কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
একষষ্টি পর্ব
যে যুবকটি কথা বলছিল, সে কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াল।
— 'আপনার নাম?' জিজ্ঞেস করলেন আকাশের পক্ষের উকিল।
— 'পার্থসারথি বিশ্বাস।'
— 'আপনি কি বলছিলেন তখন? প্রকাশবাবুই এসবের জন্য দায়ী?'
— 'হ্যাঁ।'
— 'খুলে বলুন তো বিষয়টা।'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
পার্থসারথি সবটা খুলে বলল। এরপর অন্য যুবকদের ডাকা হলে তারাও একই কথা বলল। প্রকাশবাবুই যে ওদের কেরিয়ার শেষ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে এসব করতে বাধ্য করিয়েছেন তা সকলেই স্বীকার করল। ওরা এও বলল, যে আকাশ আর স্মৃতিকে কলেজের সামনে পিস্তল দেখিয়ে ভয় দেখিয়েছিল যে গ্যাং, সেই পাঁচজনের গ্যাঙে ওরাই ছিল। এমনকি থানা থেকে ফেরার পথে স্মৃতির ভ্যানিটি ব্যাগটাও ছিনতাই করেছিল ওরাই।
— 'কি প্রকাশবাবু, আর কিছু বলবেন? দুনিয়ার সকলেই কি মিথ্যে বলছে আপনার নামে?'
প্রকাশবাবু মাথা নিচু করে বসেছিলেন, হঠাৎ কিছু কনস্টেবলের প্রবেশ কোর্টরুমে।
— 'আপনারা চলে এসেছেন? আসুন আসুন।' সৌনক হাসল।
— 'আপনারা?'
— 'আমার কিছু বলার আছে মিলর্ড।' সৌনক বলল।
— 'কাঠগড়ায় এসে বলুন।'
— 'আমিই ওনাদের প্রকাশ ব্যানার্জীর বাড়িতে পাঠিয়েছিলাম ওনার বাড়ি রেড করার জন্য, কারণ আমার কাছে ইনফরমেশন ছিল যে ওনার বাড়িতে ব্ল্যাক মানি আছে।' হাসল সৌনক।
কনস্টেবলরা এসে উদ্ধার করা কালো টাকাগুলো রাখল।
— 'কেন যে বেকার আমার মক্কেলের পেছনে পড়তে গেলেন! এখন দেখলেন তো, ওনার তো কোনো ক্ষতি করতে পারলেনই না, মাঝখান থেকে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে পড়ছে!' বাঁকা হাসলেন আকাশের পক্ষের উকিল, 'আসলে আপনি বোধহয় জানেন না প্রবাদবাক্যটা, যে কাচের ঘরে বাস করে অন্যের ঘরে ঢিল ছোড়াটা বোকামি। অন্যকে ফাঁসাতে গিয়ে আপনারই কেচ্ছাকাহিনী কেমন ফাঁস হয়ে গেল দেখুন। তবে হ্যাঁ, গল্পের এখানেই শেষ নয়। আমি এবার আমার মক্কেলের স্ত্রী কাহিনী চৌধুরী, অর্থাৎ স্মৃতি ব্যানার্জীকে কাঠগড়ায় ডাকতে চাই। প্রকাশবাবু, আরও কিছু সারপ্রাইজিং স্টোরি শোনার জন্য রেডি তো?'
জজের অনুমতিতে স্মৃতি কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াল।
— 'মিসেস ব্যানার্জী, একটা অনেক বড় প্রশ্নের উত্তরই তো এখনও পর্যন্ত পাইনি আমরা, তা হল এই যে আমরা ভিডিও ফুটেজটা দেখলাম, যেখানে প্রকাশবাবু থানায় দাঁড়িয়ে আপনাকে হুমকি দিচ্ছেন, যে হয় আকাশবাবুকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আপনি ব্যানার্জীবাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন, নয় তো সারাজীবন ওনাকে জেলে পচিয়ে মারবেন, এই ভিডিওটা আমি করলেন কিভাবে? মানে আপনার মোবাইল, ভ্যানিটি ব্যাগ খুঁজে তো প্রকাশবাবু বা ইন্দ্রজিৎবাবুরা কিছুই পাননি।'
— 'আসলে উকিলবাবু, প্রকাশ ব্যানার্জীর সবচেয়ে বড় দোষ কি জানেন? উনি ভাবেন উনি একাই বুদ্ধিমান, আর বাকি সবাই ঘাসে মুখ দিয়ে চলে।' প্রকাশের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি হাসল স্মৃতি, 'উনি আন্দাজ করেছিলেন যে ওনার কথাগুলো আমি রেকর্ড করবই, আর তাই আমি থানা থেকে বেরোনোর পরেই রিসার্চ স্কলারদের দিয়ে আমার ব্যাগটা ছিনতাই করালেন, ভাবলেন আমি হয় মোবাইলে রেকর্ড করেছি, বা কোনো টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করেছি। কিন্তু আমার শুধু মোবাইল কেন, তন্নতন্ন করে গোটা ব্যাগ খুঁজেও কিচ্ছুটি পাননি, আর ভীষণ নিশ্চিন্তমনে দিন কাটাতে লাগলেন, কারণ উনি ভাবলেন স্মৃতির কাছে কোনো প্রমাণ নেই৷ কিন্তু উনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতেও পারেননি যে আমি ওনার সব কথা রেকর্ড করেছি, আর এমনভাবে করেছি যে উনি হাজার চেষ্টা করলেও টের পাবেন না কখনোই। কি মিস্টার প্রকাশ ব্যানার্জী, খুব জানতে ইচ্ছে করছে না? এই দেখুন।'
স্মৃতি ওর বাঁ হাতটা সবাইকে দেখিয়ে বলল, 'এই যে অনামিকাতে দেখছেন আংটিটা, এটা কোনো সাধারণ আংটি ভেবে ভুল করবেন না। হ্যাঁ এটা আর পাঁচটা আংটির মতোই দেখতে, কিন্তু এতে হিডেন ক্যামেরা লাগানো আছে।'
প্রকাশবাবুর মুখ পাংশুবর্ণ ধারণ করল।
— 'কি, কেমন লাগল সারপ্রাইজটা, ডিয়ার শ্বশুরমশাই? আপনার মনে আছে, সেদিন যখন থানায় আপনি হুমকি দিচ্ছিলেন, আমি আমার বাঁ হাতটা এমনভাবে গালে রেখেছিলাম যাতে আপনার মুখটা থাকে আংটির একদম সামনে? ওভাবে গালে হাত রাখতে দেখে আপনার মনে হয়েছিল আকাশ লকাপে আছে বলে আমি ভীষণ চিন্তিত আর ভীত, তাই না? আপনি স্বপ্নেও ভাবেননি যে মোবাইলে নয়, সবকিছু রেকর্ড হচ্ছে আংটিতে। অবশ্য আপনাকেও দোষ দিতে আমি পারি না, কিভাবে দিই বলুন? আমিই তো আপনাকে বিভ্রান্ত করার জন্য ডান হাতে মোবাইলটা এমনভাবে ধরেছিলাম যাতে আপনার মনে হয় ওতে আপনার ভিডিও রেকর্ডিং হচ্ছে।' বাঁকা হাসল স্মৃতি, 'আর এই যে স্কলার দাদারা, চৌর্যবৃত্তিটা যখন শিখলেনই, আরেকটু ভালোভাবে তালিম নিতে পারলেন না আপনাদের ওস্তাদের কাছ থেকে? ছিনতাইকারীরা কি শুধু মোবাইল আর ব্যাগ চুরি করে? সাথে তো গয়নাগাঁটিও চুরি করে নাকি! আর আপনারা? আমার হাতে অমন সুন্দর একখানা আংটি দেখেও সেটা নিতে ইচ্ছে হল না আপনাদের! সো স্যাড ফর ইউ অ্যান্ড ইয়োর রেসপেক্টেড স্যার!'
আকাশের মুখে ফুটে উঠল হাসি। স্মৃতি বলে যেতে লাগল, 'তুমি এসব কিছুই জানতে না আকাশ, কারণ তুমি লকাপে ছিলে, আর আমি যদি লকাপে এসব বলতাম তোমায়, ওই ও.সি. দীপক কুমার দাস সব কথা প্রকাশ ব্যানার্জীর কানে তুলে দিতেন, আর তাতে আমাদের প্ল্যানটাই মাঠে মারা যেত। তাই তোমায় কিচ্ছু বলিনি আমরা কেউই, তুমি টেন্সড আছো জানা সত্ত্বেও।'
— 'ইটস ওকে স্মৃতি, তুমি তো আমায় বাঁচানোর জন্যই সবটা করেছ। আর আমি টেন্সড ছিলাম না একদমই,কেন জানো? তোমার চোখেমুখে কনফিডেন্স দেখেছিলাম আমি, তখনই বুঝেছিলাম যে কিছু একটা পরিকল্পনা সাজাচ্ছ তুমি, তাই আমি একদম সিওর ছিলাম যে আমায় জেলে যেতে হবে না কোনোভাবেই।'
— 'আচ্ছা, তারপর?' আকাশের পক্ষের উকিল জিজ্ঞেস করলেন।
— 'এরপর যে কথাটা আমি বলব, তাতে শুধু প্রকাশবাবুই না, গোটা কোর্টরুম সারপ্রাইজড হবে।'
— 'কি রকম?'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : দ্বিষষ্টি পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ