কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
একপঞ্চাশৎ পর্ব
আকাশ আর স্মৃতি গাড়ি থেকে নেমে কলেজে যাচ্ছিল, হঠাৎ ওদের পথ আটকে দাঁড়াল পাঁচজন ছেলে, তাদের প্রত্যেকেরই মুখ কালো কাপড়ে ডাকা। আকাশ আর স্মৃতি কিছু বলার আগেই চারজন আকাশ আর স্মৃতির কপালে পিস্তল ঠেকাল, আর পঞ্চমজন বলল, 'মোবাইলটা বের করে দাও আকাশ ব্যানার্জী!'
আকাশ কোনোরকমে পকেটে হাত দিয়ে মোবাইল বের করতেই মোবাইলটা ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেল ছেলেগুলো।
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
ছেলেগুলো চলে যেতেই আকাশ বলে উঠল, 'খুব চেনা লাগল যেন!'
— 'মানে? ওদের তুমি চেনো?'
— 'হ্যাঁ স্মৃতি, যে মোবাইল বের করতে বলল, তার গলাটা বড্ড চেনা লাগল আমার, মনে হল আগে শুনেছি এই গলাটা!'
— 'সে কি আকাশ? তার মানে এরা কোনো সাধারণ ছিনতাইকারী ছিল না? কেউ পাঠিয়েছিল এদের?'
— 'তেমনটাই তো মনে হচ্ছে!'
— 'কিন্তু আকাশ, যারা আমাদের ক্ষতি চাইত, তারা সবাই তো জেলে, আর হিয়াও মারা গেছে, তাহলে আর কে আছে?'
— 'স্মৃতি, তোমার মোবাইলটা দাও তো।'
স্মৃতির মোবাইল থেকে সৌনককে ফোন করল আকাশ।
— 'ওদের যেই পাঠাক, সে শুধু আকাশের মোবাইলটাই নিল কেন? আমার মোবাইল তো নিল না! আকাশের মোবাইল কি কাজে লাগবে ওদের?' নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল স্মৃতি।
সৌনকের সাথে কথা বলা শেষ করেই আকাশ বলল, 'প্রমীলা ব্যানার্জী, অভিজিৎ সরকার, অনিমেষ, দিপু এরা প্রত্যেকে জেলে আছে স্মৃতি, এদের জামিন হয়নি, অর্থাৎ এরা যে কলকাঠি নাড়েনি সেটা তো সিওর, তাহলে কে?'
— 'আমাদের যে আর কোথায় কত গোপন শত্রু আছে ঈশ্বরই জানেন!'
— 'সেটাই! আমি তো সবটাই জানালাম সৌনককে, ও বলল লোকাল থানায় একটা এফ.আই.আর করতে,' একটু থেমে আকাশ বলল, 'স্মৃতি তুমি কলেজ যাও, আমি একবার থানা থেকে ঘুরে আসি।'
স্মৃতি এগিয়ে গেল কলেজের দিকে। আকাশ সবে দু'পা এগিয়েছে কলেজের উল্টোদিকে, হঠাৎ একটা আট নয় বছরের ছেলে আকাশকে ডাকল, 'দাদাবাবু!'
আকাশ ছেলেটির দিকে তাকাতেই ছেলেটি আকাশের মোবাইলটা ওর হাতে গুঁজে দিয়েই পালিয়ে গেল। আকাশ ছুটল ছেলেটির পিছনে, 'এটা কোথায় পেলে তুমি?'
কিন্তু ছেলেটি কিছু জবাব না দিয়েই ভীষণ জোরে দৌড়ে যে কোথায় পালাল, আকাশ আর খুঁজেই পেল না ওকে।
মোবাইলটা হাতে পেয়েই আকাশ স্মৃতিকে ফোন করল, 'চিন্তা কোরো না কেমন, আমি আমার মোবাইলটা ফিরে পেয়ে গেছি।'
— 'সে কি আকাশ, কোথায় পেলে?'
— 'একটা বাচ্চা ছেলে দিয়ে গেল স্মৃতি। খুবই অদ্ভুত লাগছে আমার ব্যাপারটা।'
— 'হ্যাঁ আকাশ। আচ্ছা আকাশ, আমরা কোনো কন্সপিরেসির শিকার হচ্ছি না তো?'
— 'বুঝতে পারছি না। দাঁড়াও আমি সৌনককে কল করি একবার, দেখি ও কি বলে।'
— 'সেটাই ভালো হবে।'
— 'শোনো স্মৃতি, তুমি চিন্তা কোরো না এত, আজ কলেজে লাস্ট ক্লাস তোমার, তারপরেই তো মাস্টার্স করতে অন্য জায়গায় ভর্তি হতে হবে, তাই আজকের ক্লাসটা মন দিয়ে কোরো, কেমন? আমি স্টাফরুমে রইলাম।'
— 'ওকে।'
স্মৃতি ক্লাসরুমের দিকে গেল। বন্দিতা ম্যাম ক্লাস নিচ্ছিলেন, স্মৃতি নোট করছিল খাতায় গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো, হঠাৎ আকাশের প্রবেশ ক্লাসে। আকাশকে বেশ বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল, ও এসেই বন্দিতা ম্যামের সাথে নিচু স্বরে কি যেন বলল, আর সেটা শুনেই বন্দিতা ম্যাম বললেন, স্মৃতি, এখন তুমি বাড়ি যাও।'
স্মৃতি কিছুই বুঝতে পারল না, হাজার প্রশ্ন মনে রেখেই ও ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল আকাশের সাথে।
কলেজ থেকে বেরিয়েই স্মৃতি বলল, 'কি হয়েছে আকাশ? এত চিন্তিত কেন দেখাচ্ছে তোমায়?'
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আকাশ বলল, 'মামণি সুইসাইড অ্যাটেম্পট করেছে স্মৃতি!'
— 'কি বলছ কি তুমি আকাশ? কে জানাল খবরটা?'
— 'সঞ্জয় আঙ্কেল।'
— 'কখন?'
— 'একটু আগেই। মামণি ঘুমের ওষুধের শিশিটা শেষ করার পরেই নাকি ওঁকে মেসেজ করেছিল, 'আই অ্যাম সরি সঞ্জয়!' তারপর সঞ্জয় আঙ্কেল মামণিকে ফোন করেছিলেন, কিন্তু মামণি ফোনটা না ধরায় উনি ছুটে আসেন ফ্ল্যাটে। কাবেরী নিজের মনের রান্না করছিল ফ্ল্যাটে, মামণি যে এসব কান্ড ঘটিয়েছে তার বিন্দুবিসর্গও ও টের পায়নি, সঞ্জয় আঙ্কেল এসেই মামণির ঘরে ঢুকে দেখেন, মামণি মেঝেতে পড়ে আছে, পাশে পড়ে আছে খালি শিশিটা, আর টেবিলে পড়ে আছে একটা চিরকুট....' আর বলতে পারল না আকাশ। কান্নায় ভেঙে পড়ল ও। স্মৃতি ওকে বুকে টেনে নিয়ে বলল, 'মামণি কোন্ হসপিটালে আছে এখন?'
ওরা আর দেরি না করে ছুটল হসপিটালের পথে। ওরা আসতেই কাবেরী ছুটে এল, 'মা যে এমন কান্ড ঘটাবেন, তা জানতেই পারিনি গো দাদাবাবু! যদি একবারের জন্যও টের পেতাম...'
সঞ্জয় আঙ্কেল ছুটে এলেন, 'এসেছ আকাশ? জানো আমি যদি না আসতাম ফ্ল্যাটে, জানিনা কি হত!'
— 'কিন্তু আঙ্কেল, আমরা যখন বেরোলাম, তখন তো মামণি দিব্যি হাসিখুশি ছিল, হঠাৎ ঘন্টাখানেকের মধ্যে কি হল যে মামণি এত বড় কান্ড ঘটাল?'
— 'এই দেখো স্মৃতি, চিরকুটটা পড়ে দেখো। আমিও বুঝতে পারছি না স্বর্ণর মতো সাহসী আর বিচক্ষণ মানুষ কিভাবে এরকম ডিসিশন নিল!'
সঞ্জয় চিরকুটটা স্মৃতির হাতে দিল। স্মৃতি দেখে, তাতে লেখা,
'আমায় ক্ষমা করিস স্মৃতি। তুই আমায় সুখী দেখার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলি, কিন্তু আমার যে আর লড়াই করার শক্তি নেই মা! জীবনযুদ্ধে আজ আমি হেরে ভূত হয়ে গেছি রে, তাই তোদের সবাইকে মুক্তি দিলাম আজ। তোরা ভালো থাকিস, মেঘাকে মানুষের মতো মানুষ করিস।
— সোনালি'
— 'আচ্ছা স্মৃতি, আকাশ আর সোনালির মধ্যে কি ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল এর মধ্যে?'
— 'না তো আঙ্কেল!'
— 'তাহলে স্বর্ণ কেন নিজেকে শেষ করে দিতে চাইল?'
— 'আমিও তো সেটাই ভাবছি।'
একটু পরেই নার্স এল, 'সোনালি মৈত্রের বাড়ির লোক কে আছেন?'
আকাশ স্মৃতি আর সঞ্জয় ব্যস্ত হয়ে ছুটে গেল।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : দ্বিপঞ্চাশৎ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ