কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ঊনপঞ্চাশৎ পর্ব
চিৎকার করে উঠল আকাশ, 'এবার আয়নার সামনে গিয়ে আমি কিভাবে দাঁড়াব বলতে পারেন? স্মৃতির সামনেই বা কি পরিচয়ে দাঁড়াব? এতদিন সবাই জেনে এসেছে আমি আকাশ ব্যানার্জী, কিন্তু আজ থেকে? আজ থেকে আমি আমার সারনেম কি বলব, একবারও ভেবেছ তুমি?'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
মাটিতে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ল আকাশ। সোনালি বললেন, 'তুই তো সবটা শুনলি, তারপরেও এত ঘৃণা তোর মনে? তুই বলতে পারিস আমার দোষটা কোথায়?'
— 'এখনও? এখনও তুমি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে এত তৎপর? একবারও ভাবছ আমার পরিস্থিতিটা? ভেতর থেকে শেষ হয়ে গেলাম আমি আজ, হয়ত মরেই যেতাম আজ আমি যদি স্মৃতি আর মেঘা না থাকত আমার জীবনে!' শ্লেষের হাসি হাসল আকাশ, 'এত বড় পৃথিবীর বুকে আমার নিজেকে একটা খড়কুটো মনে হচ্ছে, যার না আছে কোনো শেকড়, না আছে পায়ের তলার মাটি!'
— 'তোর জায়গায় যদি আমি থাকতাম, হয়ত একইভাবে রিয়্যাক্ট করতাম, কিন্তু তুই তো বড় হয়েছিস বাবা, তুই সবটা জেনেও....'
— 'কেন এলে তুমি? বেশ তো চলে গিয়েছিলে আমায় ছেড়ে দূরে, তারপরেও কেন আবার ফিরে এলে? আমার গোছানো জীবনটা ভেঙেচুরে শেষ করে দেবে বলে? জানো মিস সোনালি মৈত্র, আজ আমি শুধু এটাই বুঝতে পারছি, তোমার আর প্রমীলা চৌধুরীর মধ্যে কোনো তফাত নেই।'
আকাশ চলে যেতে উদ্যত হলে সোনালি প্রশ্ন করলেন, 'কোথায় যাবি তুই এখন?'
— 'রাতটুকু কোনো হোটেলে কাটাব, দরকার হলে রাস্তায় থাকব, তবু তোমার ফ্ল্যাটে কোনোদিন যাব না, আর স্মৃতিকেও যেতে দেব না।'
গটগট করে হেঁটে আকাশ বেরিয়ে গেল হসপিটাল থেকে। সোনালি বারবার ডাকা সত্ত্বেও আকাশ ফিরেও তাকাল না। সেই সময়েই সোনালির ফোনটা বেজে উঠল, ফোনটা তুলে সোনালি দেখে, সঞ্জয়ের ফোন। রিংটোন বেজে চলে,
বল মন সুখ বল
বলে চল অবিরল
তোর সুখ নামে যদি সুখ আসে জীবনে
বল মন বলে চল
না ভেবেই ফলাফল
যদি তোর ডাকে বসন্ত আসে শ্রাবণে।
কিন্তু সোনালি যে ফোনটা ধরার মতো মানসিক অবস্থাতেই ছিলেন না, তাই ফোনটা বেজেই চলল.....
বল মন প্রেম বল প্রেমহীন জীবনে
জীবনে না থাকুক প্রেম থাকুক স্বপনে
ওরে বল মন বল যে জানে সে জানে একা তুই ই সম্বল।
বল মন সুখ বল
বলে চল অবিরল
তোর সুখ নামে যদি সুখ আসে জীবনে।
সোনালি যে সঞ্জয়ের ব্যর্থ প্রেমিকা, তাই সঞ্জয় ফোন করলেই যাতে এই গানটা বারবার মনে করিয়ে দেয় সেকথা, তাই এই গানটা সেট করেছেন তিনি, শুধু সঞ্জয়ের ফোন এলেই গানটা বাজে।
ফোনটা বেজে বেজে কেটে গেল। সোনালি একরাশ শূন্যতা বুকে নিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন। একটু পরেই সঞ্জয় এলেন হসপিটালে।
— 'এ কি স্বর্ণ, কি হয়েছে? তুমি এভাবে বসে আছো কেন? তুমি ফোনটা ধরছ না দেখে আমি ছুটে এলাম।'
সোনালির কাঁধে হাত রাখলেন সঞ্জয়।
সোনালি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সঞ্জয় বুকে টেনে নিলেন ওঁকে, 'কি হয়েছে স্বর্ণ? তোমার চোখে জল?'
— 'আকাশ সবটা জেনে গেছে সঞ্জয়!' একবুক হতাশা নিয়ে বললেন সোনালি।
— 'সবটা মানে? আমার কথাটাও?'
— 'হ্যাঁ সঞ্জয়, ও সবটা জেনে গেছে। এখন বলছে, আমার ফ্ল্যাটে আর থাকবে না ও, স্মৃতি আর বাচ্চাটাকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবে।'
— 'কি বলছ স্বর্ণ? আকাশ সবটা শুনেও তোমায় ভুল বুঝল?'
— 'হ্যাঁ, ওই প্রকাশ ব্যানার্জীকে বিয়ে করাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। লোকটার মনে যে ভয়ংকর বিষ জমে আছে, তার বিষবাষ্প আজও আমার জীবনটাকে নরক করে তোলার জন্য যথেষ্ট।'
— 'সত্যি স্বর্ণ, শিক্ষিত লোকের ভেতরেও যে জানোয়ার থাকতে পারে তা এই লোকটাকে না দেখলে বুঝতামই না। এখন আবার শুনেছি কোন্ এক নামী ইউনিভার্সিটির বিভাগীয় প্রধান হয়েছেন উনি!'
— 'শোনো সঞ্জয়, ওই লোক এখন কোথায় কি করে আমার বিন্দুমাত্র জানার ইচ্ছে নেই! আমার ছেলেটাকে সারাজীবনের মতো পর করে দিয়েছে ও!'
এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করতে লাগল। রাজপথের রাস্তাও আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে আসতে লাগল।
পরেরদিন সকাল হতে না হতেই আকাশ হসপিটালে চলে এল। আজকেই স্মৃতিদের ছেড়ে দেওয়ার কথা। সব ফর্মালিটি শেষ করে আকাশ মেঘাকে কোলে নিয়ে এগিয়ে এল গেটের দিকে, ওর পাশে আস্তে আস্তে হেঁটে এল স্মৃতি। ওরা সবে বেরোতে যাবে হঠাৎ ওদের সামনে এসে দাঁড়াল গাড়িটা৷ গাড়িটা কার সেটা জানতে আকাশের বাকি ছিল না, তাই বিরক্ত আকাশ মুখ ঘুরিয়ে নিল, আর স্মৃতির মুখে ফুটে উঠল হাসি।
গাড়ি থেকে নেমে এলেন সোনালি, 'আমার ওপর রাগ করে স্মৃতিকে কষ্ট দিও না আকাশ, এই অবস্থায় কি বাসে বাড়ি ফিরবে ও?'
— 'প্লিজ!' গর্জে উঠল আকাশ, 'আপনি আমাদের অনেক দয়া করেছেন, কিন্তু আর আপনার দয়ার প্রয়োজন নেই আমাদের। এবার আমাদের একটু শান্তিতে বাঁচতে দিন, প্লিজ! আর স্মৃতির খেয়াল আমি রাখব না, তা আপনাকে কে বলল? আমি অলরেডি ক্যাব বুক করে নিয়েছি, ক্যাব এল বলে, এলেই আমরা...'
— 'কেন আকাশ? আমার গাড়িটা থাকতেও তোমরা ক্যাবে ফিরবে? কেন?'
— 'কারণ একটাই, ওটা আপনার গাড়ি।'
— 'আকাশ প্লিজ!' স্মৃতি বলল, 'মামণি সারাটাজীবন শুধু কষ্টই পেয়ে এসেছে, আর ওঁকে কষ্ট দিও না তুমি! উনি তো তোমার মা আকাশ, ওঁকে কাছে টেনে নাও তুমি, দূরে সরিয়ে দিও না এভাবে, এতে তো তোমরা দুজনেই কষ্ট পাচ্ছো বলো!'
— 'সেটাই তো স্মৃতি, উনি আমার জন্মদাত্রী এটাই যে সবচেয়ে লজ্জার আমার কাছে! স্মৃতি তুমি বলো, এতদিন আমি জেনে এসেছি আমি ব্যানার্জীবাড়ির ছেলে, কিন্তু
আজ শুনছি সেসব মিথ্যে! কিভাবে আমি অ্যাক্সেপ্ট করব স্মৃতি, বলো? তুমি হলে পারতে বলো?'
— 'আমি তো বলছি না আকাশ তুমি আজকেই সবটা মেনে নাও, আমি জানি এতদিন পর সত্যিটা জেনে তুমি অনেক বড়ো ধাক্কা পেয়েছ, আমি শুধু বলছি, তুমি নিজেকে সময় দাও আকাশ, শুধু ওনার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিও না, প্লিজ! এখন চলো তো, গাড়িতে গিয়ে বসবে চলো, ক্যাব ক্যান্সেল করে দাও।'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : পঞ্চাশৎ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ