কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ঊনষষ্টি পর্ব
ডক্টর মিশ্র বাঁকা হেসে তাকালেন প্রকাশ ব্যানার্জীর দিকে, 'ঘুটিটা ভালোই সাজিয়েছিলেন প্রকাশ ব্যানার্জী, কিন্তু পড়াশুনাটা ভালোভাবে করে উঠতে পারেননি, তাই শেষ পর্যন্ত পাশ করতে আর পারলেন না!'
— 'ডক্টর মিশ্র, এখানে দেখতে পাচ্ছি ইন্দ্রজিৎবাবু টাকা দিতে এসেছেন, এখান থেকে কিভাবে প্রমাণ হয় যে প্রকাশবাবুই ওনাকে পাঠিয়েছিলেন? হতেও পারে উনি অন্য কারোর ইন্সট্রাকশন মেনে কাজ করছিলেন, আর প্রকাশবাবুকে ফাঁসানোর জন্য এসব বললেন আপনাকে?' প্রকাশের পক্ষের উকিল বললেন।
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'কারণ গল্প এখানেই শেষ নয় যে উকিলবাবু! আমাদের কাছে যে আরও দুটো প্রমাণ আছে, একেবারে জলজ্যান্ত, টাটকা!'
প্রকাশের পক্ষের উকিল কিছু বলার আগেই আকাশের পক্ষের উকিল বললেন, 'মিলর্ড, আমার একজন সাক্ষী আছে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে সে।'
ওঁর কথাটা শেষ হতে না হতেই পুলিশ একজন যুবককে টানতে টানতে নিয়ে এল কোর্টরুমে। যুবকটি প্রাণপনে নিজের মুখটা ঢাকার চেষ্টা করছিল রুমাল দিয়ে।
— 'উনি কে?'
পুলিশ টেনে যুবকটির মুখের রুমাল সরিয়ে দিল। যুবকের মুখ দেখেই চমকে উঠলেন প্রকাশবাবু, ওঁর পক্ষের উকিল আর আকাশ। স্মৃতি হাসল।
— 'উনি ইন্দ্রজিৎ দস্তিদার,যাঁকে আমরা এই মাত্র আমরা ফুটেজে দেখলাম। উনিই আমার প্রথম সাক্ষী, তবে ওনাকে কাঠগড়ায় ডাকার আগে আমি অফিসারকে ডাকতে চাই, যিনি ওনাকে অ্যারেস্ট করেছেন।
জজের অনুমতিতে অফিসারকে ডাকা হল কাঠগড়ায়।
— 'ইন্দ্রজিৎবাবুকে কোথা থেকে গ্রেপ্তার করে আনলেন? ওনার বাড়ি থেকে?'
— 'না না, উনি পাক্কা খেলুড়ে, ওনাকে কি আর বাড়িতে পাওয়া যায়? উনি আগে থেকেই বুঝে গিয়েছিলেন যে উনি অ্যারেস্ট হবেন, তাই বিদেশে রওনা দিয়েছিলেন। এয়ারপোর্ট থেকে ওনাকে অ্যারেস্ট করেছি আমরা। আর একটু দেরি হলেই উনি পালিয়ে যেতেন ঠিক হাত ফস্কে!' অফিসার কটমট করে তাকালেন ইন্দ্রজিতের দিকে।
— 'আচ্ছা বেশ, আপনি আসতে পারেন এখন।'
অফিসার নেমে যাওয়ার পর জজের অনুমতিতে ইন্দ্রজিৎকে কাঠগড়ায় ডাকা হল।
— 'ইন্দ্রজিৎদা, একসময় তুমি আমার আইকন ছিলে। তোমার ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট আমায় মুগ্ধ করত।মনে আছে, তুমি যখনই বাড়ি আসতে, আমি তোমার কাছে পড়তে চাইতাম, বলতাম, 'তুমিই ইন্সপিরেশন আমার।' আর আজ সেই তুমি!' দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশ বলল, 'তোমায় এই অবস্থায় দেখব কখনো, স্বপ্নেও ভাবিনি!'
ইন্দ্রজিৎ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল কাঠগড়ায়। ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
— 'সত্যিই ইন্দ্র! তুমি একজন ব্রিলিয়ান্ট স্কলার, সেই তুমি আজ এভাবে অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে আমায় ফাঁসাতে চাইলে? ছিঃ! আজ আমার কতটা নাক কাটা গেল সেটা বুঝতে পারছ?' নকল রাগের সুরে বলে উঠলেন প্রকাশবাবু।
— 'প্লিজ স্যার!' ইন্দ্রজিৎ হাত জোড় করল, 'আর মিথ্যে বলবেন না দয়া করে! আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো দুর্ভাগ্য এটাই যে আপনি আমার গাইড! যখন পি.এইচ.ডি তে চান্স পেলাম, সবাই বলেছিল, তুই কত লাকি রে ইন্দ্র! নামী ইউনিভার্সিটিতে রিসার্চ করবি, তাও আবার প্রকাশ ব্যানার্জীর আন্ডারে, যে কিনা দেশ বিদেশে পুরষ্কৃত! সত্যি! কত নাম আপনার ইউনিভার্সিটির বাইরে মিস্টার প্রকাশ ব্যানার্জী!' শ্লেষের হাসি হাসল ইন্দ্রজিৎ, 'সত্যিটা তো জানতে পারলাম পরে! ওই যে পুরষ্কারগুলো আপনি পেয়েছেন, তাতে আপনার বিশেষ কোনো ক্রেডিটই নেই, সব আপনার ছাত্রদের অক্লান্ত পরিশ্রমে করা আবিষ্কার, আপনি সেইসব আবিষ্কারের ক্রেডিট নিজে নিয়ে সুনাম, খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে গেছেন, টি.ভি., নিউজপেপারেও আপনাকে দেখেছে সকলে, কিন্তু....' গলার জোর বাড়িয়ে ইন্দ্রজিৎ বলে যেতে লাগল, 'কিন্তু সবাই কি জানে যে আপনি কোনো বড় বিজ্ঞানী নন, আপনি একজন শিক্ষিত চোর?'
প্রকাশবাবু রক্তচক্ষুতে তাকালেন ইন্দ্রজিতের দিকে। ইন্দ্রজিৎ হেসে বলতে লাগল, 'চোখ রাঙিয়ে কোনো লাভ হবে না স্যার, থুড়ি প্রকাশ ব্যানার্জী! আজ আমি সবাইকে চিৎকার করে সবাইকে সত্যিটা বলব। আপনি এতদিন আমার কেরিয়ার শেষ করে দেবার ভয় দেখিয়েছেন, ভয় দেখিয়েছেন আমার বদনাম করে দেওয়ার, কিন্তু আজ আর সেসবের ভয় আমার নেই! আমি জানি আমার কেরিয়ার এখানেই শেষ। আর আমি শেষ হয়েছি আজ সম্পূর্ণ আপনার জন্য, তাই যদি ডুবতেই হয়, আমি একা কেন ডুবব? আপনাকে সাথে নিয়ে ডুবব!'
— 'ওরে ব্বাবা!' প্রকাশের পক্ষের উকিলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন আকাশের পক্ষের উকিল, 'আপনার মক্কেলটি তো দেখছি সর্বঘটের কাঁঠালিকলা! কোনো অপরাধই তো করতে বাকি রাখেননি দেখছি! ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, সুইসাইডের প্ররোচনা, ঘুষ দেওয়া, এখন আবার থিসিস চুরি? বাপরে বাপ! আপনার মক্কেলটি একটি জিনিস বটে!' একটু থেমে আকাশের পক্ষের উকিল বললেন, 'ইন্দ্রজিৎবাবু, আপনি শুরু থেকে সবটা বলুন তো, যে এই কেসের সাথে কিভাবে জড়িয়ে পড়লেন আপনি?'
— 'বলব স্যার, সবটা বলব। ওই লোকটার বাইরের ঝাঁ চকচকে মুখোশটা যদি আজ আমি টেনে না খুলেছি তো আমার নামও ইন্দ্রজিৎ দস্তিদার নয়!'
— 'হুম, বলুন।'
— 'আজ থেকে তিন কি সাড়ে তিন বছর আগে আমি ওই নামী ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাই রিসার্চ করার জন্য। আর পাঁচজনের মতো আমিও প্রকাশ ব্যানার্জীকে ওই সময় বিশাল জ্ঞানী একজন ব্যক্তি মনে করতাম, তাই ওনাকে গাইড হিসেবে পাব ভেবেই আনন্দে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। মনে অগাধ আনন্দ নিয়ে আমি যোগ দিই ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু কিছুদিন পরেই জানতে পারি, ওটা কোনো ইউনিভার্সিটি নয়, কোনো রিসার্চ সেন্টারও নয়, আসলে ওটা একটা চক্রব্যূহ। ওখানে ঢোকা যায় খুব সহজে, কিন্তু একবার ঢুকে গেলে আর বেরোনোর উপায় নেই, বেরোতে চাইলেই অভিমন্যুর মতো অবস্থা হবে।'
— 'কি রকম?'
— 'ব্যাপারটা এরকম যে, রিসার্চ আমরা করব উদয়াস্ত খেটে, আর সেসবের ক্রেডিট নেবেন উনি। বিষয়টা অন্যান্য স্কলারদের কাছে জানতে পারার পরেই আমি গাইড চেঞ্জ করার জন্য অ্যাপ্লিকেশন জমা দিই, কিন্তু ইউনিভার্সিটির এইচ.ও.ডি উনি, তাই ওনার সই দরকার ছিল, কিন্তু সই তো উনি করলেনই না বরং কাগজটা ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ফেললেন। তারপর বাঁকা হেসে বললেন, 'সিংহের গুহা থেকে ছাগল কখনো স্ব ইচ্ছায় ফিরতে পারে, শুনেছ?' আর তারপর থেকেই চলতে লাগল আমার ওপর মানসিক নির্যাতন। মানসিক নির্যাতন বলতে কন্টিনিউয়াস ব্ল্যাকমেলিং। আমাকে ওনার প্রত্যেকটা কথা মেনে চলতে হবে, তা না হলে উনি যে শুধু ইউনিভার্সিটি থেকে বের করে দেবেন তাই নয়, অন্য কোথাও যাতে আমি পি.এইচ.ডি. বা চাকরি করার সুযোগ না পাই, সেই ব্যবস্থাও করে দেবেন।'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ষষ্টি পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ