কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
অষ্টপঞ্চাশৎ পর্ব
— 'সে না হয় বুঝলাম! কিন্তু ওই মহিলার জ্ঞান না ফিরলে আপনার কিসের লাভ বলুন তো? সেটাই তো বুঝলাম না আমি!'
— 'আপনার অত বুঝে কাজ কি মশাই?' প্রকাশের বাঁকা হাসি শোনা গেল, 'আম খেতে এসেছেন, আম খান তৃপ্তি করে, তারপর আঙুল চুষতে চুষতে বাড়ি যান। ক'টা আমগাছ সেসব গুনে কি কাজ আপনার?'
— 'তা ঠিকই। আমি আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবরে আমার কি দরকার বলুন! তবে হ্যাঁ আমার টাকাটা কিন্তু সময়মত....'
— 'ওসব ব্যাপারে প্রকাশ ব্যানার্জী দেরি করে না মিস্টার মিশ্র, ওপস সরি সরি ডক্টর মিশ্র। একঘন্টার মধ্যেই একটা বছর তিরিশের ছেলে পিঠে কালো ব্যাগ নিয়ে যাবে, গুনে নেবেন একদম!'
— 'ওকে!'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'উরি ব্বাবা! প্রকাশবাবু আপনাকে দশ লাখ টাকা দিয়েছিলেন! তা আপনার কাছে টাকাগুলো আছে এখনও ডক্টর মিশ্র?'
— 'তা আর নেই! ওই টাকার ব্যাগ আমি খুলেও দেখিনি!'
টাকার ব্যাগটা খুলতেই বেরিয়ে পড়ল অনেকগুলো দু'হাজার টাকার নোটের বান্ডিল।
— 'ওরে ব্বাবা, এ তো দেখছি কালো টাকা! প্রকাশবাবু, আপনার কাছে ব্ল্যাক মানিও আছে?'
— 'এসব আমার টাকা তা কে বলল আপনাকে?' প্রকাশবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন।
— 'তাই নাকি? উকিলবাবু, আমার মোবাইলে একটা ফোল্ডার আছে সিসিটিভি বলে, ওটায় একটা সিসিটিভি ফুটেজ আছে, ওটা চালান তো এক্ষুণি!' বললেন ডক্টর মিশ্র।
প্রকাশবাবু দরদর করে ঘামতে লাগলেন। ওঁর পক্ষের উকিল মনে মনে বিড়বিড় করলেন, 'কেন যে এই লোকটার কেসটা নিতে গেলাম টাকার লোভে! নিজে তো ডুববেই, সাথে আমিও হারব, নাক কান সব কাটা যাবে আমার!'
ফুটেজটা চালানো হল। ভিডিওতে দেখা গেল, একজন যুবক এসে বসল সোফায়। যুবকটির মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। ডক্টর মিশ্র একমুখ হাসি নিয়ে এসে বসলেন ছেলেটির পাশে।
— 'এনেছেন?' বাঁকা হেসে প্রশ্ন করলেন ডক্টর মিশ্র।
— 'এই নিন।' ছেলেটা পিঠের কালো ব্যাগটা খুলে নামিয়ে রাখল মেঝেতে, 'পুরো দশ লাখ আছে। চাইলে গুনে নিতে পারেন।'
— 'আরে ওসব পরে হবে! আগে দু'পেগ খেয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিই।'
— 'আপনি ড্রিংক করেন?'
— 'তা না করে আর উপায় আছে বলুন? সারাদিন হসপিটালে হাজারটা পেশেন্টের ট্রিটমেন্ট করা, সার্জারি করা, তারপর আউটডোরে বসা! একটু আধটু না খেলে এনার্জিই তো পাই না!'
— 'তা যা বলেছেন!'
— 'আর কি বলব মশাই! এত খেটেও মাসের শেষে সেই হাতে গোনা ক'টা টাকা দেয়! ভাগ্যিস প্রকাশবাবুর মতো বড়ো মনের মানুষের সাথে আলাপ হয়েছিল আমার, নইলে তো আর এত তাড়াতাড়ি এত টাকা কামানোই হত না!'
— 'হুম।'
— 'তা বলছি মশাই, আপনার চলে নাকি একটু? আরে চলে চলে, এই রাঘব, আমার আর এই বাবুর জন্য একটু পানীয়ের ব্যবস্থা কর্ তো তাড়াতাড়ি!'
— 'আমাকে যেতে হবে ডক্টর মিশ্র। দেরি করলে আবার স্যার রাগ করবেন!'
— 'স্যার মানে? প্রকাশবাবু?'
— 'হ্যাঁ।'
— 'আরে যাবেন যাবেন, অত ব্যস্ত হবেন না তো! একটু গলাটা ভিজিয়ে যান না, ক্ষতি কি! আর শুনুন, কি জঙ্গীদের মতন মুখ ঢেকে রেখেছেন বলুন তো? আরে বাবা, আমিও ক্রিমিনাল, আর আপনিও ক্রিমিনাল, আমার কাছে আবার এত কিসের লুকোচুরি?'
— 'আরে না না....'
— 'আরে ধুস! আমরা হলাম বন্ধু, বন্ধুদের মধ্যে কোনো গোপনীয়তা থাকে না, বুঝলেন? খুলে ফেলুন ওটা, রাস্তায় বেরোনোর আগে পরে নেবেন আবার, কেমন?'
ছেলেটি আস্তে আস্তে কালো কাপড়া নামাল মুখ থেকে। মুখটা দেখেই হতবাক হয়ে গেল আকাশ, অজান্তেই ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, 'ইন্দ্রজিৎদা!'
— 'আপনি এঁকে চেনেন আকাশবাবু?' আকাশের পক্ষের উকিল প্রশ্ন করলেন।
— 'হ্যাঁ, চিনি তো! আমার চেয়ে দু'বছরের সিনিয়র, এখন পি.এইচ.ডি করছে, আর ওর গাইড হল ওই প্রকাশ ব্যানার্জী!'
— 'মাই গুডনেস!' বাঁকা হাসি হাসলেন আকাশের পক্ষের উকিল, 'মিলর্ড, বুঝতে পারছেন তো ব্যাপারটা? প্রকাশবাবু এতটাই নিচ যে রিসার্চ স্কলারকেও ব্যবহার করতে ছাড়েননি!' ডক্টর মিশ্রর দিকে ঘুরে উকিলবাবু প্রশ্ন করলেন, 'এটা আপনার বাড়িতে তোলা, তাই তো?'
— 'একদম!'
— 'বাহ, খুব ভালো। তা ডক্টর মিশ্র, আপনি হঠাৎ কাহিনী চৌধুরী আর আকাশ ব্যানার্জীর পাশে কেন দাঁড়াতে গেলেন হঠাৎ?'
— 'প্রথমত উকিলবাবু, আমি একজন ডাক্তার, একটা এথিক্স আছে আমার। রুগিকে সুস্থ করে তোলা আমার কাজ, তাকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া নয়, আর দ্বিতীয়ত.....'
— 'দ্বিতীয়ত?'
— 'দ্বিতীয়ত আমি চৌধুরীদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। কাহিনীর মা, মানে সায়নী চৌধুরী আমার দূর সম্পর্কের মাসি হন, সেই সূত্রে কাহিনী আমার মাসতুতো ভাই। তবে দূর সম্পর্কের হলে কি হবে, চৌধুরীবাড়িতে যখনই যেতাম, সবসময় মনে হত আমি ওই বাড়িরই ছেলে, এক মুহূর্তের জন্যও আমার মনে হয়নি যে আমি এঁদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। শুধু কি তাই? ব্রেন স্ট্রোক হওয়ার পর বাবা যখন প্যারালাইজড হয়ে পড়েন, বাড়িতে কোনো আর্নিং মেম্বার ছিল না, তখন চৌধুরীবাড়ির মানুষগুলো আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আর্থিক আর মানসিকভাবে সাহায্য করে গেছে ওরা সবসময়। আমি যখন মেডিকেলে চান্স পাই, মা কান্নায় ভেঙে পড়েছিল, যে আমার পড়ার খরচ কিভাবে জোগাড় হবে। তখনও দাদামশাই, মানে ত্রিদিব চৌধুরী আমার মাথায় হাত রেখেছিলেন, বলেছিলেন, 'চিন্তা কি দাদুভাই? তুমি পড়ে যাও, কিভাবে কি জোগাড় হবে সেই চিন্তা আমার। মা রাজি হয়নি আর্থিক সাহায্য নিতে, তখন মাসিমণি, মানে সায়নী চৌধুরী বলেছিল, 'সরমা, টাকাটা না হয় তুই ধার হিসেবেই নে, পরে তোর ছেলে ডাক্তারি পাস করে চাকরি পেয়ে গেলে না হয় শোধ করে দিবি। আপনিই বলুন উকিলবাবু, আমার সেই বোনের শাশুড়িমাকে আমি জেনেবুঝে বিপদের মুখে ঠেলে দেব?'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ঊনষষ্টি পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ