Advertisement

কাহিনী (চতুঃপঞ্চাশৎ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চতুঃপঞ্চাশৎ পর্ব




— 'হ্যাঁ স্মৃতি, তাই তো মনে হচ্ছে।'

— 'পাঁচ মিনিট হয়ে গেছে ম্যাডাম, এবার আপনি আসুন।' একজন কনস্টেবল এসে বলল।

— 'তুমি চিন্তা কোরো না আকাশ, আমি খুব তাড়াতাড়ি আসব, আর এরপর যখন আসব তোমায় এখান থেকে বের করে নিয়ে যাব, প্রমিস।'

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


স্মৃতি ওখান থেকে বেরিয়ে এসেই দেখে, থানায় ঢুকছেন প্রকাশ ব্যানার্জী।

— 'বৌমা, আকাশকে এই থানাতেই রেখেছে শুনলাম, তাই দেখতে এলাম।'

স্মৃতি বিরক্ত হয়ে চলে আসছিল, প্রকাশ বললেন, 'বরকে ছাড়াতে চাও না?'

অবাক হয়ে স্মৃতি ঘুরে তাকিয়ে দেখে, প্রকাশ বাঁকা হাসছেন।

— 'বাড়িতে কাবেরীর কাছে মেঘা একা আছে, আমাকে একবার বাড়ি যেতে হবে এখন।'

— 'যাচ্ছ যাও বৌমা, তবে আমার কথা শুনলে লাভ তোমারই হত।' বাঁকা হেসে বললেন প্রকাশ, 'তুমি যদি চাও, আমি এক্ষুণি আকাশকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনতে পারি।'

— 'আপনি? ওহ, তাহলে আকাশ আর আমি ঠিকই ভেবেছিলাম, আপনিই তাহলে...'

— 'ওসব পুরোনো কথা থাক না মা, এখন বরং তোমরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবো। আকাশের চাকরি আছে, যদি জানাজানি হয় যে ও লকাপে আছে, চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে ওর, তুমি কি সেটা চাও যে আকাশের মতো একটা ব্রিলিয়ান্ট ছেলের কেরিয়ার শেষ হয়ে যাক এভাবে? নাকি ঘরের ছেলেকে নিয়ে ঘরে ফিরে আসবে?' ক্রূর হেসে বললেন প্রকাশ, 'আকাশ তো তোমায় কথা বেদবাক্য বলে মানে, তোমার কথাতেই তো যে মাকে ও দু চোখে দেখতে পারত না, মায়ের নামটা অব্দি শুনতে চাইত না, আজ তার সাথেই গলায় গলায় ভাব করে নিয়েছে! ভাবা যায়! আসলে বনেদী বাড়ির মেয়ে তো, বরকে কিভাবে বাগে আনতে হয় ভালোই জানো! তাই তো বলছি, একমাত্র তুমিই পারো আকাশকে আবার ব্যানার্জীবাড়িতে ফিরিয়ে আনতে। এবার তুমি ভাবো, আকাশ জেল থেকে বেরিয়ে সসম্মানে আবার কলেজ জয়েন করবে, নাকি সারাজীবন জেলে পচে মরবে? চয়েস তোমার।'

— 'প্রকাশ ব্যানার্জী, আমি যাস্ট একটাই কথা বলব, শেম অন ইউ! যে ছেলেটাকে আপনি ছোট থেকে এত বড় হতে দেখলেন, আজ তাকেই জেলে পাঠালেন? ছিঃ!'

— 'আমি তোমায় বুদ্ধিমতী ভাবতাম, কিন্তু তুমি কিনা এরকম বোকার মতো কথা বললে? প্রকাশ ব্যানার্জী শুধু দুটো জিনিস ভালোবাসে, সম্মান আর সম্পত্তি। তার জন্য আমার নিজের ছেলেমেয়েদেরও আমি জেলে পচাতে পারি, আর আকাশ তো সেখানে আমার নিজের ছেলেই নয়!' ক্রূর হাসি হাসলেন প্রকাশ ব্যানার্জী।

— 'হুম সেই। যাক, আপনিও শুনে রাখুন, আপনার সাহায্য ছাড়াই আমি আকাশকে ছাড়াব, আর আমি আকাশকে যতটা চিনি, আকাশ যদি শোনে আপনি ওকে ছাড়িয়েছেন, তাহলে ও নিজেই জেলের বাইরে আসবে না, বুঝলেন?' স্মৃতি পা বাড়াল।

— 'হসপিটালে যাচ্ছ তো? ভাবছ অভিযোগ প্রকাশ ব্যানার্জী করেছে তো কি, এই কেসে ভিক্টিম তো সোনালি মৈত্র, তাকে সুস্থ করে থানায় নিয়ে এলেই আকাশ বেঁচে যাবে! মনে রেখো সে গুড়ে বালি!'

— 'সেই, তা আর বলতে? নিশ্চয়ই কোনো নার্স বা ডাক্তারকে হাত করেছেন, যাতে আপনি যতক্ষণ না চাইছেন মামণির জ্ঞান ফিরবে না, না?'

— 'হুম, নইলে যে সকালের চুরির গল্পটা তোমার মামণি জেনে যাবেন, তাই না?'


স্মৃতি কিছু না বলে হেঁটে চলল।পিছন থেকে প্রকাশ চিৎকার করতে লাগলেন,' 'স্মৃতি, ডোন্ট বি ওভার স্মার্ট! তোমার জেদের জন্য আকাশের জীবনটা কিন্তু শেষ হয়ে যাবে আমি বলে দিচ্ছি! তুমি আমার কথা শোনো, নইলে আকাশের জীবনটা কিন্তু অন্ধকারে তলিয়ে যাবে, আর তোমার মামণি ওই হসপিটালেই পড়ে থাকবেন আজীবন, আর বাড়ি ফেরা হবে না ওনার! পুলিশ অফিসারও কিন্তু....'


স্মৃতি এবার ফিরে তাকাল।


— 'কি হল প্রকাশ ব্যানার্জী, থামলেন কেন? শেষ করুন!'

— 'তুমি বুদ্ধিমতী, বাকিটা বুঝে নাও! আর যদি না বোঝো, তাহলে আকাশকেই জিজ্ঞেস করে নিও, দীপক আঙ্কেল কে?'

— 'বুঝেছি বুঝেছি, পুলিশকে হাত না করে কি আর আপনি এত বড় জাল বিছোবেন?'

— 'বুঝেছই যখন, তাহলে আমার শর্তে রাজি হয়ে গেলেই তো পারো! তুমি সবে কলেজে থার্ড ইয়ারে পড়ো, আমার সাথে বুদ্ধিতে এঁটে ওঠা তোমার মতো দুদিনের মেয়ের কম্ম নয়, বুঝলে বৌমা?'


স্মৃতি আর দাঁড়াল না, সোজা হেঁটে চলে গেল ও।


— 'এক্কেবারে সোনালি মৈত্রর ডুপ্লিকেট হয়েছে ওর ছেলের বৌ! ভাঙবে, তবু মচকাবে না!' গজগজ করে উঠলেন প্রকাশ।


রাগী চোখে স্মৃতির দিকে তাকিয়েই ফোনটা করলেন তিনি।


স্মৃতি হেঁটে ট্যাক্সিস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছিল, হঠাৎ কিছু ছেলে ওর পথ আটকে দাঁড়াল। ছেলেগুলোর মুখ ঢাকা ছিল ঠিকই, কিন্তু স্মৃতির মনে হল, এই ছেলেগুলোই সকালে আকাশের মোবাইল চুরি করতে এসেছিল। স্মৃতি কিছু বলার আগেই ওরা স্মৃতির ভ্যানিটি ব্যাগটা ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল।


— 'এই এই, দাঁড়াও দাঁড়াও, আমার ব্যাগটা দিয়ে যাও!'

স্মৃতি বেশ কিছুদূর ছুটল ওদের পেছন পেছন, কিন্তু সফল হল না ও। রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল ও।


— 'কাজ হয়ে গেছে? বাহ, সাব্বাশ!' ফোনটা নামিয়ে রেখেই বাঁকা হাসি হাসলেন প্রকাশ ব্যানার্জী, 'ডিয়ার বৌমা, পরশু আকাশের কেসটা কোর্টে উঠছে, তার আগে পর্যন্ত তুমি তোমার ব্যাগটাও ফিরে পাবে না আর তোমার শাশুড়ির জ্ঞানও ফিরবে না।'


স্মৃতির মানিব্যাগটা ভ্যানিটি ব্যাগের মধ্যেই ছিল, তাই ব্যাগটা চুরি হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে হেঁটেই হসপিটালের পথে রওনা দিল স্মৃতি। হেঁটে হসপিটাল যেতে প্রায় আধঘন্টা লাগে, তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাঁটা দিল ও।


হসপিটালে পৌঁছেই ও দেখে, সঞ্জয় চিন্তিতমুখে বসে আছেন চেয়ারে।

— 'আঙ্কেল, কি হয়েছে? মামণি কেমন আছে এখন? আর ডক্টর কি বললেন? জ্ঞান কখন ফিরবে?'

— 'ওর বিপদ কেটে গেছে ঠিকই, তবে খুব দুর্বল ও, পালস রেটও কম রয়েছে, আর....'

— 'আর কি?'

— 'ডাক্তারবাবু বললেন স্বর্ণর জ্ঞান ফিরতে মিনিমাম দু'তিনদিন লাগবে।'

— 'সে কি আঙ্কেল? আকাশের কেসটা পরশু কোর্টে উঠবে, তার আগে যদি আন্টির জ্ঞান না ফেরে তাহলে তো সর্বনাশ!'

— 'আমিও তো তাই ভাবছি স্মৃতি! সৌনক একটু আগেই ফোন করে বলল আমায় যে পরশুই আকাশের কেসটা কোর্টে উঠছে।'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : পঞ্চপঞ্চাশৎ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ