Advertisement

কাহিনী (ষষ্টি পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ষষ্টি পর্ব



অঝোরে কাঁদতে লাগল ইন্দ্রজিৎ, 'জানেন মিলর্ড, আমার দিন জেগে রাত জেগে বানানো থিসিসগুলোর ক্রেডিট উনি নিজে নিয়ে পুরষ্কার জিতেছেন, নাম খ্যাতি কুড়িয়েছেন, পেয়েছেন মোটা টাকাও, আর আমি অন্ধকার ঘরে বসে কেবল চোখের জল ফেলে গেছি। টিভিতে দেখাত, কাগজে ছবি বেরোত ওনার, আর কষ্টে বুক ফেটে যেত আমার। কিন্তু বেরিয়ে আসার রাস্তা তো উনিই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে মনে হত, সুইসাইড করি, কিন্তু সাহসে কুলোয়নি।' শ্লেষের হাসি হাসল ইন্দ্রজিৎ, 'এইভাবেই ওনার বেগার খাটুনি খাটতে খাটতে তিনটে বছর কাটল৷ এরপরেই এল সেই অভিশপ্ত দিনটা।'

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


— 'অভিশপ্ত দিন?'
— 'তাছাড়া আর কি! সেদিন সকালে উঠতেই দেখি, ওই প্রকাশ ব্যানার্জীর ফোন এসেছে৷ ফোন তুলতেই বললেন ইমিডিয়েটলি ল্যাবে চলে এসো। ভাবলাম রিসার্চের কোনো দরকারে ডাক পড়েছে, তাই তড়িঘড়ি বেরিয়ে পড়লাম। ইউনিভার্সিটিতে এসেই দেখি, আমি ছাড়াও চারজন রিসার্চ স্কলারকে ডাকা হয়েছে। একটু পরেই দেখি, হেলতে দুলতে প্রকাশ ব্যানার্জী আসছেন। এসেই বললেন, 'রিসার্চের কাজে নয়, অন্য কাজে একটা জায়গায় যেতে হবে তোমাদের।'

— 'তারপর উনি আপনাদের বললেন আকাশবাবু আর কাহিনী ম্যাডামের কলেজের সামনে মুখে কালো কাপড় বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, আর ওরা এলেই ওদের কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে আকাশবাবুর মোবাইলটা ছিনতাই করতে হবে, তারপর ওনার মোবাইল থেকে আকাবাবুর গলা নকল করে সোনালিদেবীকে ফোন করে কয়েকটা খারাপ খারাপ কথা বলতে হবে, যাতে উনি বাঁচার শেষ ইচ্ছেটুকুও হারিয়ে ফেলেন, তাই না?'

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ইন্দ্রজিৎ মাথা নেড়ে সায় দিল, 'কথাগুলো ওই প্রকাশ ব্যানার্জী শিখিয়ে দিয়েছিল, আর....'

— 'আর আপনিও কেরিয়ার বাঁচাতে ওনার কথা ফলো করলেন রাইট?'

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল ইন্দ্রজিৎ। আকাশের পক্ষের উকিল বলে যেতে লাগলেন, 'সত্যি মিস্টার ইন্দ্রজিৎ দস্তিদার, আপনি দারুণ ট্যালেন্টেড, আকাশবাবুর গলাটা এমন হুবহু কপি করলেন যে মা হওয়া সত্ত্বেও সোনালি দেবী কিচ্ছু বুঝতে পারলেন না, ধন্দে পড়ে গেছিলেন উনিও। আপনার ট্যালেন্টের প্রশংসা না করে পারলাম না সত্যি!'

— 'ওটাই তো আমার সবচেয়ে দুর্ভাগ্য উকিলবাবু, ওই শয়তানটা জানত যে আমি মিমিক্রি করতে পারি, আর সেটাকেই কাজে লাগাল এভাবে! কিন্তু উকিলবাবু, আপনি কিভাবে.....'

— 'আমি কিভাবে জানলাম তাই তো, যে আপনি নিখুঁত মিমিক্রি করতে পারেন! চিন্তা নেই, সেই উত্তর এক্ষুনি পাবেন। মিলর্ড, আমি অফিসার সৌনক অধিকারীকে আরও একবার কাঠগড়ায় ডাকতে চাই।'


সৌনক এসে দাঁড়াল কাঠগড়ায়।


— 'মিস্টার অধিকারী, ইন্দ্রজিৎবাবুর প্রশ্নের উত্তরটা তাহলে দিয়েই দিন।'

— 'আসলে মিলর্ড, আকাশ অ্যারেস্ট হওয়ার পরেই কাহিনীর সাথে আমার কথা হয়। ও আমায় জানায়, যে বন্দুক তাক করে আকাশের মোবাইলটা ছিনিয়ে নিয়েছিল তার গলাটা খুব চেনা লেগেছে আকাশের। আমার বুঝতে বাকি থাকে না যে কালপ্রিট আকাশেরই চেনা কোনো লোক। তখন আমি কাহিনীকে প্রশ্ন করলাম, ও কি এরকম কাউকে চেনে যে অন্যের গলা দারুণভাবে নকল করতে পারে? প্রশ্নটা আকাশকেও করতে পারতাম লকাপে গিয়ে, কিন্তু থানার ওসিকেও হাত করেছিলেন প্রকাশবাবু, তাই আকাশকে প্রশ্ন করলে সেই খবর ওনার কাছে ঠিকই পৌঁছে যেত। কাহিনী প্রথমে ঠিক মনে করতে পারে না, কিন্তু আমি ভালো করে ভেবে দেখার পর ও বলে, 'হ্যাঁ সৌনকদা, আকাশ একজনের কথা বলেছিল আমায়, ইন্দ্রজিৎদা। সে আকাশের চেয়ে বছর দুইয়ের সিনিয়র, প্রকাশ ব্যানার্জীর আন্ডারে রিসার্চ করে। মাঝে মাঝেই ব্যানার্জীবাড়িতে আসত প্রকাশ ব্যানার্জীর সাথে দেখা করতে, সেই সূত্রেই আকাশের সাথে আলাপ। এরপর ওদের বন্ধুত্ব যখন গাঢ় হতে থাকে ক্রমশ, তখনই আকাশ জানতে পারে যে ইন্দ্রজিৎদা দারুণ মিমিক্রি করতে পারে, আর এমন নিপুণভাবে করে যে কেউ যদি চোখ বন্ধ করে ওর গলা শোনে, মনে হবে সেই মানুষটিই কথা বলছে যার গলা নকল করছে ইন্দ্রজিৎদা।' ব্যাস, আমার আর কিচ্ছু বুঝতে বাকি থাকে না।'

— 'কিন্তু সবটা যখন জানতে পেরেছিলেন আপনিই, তাহলে আপনি নিজে গিয়ে কেন অ্যারেস্ট করলেন না ইন্দ্রজিৎবাবুকে? অন্য অফিসার পাঠালেন কেন?'

— 'কারণ এটাই, ওই প্রকাশ ব্যানার্জী এতটাই ধূর্ত যে আমায় ফলো করার জন্য লোক ভাড়া করেছিল, তাই আমি যদি যেতাম অ্যারেস্ট করতে, তাহলে ইন্দ্রজিৎবাবু কোনোদিনই ধরা পড়তেন না।' বাঁকা হাসল সৌনক, 'কিন্তু এত করেও শেষরক্ষা হল না আর! ইন্দ্রজিৎবাবুর ফোন ট্যাপ করে আমরা জানতে পারি যে প্রকাশবাবু আজ সকালেই নাকি ইন্দ্রজিৎবাবুকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলেছেন। টিকিট কেটে দেওয়া থেকে শুরু করে বিদেশে থাকার ব্যবস্থা সবটাই করে দিয়েছেন উনিই, এমনকি বিদেশের ইউনিভার্সিটিতে পি.এইচ.ডি করার সুযোগও করে দিয়েছেন, অনেক লম্বা হাত কিনা!'

— 'ওরে ব্বাবা!' বাঁকা হাসি হাসলেন আকাশের পক্ষের উকিল, 'আপনি যেতে পারেন সৌনকবাবু।


সৌনক যাওয়ার পর আবার ইন্দ্রজিৎকে ডাকা হল কাঠগড়ায়।


— 'এসব মিথ্যে কথা! আমার মক্কেলকে ফাঁসানো হচ্ছে মিলর্ড!' প্রকাশের পক্ষের উকিল উঠে দাঁড়ালেন, 'আর তাছাড়া ইন্দ্রজিৎবাবু এই মাত্র স্বীকার করলেন যে উনি দারুণ মিমিক্রি করতে পারেন, সৌনকবাবুও সেটাই বললেন। তাহলে কি প্রমাণ আছে যে ডক্টর মিশ্র যে অডিওটা চালালেন একটু আগে, আপনারা যেটাকে বলছেন প্রকাশবাবুর গলা, ওটা ইন্দ্রজিৎবাবুর গলা নয়? হতেও তো পারে যে ইন্দ্রজিৎবাবুর ফোন ট্যাপ করে যে গলা শুনতে পেয়েছেন সৌনকবাবু, ওটাও আসলে ইন্দ্রজিৎবাবুরই গলা?'

— 'না ওটা আমার গলা নয়, ওটা ওই প্রকাশ ব্যানার্জীর গলা।'

— 'মিথ্যে বলছেন আপনি! ওটা আপনারই গলা, আসলে আকাশবাবুর প্ল্যানে আপনিও জড়িত, আপনারা সকলে মিলে ফাঁসাচ্ছেন আমার মক্কেলকে! মিলর্ড, এটা একটা বড় ষড়যন্ত্র, সবাই মিলে আমার নির্দোষ মক্কেলের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজেদের গা বাঁচাতে চাইছে! এদের সবার কঠিন শাস্তি দাবি করছি মিলর্ড!'

— 'ওহ তাই নাকি? তাহলে ওই দশ লাখ টাকাটা কার? আমার মক্কেল আকাশবাবু বা ইন্দ্রজিৎবাবু কারোর কাছেই তো এত ক্যাশ থাকার কথা নয়! উত্তর দিন!'

— 'সিম্পল! ওসব চৌধুরীবাড়ির টাকা, নিজেদের জামাইকে বাঁচাতে ওরাই টাকা দিয়েছে! আমার মক্কেলের এতে কোনো দোষ নেই।'


— 'না মিলর্ড, এসব মিথ্যে! ওই প্রকাশ ব্যানার্জীই আসল কালপ্রিট। এসবেই মাস্টারমাইন্ড উনিই।'

সবাই তাকিয়ে দেখে, কোর্টরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে চারজন যুবক।


— 'আপনারা কে?' জজসাহেব প্রশ্ন করলেন।

— 'আমরা ওই প্রকাশ ব্যানার্জীর আন্ডারে রিসার্চ করি। ইন্দ্রজিৎদার মতো আমাদেরও ইউজ করেছে ওই প্রকাশ ব্যানার্জী।' চারজনের মধ্যে একজন যুবক বলে উঠল।

— 'আপনাদের যা বক্তব্য কাঠগড়ায় এসে বলুন।' জজসাহেব বললেন।


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : একষষ্টি পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ