কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
পঞ্চপঞ্চাশৎ পর্ব

এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করতে লাগল। সঞ্জয়ই নীরবতা ভাঙলেন।
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'জানো স্মৃতি, আমার আজ মনে হচ্ছে কেন যে সেদিন স্বর্ণর কথা শুনলাম! ওকে যদি বলতাম ওই শয়তান প্রকাশ ব্যানার্জীর কথায় রাজি না হয়ে শিশু আকাশকে কোলে নিয়েই বেরিয়ে আসতে ব্যানার্জীবাড়ি থেকে, আর আমিও যদি মায়ের কথা না শুনে ওকে বিয়ে করতাম, তোমাদের জীবনটা আজ এরকম ছিন্নভিন্ন হতই না! সব আমার দোষ স্মৃতি, শুধু আমার দোষ!' কান্নায় ভেঙে পড়লেন সঞ্জয়।
— 'আঙ্কেল প্লিজ! এটা ভেঙে পড়ার সময় নয়, এখন তোমায় শক্ত থাকতে হবে!'
— 'আর কত স্মৃতি? আর কত শক্ত থাকব বলতে পারো? ভালোবাসার মানুষটাকে কাছে পাইনি কোনোদিন, নিজের সন্তান বড়ো হয়েছে অন্যবাড়িতে, দিনের পর দিন স্বর্ণ চোখের জল ফেলেছে আকাশের জন্য, সব সহ্য করে নিয়েছিলাম তো স্মৃতি! আর কত সহ্য করব আমি বলতে পারো! স্বর্ণ আজ অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে হসপিটালের বেডে, আমাদের একমাত্র সন্তান বিনা দোষে লকাপে রয়েছে! আর কত সহ্য করব স্মৃতি, বলো তুমি!'
— 'জানো আঙ্কেল, আকাশ একটা জিনিসে খুব বিশ্বাস করে, আমিও করি, সেটা হল karma।'
সঞ্জয় কিছুটা শান্ত হলেন।
— 'কি ব্যাপার? কাজ হয়ে গেছে তো?'
— 'ইয়েস স্যার, সোনালি মৈত্রকে অলরেডি ঘুমের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়ে গেছে। বারো ঘন্টার আগে কোনোভাবেই ওনার ঘুম ভাঙবে না। নেক্সট ইঞ্জেকশন আবার বারো ঘন্টা পর দেওয়া হবে, সো ডোন্ট ওয়্যারি।' হাসলেন ডক্টর মিশ্র, যিনি সোনালির চিকিৎসা করছেন।
— 'ওয়েল ডান!' বাঁকা হাসলেন প্রকাশ।
— 'কিন্তু স্যার, আমার....'
— 'আরে বাবা, টাকাপয়সা নিয়ে ভাববেন না, সব পেয়ে যাবেন। আপনি শুধু কাজটা মন দিয়ে করুন।'
— 'ওকে স্যার, রাখছি।'
— 'হুম বাই। আর শুনুন, এই সিমটা আমি এক্ষুণি নষ্ট করে দিচ্ছি, আপনিও আপনার সিমটা নষ্ট করুন এক্ষুণি।'
— 'সে আর বলতে স্যার?'
ফোন নামিয়ে সিমটা আগুনে পুড়িয়ে ফেললেন প্রকাশ, 'এবার দেখব স্মৃতি, তোমার জামাইবাবু কত বড় অফিসার!'
— 'কি বলছ টা কি? কাহিনী চৌধুরীর মোবাইলে কিচ্ছু নেই?' প্রকাশবাবু উত্তেজিত হয়ে পড়লেন, 'ননসেন্স যত, ভালোভাবে খোঁজো, হিডেন ফাইল কিছু আছে কিনা দেখো।'
— 'না স্যার, সব খুঁজেছি, কিচ্ছু নেই।'
— 'ইডিয়ট জুটেছে যত! শোনো, তোমাদের দিয়ে হবে না, কাহিনীর মোবাইলটা আমাকে পাঠিয়ে দাও, আমি খুঁজে দেখব।'
স্মৃতির মোবাইলটা খুঁজে দেখলেন ভালোভাবে, কিন্তু কোনো ভিডিও বা অডিও রেকর্ডিং পেলেন না তিনি। ভ্যানিটি ব্যাগটাও খুঁজলেন, যদি কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু অদ্ভুতভাবে এখানেও কিছুই পেলেন না তিনি।
— 'তার মানে আমাদের বুদ্ধিমতী আকাশপত্নীর কাছে তো কোনো প্রমাণই নেই আমার এগেইন্সটে! তবুও এত দেমাক! বেশ, আদালতে দেখে নেব তোমাকে!'
এরপর এল সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন। আকাশকে কোর্টে তোলা হবে আজ। প্রকাশ এর মধ্যে বেশ কয়েকবার স্মৃতিকে ফোন করে বলেছেন ও যেন ওঁর শর্ত মেনে নেয়, কিন্তু স্মৃতি বারবারই নাকচ করে দিয়েছে ওঁর কথা। কোর্টে রওনা দেওয়ার আগে উনি হসপিটালে ফোন করে জেনেও নিয়েছেন, যে সোনালির এখনো জ্ঞান ফেরেনি, ফলে মুখের হাসিটাও চওড়া হয়েছে তাঁর বেশ।
কোর্টে এসেই তিনি দেখেন, স্মৃতি, সৌনক, সঞ্জয় আর রুমকি হাজির। আনা হয়েছে আকাশকেও। এসেছেন চৌধুরীবাড়ির সকলেও।
— 'দেখুন দেখি আপনাদের মেয়ের কান্ড! আচ্ছা বিয়ের পর তো মেয়েরা তাদের শ্বশুরবাড়িতেই যায় নাকি! আর আপনাদের মেয়ে কাহিনী এত জেদী যে বারবার বলা সত্ত্বেও কার না কার বাড়িতে আশ্রিতা হয়ে আছে! কিছুতেই রাজি হল না ব্যানার্জীবাড়িতে ফিরতে।' চৌধুরীবাড়ির মানুষদের উদ্দেশ্য কথাগুলো ছুড়ে দিলেন প্রকাশ।
— 'ভুল তো কিছু করেনি ও মিস্টার ব্যানার্জী। আর তাছাড়া কার না কার বাড়ি মানে? স্মৃতি তো ওর শাশুড়িমার বাড়িতে আছে, ওখানেই তো ওর থাকার কথা।' সায়নী জবাব দিল।
— 'ছাড়ো তো ছোটমা, এসব মানুষদের কথায় আবার কান দেয় নাকি কেউ? আকাশকে জেলে ঢোকাতে চান উনিই, এখন আবার নিজেকে স্মৃতির শ্বশুরমশাই বলে দাবি করছেন! লজ্জা ঘেন্না বলে কিছুই নেই ওনার রক্তে,বুঝলে?' রুমকি মুখ বেঁকিয়ে বলল।
— 'স্মৃতি!' আকাশের ডাকে পিছু ফিরে তাকাল স্মৃতি।
স্মৃতি ছুটে গেল আকাশের দিকে। আকাশের হাতদুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে স্মৃতি বলল, 'আজ সবটা ঠিক হয়ে যাবে আকাশ দেখো। তুমি শুধু ভরসা রেখো।'
— 'না স্মৃতি, আমি একদমই দুশ্চিন্তা করছি না। তোমার ঠোঁটের হাসিটুকু খুব লাকি আমার জন্য, আমি জানি। এই হাসিটাই বুঝিয়ে দিয়েছে আমায় যে আজ যা হবে, ভালো হবে।'
আকাশকে পুলিশ নিয়ে গেল কাঠগড়ায়। স্মৃতিসহ সকলে বসল। একটু পরেই জজ এলেন৷ দুই পক্ষের উকিলও তোড়জোড় শুরু করলেন নিজেদের মক্কেলের পক্ষে সওয়ালের জন্য। প্রথমেই উঠলেন প্রকাশের পক্ষের উকিল।
— 'মিলর্ড, এ তো সোজাসাপ্টা কেস! এই ছেলেটি, আকাশ ব্যানার্জী, তার মাকে দু'চক্ষে দেখতে পারত না। খুন করার সাহস ছিল না, তাই ফোনে আত্মহত্যার প্ররোচনা দিয়েছে, সিম্পল! এর কঠিন শান্তির দাবি জানাচ্ছি মিলর্ড!'
— 'না মিলর্ড, এটা সম্পূর্ণ ভুল।' আকাশের পক্ষের উকিল কোমর বেঁধে নামলেন, 'আমাদের সকলকে ভুল পথে পরিচালনা করছেন এই প্রকাশ ব্যানার্জী। উনিই লোক ভাড়া করে আকাশের মোবাইলটা চুরি করিয়েছিলেন, তারপর আকাশের গলা নকল করে সোনালিদেবীকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দিয়েছিলেন। আসলে চৌধুরীবাড়ির সম্পত্তির ওপর অনেকদিন ধরেই ওনার নজর ছিল, কিন্তু বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি, তাই ছেলে আর ছেলের বৌ যাতে ব্যানার্জীবাড়িতে ফিরে আসে তার জন্য ওদের ব্ল্যাকমেল করবেন বলেই এত বড় জাল বিছিয়েছেন উনি।'
— 'আচ্ছা? কি প্রমাণ আছে যে আমার মক্কেলই এসবের জন্য দায়ী? আর তাছাড়া মোবাইলটা ওই সময় যে চুরি হয়েছিল তারই বা কি প্রমাণ?'
—'প্রমাণ আছে মিলর্ড। আর সেজন্য আমি অফিসার সৌনক অধিকারীকে ডাকতে চাই।'
জজের অনুমতিতে সৌনক কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াল।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ষটপঞ্চাশৎ পর্ব
0 মন্তব্যসমূহ