ কথাও বলিনি।'
— 'আকাশ প্লিজ! তুমি আমাকে বলবে তার পর আমি তোমায় বিশ্বাস করব? তোমাকে আমার চেয়ে ভালো কে চেনে তুমি বলো তো! আর আকাশ, ফোনটা যে তুমি করো নি সেটা আর কেউ না বুঝুক আমি বুঝে গেছি।'
আকাশ স্মৃতির গালে হাত রেখে বলল, 'কি জানতে পেরেছ তুমি?'
— 'আকাশ, অফিসার বললেন ফোনটা এসেছিল পৌনে এগারোটার সময়, কিন্তু আমরা যখন কলেজে পৌঁছাই তখন আমি রিস্ট ওয়াচে দেখেছিলাম দশটা কুড়ি বাজে, আর সেই সময়েই কিছু ছেলে এসে তোমার মোবাইলটা নিয়ে যায়, তারপর একটা বাচ্চা ছেলের হাত দিয়ে যখন ফোনটা আবার তোমায় ফেরত দেয়, সাথে সাথেই আমায় ফোন করে জানাও তুমি, আমি চেক করে দেখেছি তুমি আমায় কল করেছিলে ঠিক এগারোটা দশে, অর্থাৎ মামণিকে যে সময় কল করা হয়েছিল ওই সময় ফোনটা ছিলই না তোমার কাছে।' এই পর্যন্ত বলে স্মৃতি থামল, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'এই সব কথা আমি অফিসারকে জানালাম, তুমি যে আমাকে আর সৌনকদাকে ফোন করে সবটা জানিয়েছ সেটাও বললাম, উনি কথা কানেই নিলেন না, বললেন, 'আপনারা জানতেন পরে ফাঁসবেন, তাই আগে থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে চেয়েছেন! কিন্তু এসব খেলো যুক্তি দিয়ে তো আকাশবাবু পার পাবেন না! ইনস্পেক্টর দাস খুব কড়া লোক, বুঝলেন?'
— 'হুম বুঝতে পারছি। একটা বড়সড় কন্সপিরেসিতে জড়িয়ে পড়েছি আমরা।' আকাশ বলল।
— 'তুমি ভেবো না আকাশ, আমি তোমায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুক্ত করবই।'
— 'ওয়েট অ্যা মিনিট স্মৃতি।'
— 'বলো।'
— 'ইন্সপেক্টর দাস নামটা কেমন শোনা শোনা লাগছে আমার, মনে হচ্ছে আগে কোথাও শুনেছি। ওনার পুরো নামটা বলতে পারবে তুমি?'
— 'হ্যাঁ আকাশ, ওনার পুরো নাম ডি.কে. দাস।'
— 'এই নামটা তো আমি জানি স্মৃতি!' আকাশ ব্যস্ত হয়ে পড়ল, 'বাবা, মানে ওই প্রকাশ ব্যানার্জীর এক বন্ধু ছিল, নাম দীপক কুমার দাস। শুনেছিলাম পুলিশ অফিসার সে, এখন এই থানায় পোস্টিং হয়েছে নাকি?'
— 'কি বলছ আকাশ? এই থানার ও.সি. প্রকাশ আঙ্কেলের বন্ধু? মানে প্রকাশ ব্যানার্জীর কোনো কানেকশন আছে এ ব্যাপারে?'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : চতুঃপঞ্চাশৎ পর্ব
0 মন্তব্যসমূহ