কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
সপ্তপঞ্চাশৎ পর্ব
— 'ওইদিন আমার কলেজ ছুটি ছিল। আকাশ আর স্মৃতি, মানে কাহিনী কলেজের দিকে রওনা দিল যখন তখন পৌনে দশটা হবে, তারপর কলেজ পৌঁছে যখন আমায় ফোন করেছিল তখন দশটা কুড়ি মতো হবে।'
— 'আচ্ছা বেশ। তা আকাশবাবু যখন দশটা কুড়ি নাগাদ আপনাকে ফোন করে জানান যে ওনারা কলেজ পৌঁছে গেছেন তখন আকাশের গলা শুনে একবারও কি আপনার মনে হয়েছিল কোনোভাবে যে উনি আপনার প্রতি বীতশ্রদ্ধ বা আপনার মৃত্যুকামনা করেন উনি?' প্রশ্ন করলেন আকাশের পক্ষের উকিল।
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'না মিলর্ড, আকাশের গলা শুনে একদমই এরকমটা মনে হয়নি, ও বেশ খুশি হয়েই কথা বলেছিল তখন।'
— 'বেশ। তারপর কি এমন হল যে আপনি সুইসাইড অ্যাটেম্পট করলেন?'
— 'মিলর্ড, তখন দশটা চল্লিশ কি পৌনে এগারোটা বাজে যতদূর মনে পড়ছে, আকাশের ফোন এল আমার ফোনে। জানেন মিলর্ড, ওই সময়ে ফোনে বলা কথাগুলো শুনে এতটাই হার্ট হয়েছিলাম আমি যে একবারের জন্যও এই ভাবনাটা মাথাতেই আসেনি যে এটা আকাশ নয়, অন্য কেউ ওর গলা করে ফোন করেছিল আমায়। এখন বুঝতে পারছি, যে ফোন করেছিল তার গলাটা শুনতে অনেকটা আকাশের মতো ছিল, কিন্তু পুরোপুরি ছিল না।'
— 'বুঝি বুঝি, সবই বুঝি।' বাঁকা হেসে বলল প্রকাশের পক্ষের উকিল, 'আসলে মা তো, তাই সন্তানের প্রতি অন্ধ স্নেহে এসব বলছেন!'
— 'আজ্ঞে না উকিলবাবু, আমি মা বলেই বুঝতে পারছি পৌনে এগারোটার সময় ফোন করে যে আমার মৃত্যুকামনা করেছিল সে আমার ছেলে নয়, অন্য কেউ ছিল।'
— 'তাই? তা সেটা তখন বোঝেননি কেন?'
— 'বললাম তো, ওই সিচুয়েশনে এতকিছু ভাবার বা বোঝার মতো মনের অবস্থা আমার ছিল না, কিন্তু এখন বুঝতে পারছি আমার ভুলটা। শুধু শুধু একটা বোকামি করে আমার ছেলেটাকে এত ভোগালাম!'
— 'আপনি সিওর যে তখন আপনার ছেলে ফোন করেনি?'
— 'হান্ড্রেড পার্সেন্ট!'
— 'না! উনি পুরোপুরি মিথ্যে বলছেন মিলর্ড! পুত্রস্নেহে অন্ধ হয়ে গেছেন উনি!' চেঁচিয়ে উঠলেন প্রকাশের পক্ষের উকিল।
— 'গলার জোর দিয়ে সত্যিটা মিথ্যে প্রমাণ করা যায় না!' চেঁচিয়ে উঠলেন আকাশের পক্ষের উকিল, 'সোনালিদেবীর কথা প্রমাণ করার জন্য আমি সাক্ষী পেশ করতে চাই মিলর্ড।'
জজের অনুমতিতে ডক্টর মিশ্রকে কাঠগড়ায় ডাকা হল।
— 'আপনিই তো সোনালিদেবীর চিকিৎসা করছিলেন, তাই না?'
— 'আজ্ঞে হ্যাঁ।'
— 'তা উনি সুস্থ কবে হলেন, আই মিন জ্ঞান কবে ফিরল ওনার? আজ?'
— 'না উকিলবাবু,' হাসলেন ডক্টর মিশ্র, 'যেদিন উনি হসপিটালে ভর্তি হলেন, ওইদিন বিকেলেই জ্ঞান ফিরেছিল ওনার, কিন্তু এই কটাদিন, মানে আজ সকাল পর্যন্ত উনি অজ্ঞান হওয়ার ভ্যান করেছিলেন।'
— 'সেকি? কেন?'
— 'নইলে কি আর প্রকাশবাবুকে হাতেনাতে ধরাতে পারতাম বলুন?'
দাঁত কিড়মিড় করতে লাগলেন প্রকাশ, 'বিশ্বাসঘাতক জোচ্চোর কোথাকার! আমার কাছ থেকে মোটা টাকা নিয়ে আমার পিঠেই ছুরি মারার তাল?' মনে মনে গজগজ করতে লাগলেন তিনি।
— 'এ কাদের আপনি ভাড়া করেছেন মিস্টার ব্যানার্জী? এরা তো সব আপনার বৌমার চামচে মনে হচ্ছে! প্ল্যান সাজাবার আগে একবার লোকগুলোকে যাচাই করে নিতে পারেন নি?' নিচুগলায় বললেন প্রকাশের পক্ষের উকিল।
— 'দাঁড়ান দাঁড়ান, এর মধ্যেও প্রকাশবাবু জড়িত নাকি?' বাঁকা হাসলেন আকাশের পক্ষের উকিল।
— 'আমার কাছে একটা অডিও রেকর্ডিং আছে মিলর্ড।' ডক্টর মিশ্র নিজের মোবাইলটা দিলেন উকিলবাবুর হাতে।
অডিওটা চালানো হল ডক্টর মিশ্রর মোবাইল থেকে। অডিওতে শোনা গেল প্রকাশবাবুর কন্ঠস্বর, 'তা ডাক্তারবাবু, শুনলাম আপনি ভীষণ ইয়ং, সবে জয়েন করেছেন হসপিটালে। সংসারেও নাকি খুব অভাব, বাবা অথর্ব, ভাই এখনও বেকার, আপনি ছাড়া নাকি কোনো আর্নিং মেম্বার নেই আপনার বাড়িতে।'
— 'ও ব্বাবা, আমার ঠিকুজি কুষ্ঠি জেনে ফেলেছেন তো দেখছি! আপনার দেখছি অনেক লম্বা হাত!'
— 'এই দেখুন, আপনি কত্ত বুদ্ধিমান, তাই বুঝে গেলেন এত সহজে ব্যাপারটা! আমার বৌমাটাও যদি বুঝত একটু! যাক গে, সবই কপাল!'
— 'তা আমায় কেন ফোন করলেন আপনি? এই অধমকে কি দরকারে লাগবে আপনার?'
— 'এইবারে আসল কথায় আসি ডক্টর মিশ্র। তা সংসারে যদি একটু বেশি টাকা দিতে পারেন ধরুন, একটা নিজের চারচাকাও কিনতে পারেন, কেমন হবে ব্যাপারটা?'
— 'দারুণ হবে, কিন্তু ওসব শুধুই স্বপ্ন, এই বয়সে কি আর এত কিছু হয় বলুন?'
— 'কেন হয় না? আমি আপনার এই স্বপ্নটা সত্যি করে দিতে পারি, যদি আপনি চান।'
— 'আচ্ছা? কিভাবে? আলাদীনের প্রদীপ খুঁজে পেয়েছেন বুঝি, আর সেটা আমায় দিয়ে দেবেন?'
— 'হা হা হা, আপনি তো দেখছি বেশ রসিক মানুষ! আমিও তাই বুঝলেন, বেশ রসিক। আমাতে আপনাতে জমবে ভালো। যাক গে, ওসব কথা থাক, আসল কথায় আসি চলুন।'
— 'হুম সেই ভালো।'
— 'মিস সোনালি মৈত্রকে আপনি চিকিৎসা করছেন না?'
— 'মিস সোনালি মৈত্র? ওহো মনে পড়েছে, পঞ্চাশের কোঠায় বয়স মহিলার, ঘুমের ওষুধ খেয়ে সুইসাইডের চেষ্টা করেছিলেন। ওনাকে স্পেশাল কেয়ার দিতে হবে, তাই তো? চিন্তা করবেন না, আমাদের হসপিটালে.....'
— 'হা হা হা!' অট্টহাসির শব্দ শোনা গেল ওদিক থেকে, 'স্পেশাল কেয়ার? হ্যাঁ, তা ঠিকই বললেন। এতটাই স্পেশাল কেয়ার করবেন যাতে আগামী দু'দিন কোনোভাবেই পেশেন্টের জ্ঞান না ফেরে, পারবেন?'
— 'সর্বনাশ! কি বলছেন আপনি? যদি ধরা পড়ি একবার, চাকরি তো যাবেই, জেলও হতে পারে। না না, আমি এসবে নেই। রাখছি!'
— 'আরে শুনুন শুনুন! আমি আপনাকে দশ লাখ টাকা দেব কাজটা করার জন্য, আর তাছাড়া আপনাকে তো কিছুই করতে হবে না।'
— 'মানে?'
— 'মানে আমি একটা মেয়েকে পাঠাব, ও একটা ঘুমের ইঞ্জেকশন নিয়ে যাবে নার্সের ছদ্মবেশে, ও ই ইঞ্জেকশনটা দেবে সোনালিকে, আপনি শুধু খেয়াল রাখবেন ও যাতে কোনোভাবেই ধরা না পড়ে। আপনি অ্যালাও করলেই তো কেল্লা ফতে, তাই না? বাই চান্স যদি পরে সবটা জানাজানি হয়েও যায়, আপনার তো কোনো ভয় থাকছে না! আপনি নতুন জয়েন করেছেন হসপিটালে, সব নার্সকে আপনি যে চিনবেন না সেটাই তো স্বাভাবিক! সবাই জানবে, আপনার অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে মেয়েটি অপরাধ করেছে, আপনার গায়ে কাদা কেন, সামান্য ধুলোও লাগবে না!'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : অষ্টপঞ্চাশৎ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ