Advertisement

কাহিনী (অষ্টচত্বারিংশ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
অষ্টচত্বারিংশ পর্ব



স্মৃতি সোনালির হাতটা শক্ত করে ধরল। সোনালি বলতে লাগলেন, 'অগত্যা আমি রওনা দিলাম বাপের বাড়ির পথে, কিন্তু সেখানে যে বেশিদিন আমি থাকতে পারব না আমি জানতাম, হাজার প্রশ্ন উঠবে যে তাও জানতাম। কোনোরকমে স্কলারশিপের পাওয়া টাকা দিয়ে একটা মেসে গিয়ে উঠলাম কোনোরকমে। টিউশন জোগাড় করলাম বেশ কয়েকটা, ওই টাকা দিয়েই চলত কোনোরকমে। ঈশ্বরের অশেষ কৃপা, কিছুদিন পরেই একটা ইউনিভার্সিটিতে পি.এইচ.ডি করার সুযোগ পেয়ে গেলাম, স্টাইপেন্ড যা পেতাম তাতে চলে যেত মোটামুটি। এরপরেই একদিন ডিভোর্স পেপার পাঠাল আমায় প্রকাশ, ওর সই করাই ছিল, আমিও সই করে দিলাম। তারপর ক'টাদিন পরেই একটা কলেজে চাকরি পেয়ে গেলাম, কিছুদিন পর সঞ্জয়ও ওই কলেজেই চাকরি পেল। জানিস স্মৃতি,' একটু থেমে সোনালি বললেন, 'ব্যানার্জীবাড়ির শুধু একজনই আমায় মনে রেখেছিল, সে হল ড্রাইভার বিকাশদা। ওই বাড়ি থেকে চলে আসার পরেও বিকাশদার সাথে আমি যোগাযোগ রেখেছি সমানে, ওর কাছেই খোঁজ পেতাম আকাশের। ওর কাছেই জানতে পেরেছিলাম, প্রকাশ সেই ছোটবেলা থেকে আকাশকে ওর জন্মদাত্রী মায়ের সম্পর্কে এত খারাপ কথা বলেছে যে ও শুধু ওর মা নয়, গোটা নারীজাতির প্রতিই বীতশ্রদ্ধ। তুইই ওর সেই ভুল ধারণাটা ভেঙেছিস মা, আর সেজন্য তোর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।'

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


— 'সঞ্জয় আঙ্কেলকে বিয়ে করলে না কেন মামণি?'

— 'বাধ্য হয়ে রে মা। সঞ্জয় চাকরি পাওয়ার কিছুদিন পরেই ওর বোনের বিয়ে হয়ে গেল, ও আমার কথা জানাল মাকে, কিন্তু সবটা শুনে ওর মা কিছুতেই বিয়েতে মত দিলেন না জানো। অবশ্য ওঁকে তার জন্য দোষ আমি দিইনি, এক ডিভোর্সী চরিত্রহীনা মেয়ে, যে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছে, তার সাথে কেন ছেলের বিয়ে দিতে চাইবেন উনি? সঞ্জয় ওঁর অমতেই আমায় বিয়ে করতে চেয়েছিল, তারপর বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু উনি বলেছিলেন, সঞ্জয় যদি আমায় বিয়ে করে, উনি আর সঞ্জয়ের কাছ থেকে একটা টাকাও নেবেন না! তুইই বল্ স্মৃতি, সঞ্জয়ের টাকা যদি উনি না নিতেন, তবে চলত কিভাবে ওঁর? তাই, ব্যর্থ প্রেমিকা হয়েই রয়ে গেলাম আমি, ঘরনী হতে পারলাম কই?' শ্লেষের হাসি হাসলেন সোনালি, চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল জল।

— 'মামণি, অনেক কষ্ট পেয়েছ তুমি গো, সামান্য সুখটুকু পর্যন্ত পাওনি!' স্মৃতির চোখও ভিজে গেল।

— 'কে বলল পাইনি? তোর মতো বৌমা পেয়েছি, এ কি কম সুখের কথা? জানিস স্মৃতি, তোকে আর আকাশকে যখন সেই ঝড়ের রাতে ব্যানার্জীবাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল, বিকাশ সবটা জানিয়েছিল আমায় ফোন করে, আর আমি আর সঞ্জয় তোদের খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলাম সে রাতেই! কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস দেখ্! সব জায়গা খুঁজলাম, শুধু অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজটা ছাড়া! সারারাত খুঁজে যখন সকালে ফিরছি আমি, তোদের চোখে পড়ল আমার।'

স্মৃতি সোনালির হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, 'হারানো ছেলেকে যখন একবার ফিরে পেয়েছ, তখন তাকে তোমার কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার মামণি। আকাশ তোমায় সবটা জেনেই কাছে টেনে নেবে দেখো।'

— 'না স্মৃতি, ওটি আর হবে না! আকাশের চোখেমুখে ওর মায়ের জন্য তীব্র ঘৃণা দেখেছি আমি, যেটা এই সাতাশটা বছর ধরে একটু একটু করে প্রকাশ ব্যানার্জী গড়ে তুলেছে ওর ভেতরে। এতদিন ধরে বেড়ে ওঠা যে ঘৃণার বৃক্ষ গোটা মন জুড়ে নিজের শাখাপ্রশাখা বিছিয়েছে, তা কি এত সহজে বিনষ্ট হবে রে মা? হবে না।' একটু থেমে সোনালি বলল, 'আমার জীবনে তো যা হওয়ার হয়েই গেছে, এই যে তোরা আমার কাছে আছিস, আকাশ আমায় মামণি বলে ডাকে, মায়ের মতই ভাবে, এই প্রাপ্তিটুকু বুকে নিয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব।'

ঘরে এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল। সোনালিই নিস্তব্ধতা ভাঙলেন, 'দেখ দেখি আমার কান্ড! কত রাত হল, তুই কোথায় রেস্ট নিবি, তা না যত হাবিজাবি কথা বলে তোর মন খারাপ করে দিলাম! তুই আমার কথা ছাড় তো, এবার ঘুমিয়ে নে।'

ঘুমন্ত মেঘাকে দোলনায় রেখে স্মৃতির কপালে হাত বুলিয়ে সোনালি বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। ক্লান্ত স্মৃতির চোখে ঘুম নামতে দেরি হল না।


সোনালি সবে হসপিটালের গেটটা পার হতে যাবেন, হঠাৎ এক হাততালির শব্দে মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন তিনি। ঘুরর দেখেন, আকাশ হাততালি দিচ্ছে তাঁর দিকে তাকিয়ে, রক্তাভ চোখদুটো জলে ভেজা ওর, আর সেই চোখে একরাশ ঘৃণা ঝরে পড়ছে যেন।

সোনালি ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে গেলেন, 'আকাশ তুমি এখন এখানে? এখনও বাড়ি যাওনি তুমি?'

— 'বাড়ি?' অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল আকাশ, 'কোন্ বাড়িতে যাব আমি? কার বাড়িতে যাব?'

— 'কেন আকাশ, আমার ফ্ল্যাটে যাবে তুমি, তোমার মামণির ফ্ল্যাটে যাবে!'

— 'মিস সোনালি মৈত্র, তোমার আসল পরিচয় আমি পেয়ে গেছি। দরজার আড়াল থেকে সবটা শুনেছি আমি! সত্যি, তুমি এত খারাপ একজন মানুষ? প্রকাশ ব্যানার্জীকেও আমি পছন্দ করি না ঠিক, কিন্তু সে তো তবু সামনে থেকে ছুরি মারে, আর তুমি? তুমি এতটাই ভয়ংকর যে পিছন থেকে ছুরি মারো! নিজের পরিচয় কি নিপুণভাবে গোপন রাখলে তুমি, আর এতগুলো দিন ধরে অভিনয় করে গেলে! সত্যি, আজ তোমায় দেখে বুঝতে পারছি, ছোট থেকে যা শুনে এসেছি, তার একটা কথাও মিথ্যে নয়।'

— 'না আকাশ, কিচ্ছু জানো না তুমি! আমি যখন ব্যানার্জীবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি, তখন তোমার মাত্র দেড় বছর বয়স, তুমি কিভাবে জানবে আসল সত্যিটা কি?'

আকাশ হাতজোড় করল সোনালির সামনে, 'প্লিজ ম্যাডাম, আমায় রেহাই দিন আপনারা। একটু যে আগে সত্যিটা জানলাম এরপর আর কোনো কদর্য সত্যি জানার বিন্দুমাত্র রুচি নেই আমার। এতদিন জানতাম, প্রকাশ ব্যানার্জী অত্যন্ত অহংকারী একজন লোক, কিন্তু সেই আমার জন্মদাতা, কিন্তু আজ? আজ শুনছি সে নয়, আমার বাবা অন্য একজন, যিনি আমার বিয়ের সাক্ষী হয়েছেন আর আমি কিছু না জেনে তাঁকে প্রণামও করেছি!'

সোনালি আকাশকে স্পর্শ করতে গেলেন, কিন্তু আকাশ এক ঝটকায় দূরে সরে গেল।

— 'প্লিজ, আমার কাছ থেকে দূরে থাকুন আপনি? আপনি যে আমাকে শেষ করে দিয়েছেন তিলে তিলে সেটা কি বুঝতে পারছেন? ছোট থেকে মায়ের অভাব পেয়ে বড় হয়েছি, পরে বাবাকেও হারালাম, সবটা মেনে নিয়েই নিজের জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম আমি, হঠাৎ এতবছর পর আপনি কেন এলেন মিস মৈত্র? আমার জীবনটা তো ছোট থেকেই এলোমেলো, সবে একটু গুছিয়ে এনেছিলাম, আবার একটা কালবৈশাখী এসে সব তছনছ করে দিল!' চোখের জল মুছে আকাশ এগিয়ে গেল সোনালির দিকে, তারপর সোনালির কাঁধদুটো ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করল, 'আমি জন্মানোর আগেই কেন শেষ করে দিলেন না আমাকে? কেন আমাকে জন্ম দিয়ে তিলে তিলে শেষ করতে চাইলেন আপনারা সকলে?'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ঊনপঞ্চাশৎ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ