কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ষটপঞ্চাশৎ পর্ব
— 'তো মিস্টার অধিকারী, আকাশবাবু আপনাকে যখন ফোনটা করেছিলেন ওনার মোবাইল চুরি হয়ে গেছে বলে, তখন ক'টা বাজছিল? সময় দেখেছিলেন আপনি?'
— 'হ্যাঁ, তখন দশটা কুড়ি কি পঁচিশ বাজছিল।'
— 'মিলর্ড, এই দেখুন, আকাশবাবু যে সত্যিই কল করেছিলেন সেই রেকর্ডও আছে।' আকাশের পক্ষের উকিল রেকর্ডের পেপারটা জমা দিলেন।
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'মিলর্ড, এসব সাজানো। আসলে মোবাইল চুরিই হয়নি, আকাশবাবু পুরো প্ল্যানটা সাজিয়ে রেখেছিলেন আগে থেকেই। আর পয়েন্ট টু বি নোটেড, সৌনকবাবু কিন্তু আকাশবাবুর ভায়রা ভাই, অর্থাৎ আত্মীয়। তাই সৌনকবাবু যে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করবেনই আকাশবাবুকে বাঁচাতে সেটা তো পরিষ্কার।' প্রকাশবাবুর পক্ষের উকিল বললেন।
— 'তাই নাকি? আচ্ছা মিস্টার অধিকারী, আকাশবাবু তো এফ.আই.আরও করেছিলেন, তাই না?'
— 'হুম করেছিল।'
— 'মিলর্ড, এফ.আই.আরের কপি অলরেডি জমা দেওয়া হয়েছে।'
— 'তা সৌনকবাবু', প্রকাশের পক্ষের উকিল ফুট কাটলেন, 'এফ.আই.আরটা কে করতে বলেছিল আকাশবাবুকে?'
— 'আমি বলেছিলাম।'
— 'ওই দেখুন মিলর্ড, আমি বলেছিলাম না, সৌনকবাবু নিজের ভায়রা ভাইকে বাঁচাতে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন, দেখুন সেটাই সত্যি প্রমাণিত হল।'
— 'মিলর্ড, আমি আপনাকে কিছু প্রমাণ দেখাতে চাই, এটা আপনি দেখলেই বুঝতে পারবেন কে সত্যি বলছে আর কে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে।'
জজের অনুমতিতে একটা ভিডিও চালানো হল। সৌনক কাঠগড়া থেকে নেমে বেঞ্চে গিয়ে বসল।
— 'মিলর্ড, এটা কলেজের সামনের গেটের সিসিটিভি ফুটেজ। দেখুন এখানে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে, কিছু মুখঢাকা লোক এসে আকাশবাবুর মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে চলে গেল।'
বাঁকা হাসলেন প্রকাশ ব্যানার্জী, মনে মনে বিড়বিড় করলেন, 'এই ফুটেজ দেখিয়ে তুমি আকাশকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে ভাবছ? আমি তো জানতাম, কলেজের গেটে সিসিটিভি আছে, তাই তো ওদের মুখ ঢেকে যেতে বলেছিলাম! সত্যি কাহিনী চৌধুরী, তুমি এক্কেবারে শিশু আমার বুদ্ধির কাছে!'
— 'দেখুন মিলর্ড, সিসিটিভিতে টাইম দেখাচ্ছে দশটা একুশ। আমার মক্কেল যে মিথ্যে বলছেন না, সত্যিই যে ওনার ফোনটা কেউ চুরি করেছিল সেটা প্রমাণিত।'
— 'না প্রমাণিত নয়! ওই লোকগুলো যে ওনারই ভাড়া করা লোক নয় তার কি প্রমাণ আছে? আর যদি তা নাই হবে তাহলে একটু পরে আবার ওরা ফিরিয়ে দিয়ে গেল কেন ওনার মোবাইল? এটা হাস্যকর নয়? ছিনতাইকারীরা কখনো বাচ্চার হাত দিয়ে চুরি করা জিনিস ফিরিয়ে দেয়, এমন কথা কখনো শুনেছেন মিলর্ড?'
— 'মিলর্ড, এখনও আমার প্রমাণ পেশ করা শেষ হয়নি। আমি আরও একটা ভিডিও দেখাতে চাই আদালতে, আর এই ভিডিওটাই প্রমাণ করবে যে আকাশ ব্যানার্জী নির্দোষ।'
এবার প্রকাশ ব্যানার্জী একটু নড়েচড়ে বসলেন। তাঁর উকিলের সাথে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন তিনি। উকিল তাঁর কাছে গিয়ে নিচু গলায় প্রশ্ন করলেন, 'আপনি তো বলেছিলেন শুধু সিসিটিভি ফুটেজই আছে, আর কোনো ভিডিও ফুটেজ আছে ওদের কাছে বলেননি তো?'
— 'আরে আমিও কি জানতাম ছাই! কাহিনীর মোবাইলে তো কিচ্ছু ছিল না!'
জজের অনুমতিতে ভিডিও ফুটেজ চালানো হল। ফুটেজে ভেসে উঠল প্রকাশবাবুর মুখ। তিনি লকাপে দাঁড়িয়ে যা যা বলেছিলেন স্মৃতিকে, সবটা দেখা গেল ফুটেজে। ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন প্রকাশ। স্মৃতি প্রকাশের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি হাসল।
— 'এ এসব মিথ্যে মিলর্ড!' প্রকাশবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, 'এটা এডিটেড, আমায় ফাঁসানোর জন্য বানানো হয়েছে!'
— 'ওহ তাই?' বাঁকা হাসি হাসলেন আকাশের পক্ষের উকিল।
— 'একদমই তাই। মিলর্ড আমি প্রকাশবাবুর সাথে একমত। এটা ফোটোশপড। আসলে কাহিনী ম্যাডাম কোনো প্রমাণ জোগাড় না করতে পেরে একটা মিথ্যে ভিডিও বানিয়েছেন।'
— 'তাই? তা আমি যে জলজ্যান্ত এখানে দাঁড়িয়ে আছি, আমিও কি ফোটোশপড মিস্টার প্রকাশ ব্যানার্জী?'
সবাই কোর্টরুমের দরজার দিকে তাকাল অবাক চোখে। সোনালি দাঁড়িয়ে আছেন দরজায়, ওঁর মুখে হাসি লেগে আছে, আর সাথে রয়েছে একজন নার্স আর ডক্টর মিশ্র, যিনি সোনালির চিকিৎসা করছিলেন।
প্রকাশ এমনিতেই ভীত ছিলেন, তার ওপর সোনালিকে এখানে আসতে দেখে একেবারে সিঁটিয়ে গেলেন। ওঁর পক্ষের উকিল এগিয়ে এলেন প্রকাশের দিকে, ফিসফিসিয়ে বললেন, 'এ কি মিস্টার ব্যানার্জী! আপনার প্রাক্তন স্ত্রী, ছেলের বৌ তো দেখছি একেবারে আটঘাট বেঁধে নেমেছে! আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে আপনাকে এমন যে আমি কেন, ভগবান এসেও বাঁচাতে পারবে না আপনাকে!'
— 'কি আশ্চর্য! আমি তো কোর্টে আসার আগেও ডক্টর মিশ্রকে কল করলাম, উনি বললেন সোনালি অঘোরে ঘুমোচ্ছে, আজ সন্ধ্যের আগে কোনোভাবেই ঘুম ভাঙবে না! তাহলে...'
— 'তাহলে আবার কি! ওখানে কি সোনালিদেবীর ভূত দাঁড়িয়ে আছে?'
প্রকাশ দরদর করে ঘামছিলেন। উকিল নিচুগলায় প্রশ্ন করলেন, 'সোনালিদেবীর কি যমজ বোন আছে কোনো?'
— 'অসম্ভব! ওর বাপেরবাড়ির প্রত্যেককে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি, ওর কোনো যমজ বোন ফোন নেই!'
— 'আপনি কে?' জজসাহেব প্রশ্ন করলেন।
— 'উনিই মিস সোনালি মৈত্র, যাঁকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার জন্য আকাশ ব্যানার্জীকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে।'
— 'না উকিলবাবু,' আকাশ শ্লেষের হাসি হাসল, 'আমার নাম আকাশ, শুধুই আকাশ, কোনো সারনেম নেই আমার। আর যাই হোক, ব্যানার্জী পদবিটা তো আমি আমার নামের শেষে লাগাতেই চাই না!'
— 'আকাশবাবু প্লিজ! ডোন্ট বি ইমোশনাল!' আকাশের পক্ষের উকিল বললেন, 'আপনার সব অফিশিয়াল ডকুমেন্টে আপনার পদবি ব্যানার্জী আছে। এখন অযথা এসব ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। আগে তো ছাড়া পান, তারপর এসব প্রতিবাদ, মান অভিমান করবেন!'
জজের অনুমতি নিয়ে সোনালিদেবীকে কাঠগড়ায় ডাকা হল।
— 'মিস সোনালি মৈত্র, আপনি বলুন তো, কি হয়েছিল সেদিন? কেন আপনি ঘুমের ওষুধ খেয়ে সুইসাইডের চেষ্টা করলেন?' প্রশ্ন করলেন আকাশের পক্ষের উকিল।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : সপ্তপঞ্চাশৎ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ