কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ত্রিষষ্টি পর্ব
— 'বেশ, আপনি এখন যেতে পারেন।'
বনশ্রী বিকাশ আর জয়ন্তর পাশে গিয়ে বসল।
— 'মিলর্ড, এরপর আমি ডেকে নেব দীপক কুমার দাসকে, যিনি ও.সি. কাম প্রকাশবাবুর বন্ধু।'
দীপক কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ালেন।
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'তো দীপকবাবু, আপনার আন্ডারে যে থানা আছে, সেখানেই আকাশ ব্যানার্জী আছেন, তাই তো?'
— 'একদম।'
— 'এখনও পর্যন্ত একটা বড় প্রশ্নের উত্তরই তো পাইনি আমরা মিলর্ড, তা হল যে ভয়েস রেকর্ডিংয়ের ভিত্তিতে আমার মক্কেলকে অ্যারেস্ট করা হয়েছিল, সেই রেকর্ডিং আপনাকে কে দিয়েছিল?'
— 'অবজেকশন মিলর্ড!' বলে উঠলেন প্রকাশের পক্ষের উকিল, 'প্রমাণটাই শেষ কথা, প্রমাণ কে দিয়েছে সেটা বড় কথা নয়।'
— 'একশোবার মিলর্ড, আর প্রমাণ কে দিয়েছে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে, নির্ভর করে প্রমাণের সত্যতা। কি হল দীপকবাবু, আপনি মুখে কুলুপ আঁটলেন কেন? আমি বলছি, আপনাকে প্রমাণটা দিয়েছিলেন প্রকাশ ব্যানার্জী তো?'
— 'হ্যাঁ।' মিনমিনে গলায় বললেন দীপক।
— 'সে কি? আকাশবাবু ফোন করলেন সোনালিদেবীকে, সেই রেকর্ডিং প্রকাশবাবু পেলেন কোথায়? আপনি একবারও এটা প্রশ্ন করেননি ওনাকে?'
— 'না আসলে....'
— 'আসল ব্যাপারটা হল এটাই যে প্রকাশবাবু আপনার ইয়ার দোস্ত, উনি বলেছিলেন আপনাকে যে চৌধুরীবাড়ির সম্পত্তিতে যদি উনি ভাগ বসাতে পারেন, তার কিছুটা পার্ট বরাদ্দ হবে আপনার জন্যও, ঠিক বললাম?'
— 'না না না, এসব মিথ্যে। আসল সত্যিটা আমি বলছি শুনুন।'
— 'হ্যাঁ বলুন। এতক্ষণ তো সত্যিটাই জানতে চাইছিলাম আমরা।'
— 'আ-আসলে এই প্রকাশ ব্যানার্জী একটা জানোয়ার। বন্ধুত্বের সামান্যতম মর্যাদাটাও ও রাখেনি জানেন!'
— 'আচ্ছা? কিরকম?'
— 'আমার একমাত্র মেয়ে চামেলী ওই হতচ্ছাড়া প্রকাশ ব্যানার্জী যে ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়, দুর্ভাগ্যবশত ওই ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স পড়ে। ও ভয় দেখিয়েছে, আমি যদি ওর প্ল্যানে অংশ না নিই, ও নিজের ক্ষমতাবলে আমার মেয়েকে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেবে, কেরিয়ার শেষ করে দেবে, এমনকি প্রাণ সংশয়ও হতে পারে ওর! আপনিই বলুন তো উকিলবাবু, একমাত্র মেয়ের বিপদের কথা শুনে কোন্ বাবা স্থির থাকতে পারে?'
প্রকাশ ব্যানার্জী হতবাক হয়ে শুনতে থাকেন কথাগুলো।
— 'আচ্ছা তাই নাকি? ওই যে দেখছেন সৌনকবাবু, ওঁকেও হুমকি দিয়েছিলেন ওই প্রকাশ ব্যানার্জী, যে উনি যদি আকাশবাবুর কেসটা নিয়ে এগোন, তাহলে ওঁর স্ত্রী, ওঁর ভালোবাসার মানুষ তোর্সা চৌধুরীর ক্ষতি হয়ে যাবে। উনি তবুও ভয়ে পিছিয়ে আসেননি, তাই তো সৌনকবাবু?' উকিলবাবু সৌনকের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। সৌনকও পালটা হাসল।
দীপকবাবু মাথা নিচু করে রইলেন। উকিলবাবু বলে যেতে লাগলেন, 'পুলিশরা হলেন আইনের রক্ষক, স্তম্ভ। সৌনকবাবুই শুধু নন, ওনার মতো যত সৎ এবং সাহসী পুলিশ অফিসার আছেন, তাঁরা প্রত্যেকে প্রতিদিন এরকম হাজারো হাজারো হুমকি পান, তবু তাঁরা থেমে থাকেন না, লেজ গুটিয়ে বাড়িতে বসেও থাকেন না, অপরাধীদের শাস্তি দিতেও পিছপা হন না। আপনার মেরুদণ্ড যদি এতটাই নরম আর বাঁকা হয়, তাহলে আপনি জয়েন করলেন কেন পুলিশের চাকরিতে?'
— 'আমি আপনার কথা উড়িয়ে দিচ্ছি না উকিলবাবু। কিন্তু ওই প্রকাশ ব্যানার্জী তো অন্য ক্রিমিনালদের মতো না, আমার ঠিকুজি কুষ্ঠি ওর ঠোঁটস্থ। আমার মেয়ে কখন বাড়ি থেকে বেরোয়, কখন ফেরে, কোথায় যায় সব ওর নখদর্পনে। আপনিই বলুন মিলর্ড, পুলিশ হিসেবে যেমন আমার কর্তব্য আছে, বাবা হিসেবেও তো আছে নাকি?'
— 'সব মিথ্যে কথা মিলর্ড!' গর্জে উঠলেন প্রকাশ, 'আমি ওকে কোনো রকম হুমকি দিইনি, আর তার প্রমাণও আছে আমার কাছে!'
— 'যাক, ফাইনালি আপনার কাছেও প্রমাণ আছে, তাও আবার আপনার কাছের বন্ধুর এগেইন্সটে।' হাসলেন উকিলবাবু, 'চিন্তা নেই, আপনাকে ডাকা হবে কাঠগড়ায়, আপনাকেও সুযোগ দেওয়া হবে নিজের বক্তব্য রাখার। আগে দীপকবাবুর সাথে কথোপকথন সেরে নিই। তো দীপকবাবু, আপনি কি যেন বলছিলেন? আপনি একজব বাবা। না দীপকবাবু, আপনি শুধু পুলিশ হিসেবেই নন, বাবা হিসেবেও ব্যর্থ। বাবা শব্দটার অপমান করলেন আপনি, তাও আবার আদালতে দাঁড়িয়ে, ছিঃ!'
— 'কি যাতা বলছেন আপনি?'
— 'আমি কিচ্ছু যাতা বলছি না দীপকবাবু! মিলর্ড, উনি এতক্ষণ যা বললেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যে। প্রকাশবাবু যাঁদের নিজের প্ল্যানের অংশ বানিয়েছেন, তাঁদের প্রায় সকলকেই উনি কোনো না কোনোভাবে ব্ল্যাকমেল করেছেন, শুধু আপনি ছাড়া। আপনি স্বেচ্ছায় এই প্ল্যানের অংশ হয়েছিলেন টাকার লোভে।'
— 'না, এসব মিথ্যে।'
— 'এটাই সত্যি। মিলর্ড, ওনার মেয়ে চামেলী দাস মোটেই প্রকাশ ব্যানার্জী যে ইউনিভার্সিটিতে পড়ান, সেই ইউনিভার্সিটিতে পড়েন না, পড়েন অন্য ইউনিভার্সিটিতে, আর সেই ইউনিভার্সিটি কলকাতার নয়, দিল্লির একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়েন উনি, তার প্রমাণও জমা দেওয়া হয়েছে মিলর্ড।' বাঁকা হেসে উকিলবাবু তাকালেন দীপকের দিকে, 'একটু ভুল বললেন আপনি। প্রকাশবাবুর চেয়েও বেশি আমরা আপনার ঠিকুজি কুষ্ঠি জানি, বুঝলেন? যাই হোক, আপনি এখন যেতে পারেন।'
প্রকাশ এসে দাঁড়ালেন কাঠগড়ায়।
— 'এই এতক্ষণে একটা সত্যি কথা বললেন আপনি প্রকাশ ব্যানার্জী! তো কই, যে প্রমাণটা দেবেন বলছিলেন, দিন!'
— 'না মানে আমার কাছে তো কোনো প্রমাণ নেই!'
— 'সে কি! তাহলে এক্ষুণি কেন বললেন যে প্রমাণ আছে?'
— 'আর কি করতাম বলুন! নইলে তো ওই দীপকটা আমার নামে মিথ্যে অপবাদ দিত!'
— 'এই তো! বেশ তো সত্যি কথা বললেন একটু আগে, আবার মিথ্যে বলছেন? আসলে তখন আপনি রাগের মাথায় বলে ফেলেছিলেন যে আপনার কাছে প্রমাণ আছে, যেটা সত্যিই আছে। কিন্তু এখন আপনি প্রমাদ গুনছেন, কারণ প্রমাণটা দিলে শুধু দীপকবাবু ফাঁসবেন না, সাথে আপনিও ফাঁসবেন, তাই না?'
প্রকাশ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
— 'আর চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে কোনো লাভ নেই প্রকাশ ব্যানার্জী, আপনি অলরেডি আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েছেন আমাদের প্রমাণগুলোর দৌলতে। এখন আপনি যদি আদালতে বলা নিজের কথাই অস্বীকার করেন, এতে আপনার জীবনে জটিলতা বাড়বে বই কমবে না, তাই বলছি, দিয়েই দিন প্রমাণটা। ডুবতেই যখন হবে, তখন একা কেন ডুববেন? ইয়ার দোস্তকে সাথে নিয়ে ডুবুন, তাই না? দিন দিন, আর দেরি করবেন না।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : চতুঃষষ্টি পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ