Advertisement

কাহিনী (পঞ্চাশৎ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
পঞ্চাশৎ পর্ব



— 'না স্মৃতি, আমি কিছুতেই ওই মহিলার গাড়িতে উঠব না, আর আমাদের মেয়েও উঠবে না।'

— 'না আকাশ, মামণির গাড়িতেই আমি উঠব, আর মামণির ফ্ল্যাটেই আমি যাব এখন, যদি না নিয়ে যাও...'

আর বলতে পারল না স্মৃতি। মাথা ঘুরে ও লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে।

— 'স্মৃতি!' আকাশ আর সোনালি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

— 'সত্যি, আপনাদের আর কিচ্ছু বলার নেই!' একজন নার্স ছুটে এলেন, 'সবে কাল ওনার ডেলিভারি হয়েছে, এভাবে ওনার সামনে ঝগড়াঝাঁটি করলে তো এরকম হবেই! শুনুন, উনি যা চাইছেন, সেটাই করুন, নইলে কিন্তু উনি কোনোদিনই সুস্থ হবেন না।'

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


বাধ্য হয়েই আকাশ স্মৃতিকে তুলে গাড়িতে উঠল, ক্যাব ক্যান্সেল করে দিল ও। মেঘা সোনালির কোলে ছিল, নিশ্চিন্তমনে ঘুমোচ্ছিল একরত্তি।


ফ্ল্যাটে এসেই স্মৃতিকে বিছানায় শুইয়ে দিল আকাশ। স্মৃতির তখনও জ্ঞান ফেরেনি। আকাশ ছুটল জল আনতে, সোনালিও চলে যাচ্ছিলেন ঘর থেকে, হঠাৎ আঁচলে টান পড়ল ওঁর। ফিরে তাকিয়ে দেখেন, স্মৃতি চোখে মেলে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে আর মিটিমিটি হাসছে।

— 'ও মা, তোর জ্ঞান ফিরেছে!'

স্মৃতি ইশারায় চুপ করিয়ে দিল ওঁকে, তারপর হাসল, 'অজ্ঞান হওয়ার ভান যদি না করতাম, তোমার ছেলেকে নিয়ে আসতে পারতাম এখানে?'

— 'তার মানে তুই....'

— 'আমি একদম সুস্থ মামণি, আর ওই যে নার্স, ওকেও সবটা বলেই রেখেছিলাম আমি, তাই তো ও এসেই বলল আমি যা বলছি যেন সেটাই করা হয়।'

— 'তুই তো খুব দুষ্টু রে!'

— 'তাছাড়া আর কি করতাম বলো! তোমার ছেলে এমনিতে খুবই ভালো মানুষ, কিন্তু মাঝে মাঝে এত ছেলেমানুষি করে না কি বলব! আসলে কি জানো মামণি, কাল তুমি যখন সবটা বলছিলে, আকাশ যে আড়ালে দাঁড়িয়ে সবটা শুনছিল সেটা আমি দেখতে পেয়েছিলাম, তখনই আমি আন্দাজ করতে পেরেছিলাম আজ কি হতে চলেছে, আর তাই তো আকাশ আজ সকালে আসার আগেই নার্সের সাথে কথা বলে রেখেছিলাম আমি। নার্স আশেপাশেই ছিল, আমি অজ্ঞান হওয়ার পরেই ও ছুটে আসে, আর আমার শেখানো কথাগুলোই বলে।'

— 'সত্যি, এমন শান্তশিষ্ট একটা মেয়েও যে এত দুষ্টু হতে পারে তা তোকে না দেখলে জানতেই পারতাম না!'

— 'চুপ চুপ মামণি, আকাশ এক্ষুণি চলে আসবে।'


স্মৃতি আবার চোখ বুজে শুয়ে পড়ল। আকাশ একটু পরেই জল নিয়ে এল, আর স্মৃতির চোখেমুখে ছিটিয়ে দিতে লাগল।

স্মৃতি একটু পরেই চোখ খুলল।

— 'তুমি ঠিক আছ স্মৃতি?' আকাশ ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

— 'ঠিক আছি, তবে খুব দুর্বল।'

— 'আচ্ছা আচ্ছা বেশ, তুমি এখন শুয়ে থাকো, উঠতে হবে না।'

মেঘা কান্নাকাটি শুরু করল হঠাৎ, আকাশ ওকে ভোলানোর জন্য ঘরের বাইরে নিয়ে গেল।

— 'মামণি!' স্মৃতি বলল, 'যতদিন না তোমার ছেলেকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারছি, ততদিন আমি সুস্থ হব না, বুঝলে?' মিটিমিটি হাসল স্মৃতি।



অন্যদিকে স্মৃতি সুস্থ না হওয়ার দরুন আকাশের আর কোথাও যাওয়া হল না, অনিচ্ছাসত্ত্বেও ও সোনালির ফ্ল্যাটেই রয়ে গেল ও। যতদিন গড়াতে লাগল, আকাশের মন ততই নরম হতে লাগল তার মায়ের প্রতি, তবু এতদিন জমে থাকা অভিমানের পাহাড় ডিঙিয়ে সে তার মাকে কাছে টেনে নিতে পারল না, আবার মা বলে ডাকতেও পারল না, স্মৃতি বারবার বোঝানো সত্ত্বেও না।


— 'স্মৃতি, প্রিপারেশন কেমন চলছে? সামনেই তো পরীক্ষা শুনলাম।'

— 'হ্যাঁ মামণি, দু'সপ্তাহ পরেই থার্ড ইয়ারের ফাইনাল, আজই রুটিন দিল।'

— 'এবারেও কিন্তু গোল্ড মেডেলটা পেতে হবে স্মৃতি, মনে থাকে যেন!' আকাশ হাসল।

— 'সেটার তো কোনো দরকার নেই।'

— 'কেন?'

— 'বাহ, আগেরবার তো আমি কলেজ থেকে গোল্ড মেডেল পাওয়ার আগেই তোমার গোল্ড মেডেলটা আমার গলায় পরিয়ে দিয়েছিলে, মনে নেই? এবারেও তো সেটাই হবে, আমি যদি ফার্স্ট না ও হই, তুমি তো আমায় তোমার থার্ড ইয়ারে পাওয়া গোল্ড মেডেলটা আমায় দিয়েই দেবে, তাই না? আর যদি না ও দাও', স্মৃতি দুষ্টুমির হাসি হাসল, 'আমি নিয়ে নেব ওটা।'

— 'দুর পাগলি', আকাশ স্মৃতির গালদুটো টিপে দিল আলতো, 'আমার যা কিছু তা তো তোমারই, তা আবার নিয়ে নেওয়ার কি আছে? এক মিনিট দাঁড়াও।'

আকাশ একটু পরেই গোল্ড মেডেলটা নিয়ে এল, 'আমি এখনই তোমায় এটা পরিয়ে দিই, এসো।'

— 'ধুস! মামণি, দেখো তোমার ছেলের কান্ড! এখনও পরীক্ষাই হল না, আর উনি এখনই....'

— 'স্মৃতি, তুমি আমার চোখে সবসময়ই সেরা, তাই তুমি পরীক্ষায় ফার্স্ট হও বা না হও, এটা তুমিই ডিসার্ভ করো।'

— 'না আকাশ, আমার চেয়েও বেশি এটা কে ডিসার্ভ করে জানো? মামণি। তুমি এটা মামণিকে পরিয়ে দাও আকাশ।'

আকাশ মেডেলটা হাতে নিয়ে ইতস্তত করতে লাগল। স্মৃতি বলল, 'মামণি যেভাবে সারাটাজীবন একা লড়াই করে জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়েছে, আজও যাকে লড়ে যেতে হচ্ছে দাঁতে দাঁত চেপে একা, তবু মুখে সবসময় হাসি লেগে রয়েছে মানুষটার, আজ যে সেই মানুষটাই গোল্ড মেডেল ডিসার্ভ করে আকাশ! তুমি আর দেরি কোরো না আকাশ, মামণিকে পরিয়ে দাও গোল্ড মেডেলটা।'


আকাশ সোনালির গলায় পরিয়ে দিল গোল্ড মেডেলটা, দিয়েই আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, চলে গেল ও সেখান থেকে।


— 'বুঝলে মামণি, বরফ প্রায় বারো আনা গলেছে, বাকি চার আনাও গলবে, শুধু একটু সময় লাগবে।'

— 'এতগুলো বছর যখন অপেক্ষা করেছি মা, আর কিছু সময় না হয় অপেক্ষা করব! আমি তো ওকে ফিরে পাওয়ার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম, শুধু তোর জন্যই আবার আশার আলো দেখেছি যে আমি!'


অন্যদিকে স্মৃতির আসল পরিচয় জানতে পারার পর ভীষণভাবে হাত কামড়াচ্ছেন প্রকাশ ব্যানার্জী। তিনি কেবলই আফসোস করছেন, তিনি যদি স্মৃতিকে মেনে নিতেন প্রথমেই, তাহলে চৌধুরীবাড়ির অগাধ সম্পত্তিতে ভাগ বসাতে পারতেন তিনিও। সেই সাথে তিনি এটাও জানতে পেরেছেন, যে আকাশ আর স্মৃতি এখন তাঁর প্রথমা স্ত্রী সোনালির কাছে থাকেন। তিনি আকাশ, স্মৃতিকে ফোন করে, দেখা করে অনেকবার রিকোয়েস্ট করেছেন ব্যানার্জীবাড়িতে ফিরে আসতে, কিন্তু আকাশ বা স্মৃতি কেউই রাজি হয়নি। তাই এবার তিনি বাঁকা রাস্তা বেছে নিয়েছেন।


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : একপঞ্চাশৎ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ