Advertisement

কাহিনী (দ্বিষষ্টি পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দ্বিষষ্টি পর্ব



— 'প্রকাশ ব্যানার্জী তুহিনদা, মানে ডক্টর মিশ্রকে ফোনে বলেছিলেন উনি ওনার পরিচিতা এক মহিলাকে পাঠাবেন ঘুমের ইঞ্জেকশন নিয়ে, তাই রুমকিদি, অর্থাৎ আমার দিদি তোর্সা চৌধুরী একজন নার্সের ছদ্মবেশে আগে থেকেই উপস্থিত ছিল ওই হসপিটালে। তুহিনদাই হসপিটাল ম্যানেজমেন্টের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা করে রুমকিদির ওখানে নার্সের ছদ্মবেশে থাকার। যতক্ষণ তুহিনদা থাকত হসপিটালে, ও খেয়াল রাখত মামণির, যাতে কেউ এসে মামণির ক্ষতি না করতে পারে। মামণিকে তুহিনদা নিজের পরিচয় জানিয়ে আমাদের সবটা প্ল্যান জানায়, জ্ঞান ফেরা সত্ত্বেও অজ্ঞানের ভান করে শুয়ে থাকতে বলে বেডে, যাতে প্রকাশ ব্যানার্জী মনে করেন, সবটা ওনার প্ল্যান মতোই চলছে। আর যে সময় তুহিনদা থাকত না, ওই সময়ে নার্সের ডিউটিতে থাকত রুমকিদি। আমরা এও খেয়াল করেছিলাম, পেশেন্টের ফ্যামিলির লোক সেজে প্রকাশ ব্যানার্জীর কিছু চর হসপিটালে ঘোরাঘুরি করত, কিন্তু প্রকাশ ব্যানার্জী ভেবেছিলেন এটাও ধরতে পারব না আমরা! রুমকিদির মুখে সবসময় মাস্ক থাকত, তাই প্রকাশ ব্যানার্জীর চররা চিনতেই পারেনি রুমকিদিকে।'

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


প্রকাশবাবুর কপাল ঘামে ভিজে গেল। ওনার উকিলও হার নিশ্চিত জেনে গোমড়া মুখে বসে রইলেন।


— 'আচ্ছা, তারপর?'

— 'তারপর যেদিন মামণি হসপিটালে ভর্তি হল, সেদিন সন্ধ্যেবেলায় একজন মহিলাকে প্রকাশ ব্যানার্জী পাঠিয়েছিলেন ঘুমের ইঞ্জেকশন দেওয়ার জন্য। সেই মহিলাও একেবারে রুমকিদির মতোই সেজে এসেছিল, যাতে তাকে দেখেও মনে হয় হসপিটালের একজন নার্স। আমাদের কথামতো সেই মহিলা আসার আগেই রুমকিদি ঘরের এককোণে লুকিয়ে পড়ে, আর তুহিনদা তাকে ইশারায় ঘরে ঢুকিয়ে নিজে বেরিয়ে পড়ে ঘরের বাইরে। অবশ্য সেটা ভান ছিল, তুহিনদা ঘরের বাইরেই ওয়েট করছিল। যাই হোক, রুমকিদির হাতেও সেই সেম ঘুমের ইঞ্জেকশন ছিল। সেই মহিলা যেই এগিয়েছে মামণিকে ইঞ্জেকশন পুস করার জন্য, অমনি রুমকিদি আড়াল থেকে বেরিয়ে সেই মহিলাকে জাপটে ধরে তাকেই ওই ইঞ্জেকশন পুস করে দেয়। মহিলা কিছুক্ষণ ছটফট করেই লুটিয়ে পড়ে। সাথে সাথেই রুমকিদি তুহিনদাকে মিসড কল দেয়, আর তুহিনদা সাথে সাথেই ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। প্রকাশ ব্যানার্জীর চররা কিছুই বুঝতে পারে না, ওরা ভেবেছিল ওই মহিলাই বুঝি মিসড কল দিয়ে তুহিনদাকে ডাকছে।'

— 'ওরে ব্বাবা! তারপর?'

— 'তারপরেই তো আসল চমক উকিলবাবু। ওই মহিলার মুখ থেকে মাস্ক সরিয়ে তার ছবি তুলে আমায় পাঠায় রুমকিদি, আর তার মুখ দেখে আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল, কেন জানেন? কারণ ওই মহিলা আর কেউ নয়, ব্যানার্জীবাড়ির ড্রাইভার বিকাশ মুর্মুর স্ত্রী বনশ্রী মুর্মু। আমি তখনই ব্যাপারটা আন্দাজ করেছিলাম কিছুটা, তাড়াতাড়ি বনশ্রীদিকে নিয়ে ওই ঘরের শিকবিহীন জানালা দিয়ে বেরিয়ে যেতে বললাম আমি তুহিনদা আর রুমকিদিকে। সৌনকদার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হল বনশ্রীদিকে, আর অন্যদিকে তুহিনদা প্রকাশ ব্যানার্জীকে ফোনে জানাল যে সবটা ওনার প্ল্যান মতোই হয়েছে, ইঞ্জেকশন পুস করা হয়েছে। ওদিকে বনশ্রীদির জ্ঞান ফিরতেই কান্নায় ভেঙে পড়ল ও। সৌনকদা আর রুমকিদি ওকে চেপে ধরতেই ও সব সত্যিটা বলল।'

— 'কি সত্যি?'

— 'সেটা তো আমি বলব না, বলবে বনশ্রীদি নিজেই।'


স্মৃতির কথা শেষ হতে না হতেই হাজির হল বনশ্রী, বিকাশ আর তাদের ছেলে জয়ন্ত। ওদের দেখে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল যেন প্রকাশবাবুর।


— 'এই যে মিলর্ড, ওরা এসেছে।'


জজের অনুমতিতে বনশ্রী কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াল। স্মৃতি গিয়ে বসল বেঞ্চে।


— 'আপনার নাম?'

— 'আজ্ঞে বনশ্রী মুর্মু।'

— 'প্রকাশ ব্যানার্জীকে আপনি কিভাবে চেনেন?'

— 'আজ্ঞে আমার বর ওনার গাড়ি চালায়।'

— 'আচ্ছা, আর আপনারা কি সপরিবারে ওখানেই থাকেন?'

— 'আজ্ঞে উকিলবাবু, কোয়ার্টারে থাকি আমরা।'

— 'বেশ, এবার আসল কথায় আসি। এবার বলুন তো, আপনি কেন গেলেন সোনালিদেবীকে ইঞ্জেকশন দিতে?'


বনশ্রী ভয়ে মাথা নিচু করে রইল।


— 'আপনার ভয়ের কোনো কারণ নেই বনশ্রীদেবী, কেউ আপনার বা আপনার পরিবারের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। বরং যদি সত্যিটা স্বীকার না করেন তাহলেই বিপদে পড়বেন আপনি!'

— 'না না উকিলবাবু, সব বলব আমি! ওই প্রকাশবাবু আমার ছেলেটাকে একটা ঘরে আটকে রেখে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিয়েছিল, ওই তালা সবসময় ওনার কাছেই থাকত। উনি বলেছিলেন, ওনার কথামতো না চললে আমার ছেলেকে মুক্তি দেবেন না উনি। এমনকি জানেন জজসাহেব,' কান্নায় ভেঙে পড়ল বনশ্রী, 'আমার ছেলেটাকে ভালো করে খেতে পর্যন্ত দেয়নি! আপনিই বলুন, এই সময় ওনার কথামতো চলা ছাড়া আর কি উপায় ছিল আমার? তবুও জয়ের বাবা বারণ করেছিল আমায়, বলল, 'সোনালি বৌদিমণি দেবীর মতো মানুষ, তুমি ওনাকে দেখোনি, আমাদের বিয়ের অনেক আগেই ওনাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল কিনা! সেই মানুষটার এভাবে ক্ষতি কোরোনা, এতে আমাদের জয়ের খারাপ বই ভালো হবে না।' কিন্তু আমি ওর কথা কানে তুলিনি, ঝগড়া হয়েছিল আমার ওর সাথে, আমি বলেছিলাম, আকাশ দাদাবাবু আর শিউলি বৌদিমণিকে আমি খুব ভালোবাসি, কিন্তু সেই ভালোবাসার চেয়েও আমার সন্তানের সুরক্ষা অনেক বেশি দামী আমার কাছে, তাই অন্যায় জানা সত্ত্বেও আমি ওই প্রকাশবাবুর কথাতে রাজি হয়ে গেলাম।'

— 'আচ্ছা, তারপর?'

— 'তারপর তো তোর্সাদিদির কাছে আমি ধরা পড়ে গেলাম, তোর্সাদিদি আমায় অজ্ঞান করে ওর শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে গেল, ওখানেই সবটা খুলে বললাম আমি ওদের। শিউলি বৌদিমণি তোর্সাদিদির ফোনে ভিডিও কল করে সবটা বলল, যে কি কি করতে হবে আমায়?'

— 'তাই? কি বললেন উনি?'

— 'শিউলি বৌদিমণি বলল যে এখান থেকে আমি ফিরে যাব ব্যানার্জীবাড়িতে, আর গিয়ে প্রকাশবাবুকে বলব যে ইঞ্জেকশন দিয়ে দিয়েছি আমি সোনালি বৌদিকে। তারপর আগামী তিনদিন আমি হসপিটালে আসব, তারপর সোনালি বৌদিমণির ঘরে ঢুকব ইঞ্জেকশন নিয়ে, তারপর ওষুধটা ফেলে দিয়ে খালি ইঞ্জেকশনটা নিয়ে ফিরে যাব ব্যানার্জীবাড়িতে। এতে প্রকাশবাবুও খুশি হয়ে আমার ছেলেটাকে ছেড়ে দেবেন, আবার শিউলি বৌদিমণিরা যেমনটা ভেবেছেন তেমনভাবেই সবটা হবে।'

— 'তো সেইমতোই সবটা হল, তাই তো?'

— 'আজ্ঞে। প্রকাশবাবু আজকেই জয়কে ছেড়ে দিলেন, তারপর উনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেই আমরাও চলে এলাম। জয়ের বাবা চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে, আর এজন্মে কখনো ওই বাড়িমুখো হব না আমরা।'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ত্রিষষ্টি পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ