কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ষটত্রিংশ পর্ব
একটা ভাঙা চেয়ারে হাত পা মুখ বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে রুমকি। তাড়াতাড়ি গিয়ে ওর হাত পা মুখ খুলে দিলেন স্বর্ণালী।
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'আপনারা এত নীচ সমরেশবাবু? পুত্রস্নেহে এতটাই অন্ধ যে একটা মেয়েকে যে ঘরে বন্দি করে রেখেছে ছেলে তার প্রতিবাদটুকুও করেননি? এমনকি ওকে ঘর থেকে বের পর্যন্ত করেননি?'
— 'বিশ্বাস করো বাবা, আমরা জানতাম যে অভিজিৎ ওর গায়ে হাত তোলে, কিন্তু ওকে যে ঘরে আটকে রেখেছে ও সেটা জানতাম না সত্যিই।'
— 'থামুন তো! আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকবেন না! যদি জানতেনই ছেলে তার বৌয়ের গায়ে হাত তোলে, প্রতিবাদ করেননি কেন?'
— 'বিশ্বাস করুন, আমরা বারবার বৌমাকে বলতাম, এই নরকে আর পড়ে থেকো না, বাপের বাড়ি ফিরে যাও! কিন্তু বৌমা উত্তর দিত, আমার কোনো বাপের বাড়ি নেই মা, যতগুলো দিন বাঁচব, এই বাড়িতে থাকা ছাড়া আর উপায় নেই আমার!'
— 'রুমকিদি কতটা অভিমান থেকে কথাগুলো বলেছে আমি জানি মামণি, স্মৃতির ওপর এত অত্যাচার করেছে ওই বাড়ির লোক, বিশেষ করে রুমকিদির মা, সেসব জানার পর থেকে আর ওই বাড়ির সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়নি রুমকিদি।'
— 'হ্যাঁ গো বাবা, তুমি একদম ঠিক বলেছ। আমি কতবার বলতাম, বাড়ি না যাও অন্তত মা বাবাকে ফোন তো করতে পারো মাঝে মাঝে! কিন্তু তাও করত না ও, এমনকি চৌধুরী বাড়ি থেকে কেউ যদি আসতে চাইত, ও বারণ করত আসতে! এরপর কি করতাম বলুন আমরা?'
— 'বাহ, এটুকুতেই আপনাদের সব দায়িত্ব শেষ? ছেলে যে অন্যায় করত তার প্রতিবাদটুকুও করেননি কখনো?'
— 'আর প্রতিবাদ!' শ্লেষের হাসি হাসলেন সমরেশ বাবু, 'যে ছেলের পকেটে সবসময় পিস্তল থাকে, মতের বিরুদ্ধে কথা বললেই কপালে পিস্তল ঠেকায়, সেই ছেলেকে আর কি বারণ করব বলুন!'
— 'সেই! নিজেদের প্রাণের ভয়ে একটা অসহায় মেয়ে যে পড়ে পড়ে মার খাচ্ছে সেটা থামানোর কোনো চেষ্টা করলেন না আপনারা! বাহ! পুলিশেও তো খবর দিতে পারতেন নাকি!'
— 'দেখুন ম্যাডাম, আমাদের সরকার পরিবারকে শহরের সকলে এক ডাকে চেনে, পুলিশকে বাড়িতে ডাকলে.....'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ ব্যস ব্যস আমি বুঝে গেছি সব!' আকাশ গর্জন করে উঠল, 'এক্কেবারে চৌধুরীবাড়ির কার্বন কপি! সম্মান সম্মান আর সম্মান! কিসের ফালতু সম্মানের এত বড়াই আপনাদের, যে সম্মানের জন্য মানুষকে এত অত্যাচারিত হতে হয়?'
— 'সত্যিই তাই! অন্যায় করেও আবার সেটাকে জাস্টিফাই করছেন! আর একই বাড়িতে থেকেও আপনারা জানতেন না যে রুমকিকে চিলেকোঠার ঘরে আটকে রাখা হয়েছে! মিথ্যেটাও ভালোই বলেন দেখছি!'
— 'না স্বর্ণালী ম্যাডাম, আমরা মিথ্যে বলিনি, আজ সত্যিই অভিজিৎ বৌমাকে নিয়ে বেরিয়েছিল বিকেলে, বলল, কোন্ এক পার্টিতে যাচ্ছে ওরা!'
— 'হ্যাঁ আকাশ', রুমকি ক্ষীণকন্ঠে বলল, 'মা বাবা সত্যিই কিছু জানতেন না গো! অভিজিৎ আমায় নিয়ে বেরিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু হঠাৎই একজন লোকের সাথে দেখা হয় আমাদের, সে ড্রাগ পাচারে সাহায্য করত ওকে। ওর কথাবার্তা শুনেই আমি জানতে পারি, যে ওর ড্রাগ হেরোইন এসবের অসাধু ব্যবসা আছে। ও জানত, আমি সবটা জানিয়ে দেব সবাইকে, তাই আমার হাত পা মুখ বেঁধে বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে আমায় চিলেকোঠার ঘরে নিয়ে আসে!' আর বলতে পারল না ও, হাঁফাতে লাগল।
— 'থাক রুমকিদি, তোমার পাপের শান্তি যথেষ্ট পেয়েছ তুমি, আর প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না তোমায়। তুমি এসো তো আমার সাথে!'
— 'না আকাশ, আমি কিছুতেই চৌধুরীবাড়ি ফিরব না! কে বলতে পারে, হয়ত আমাকেও বের করে দেবে!'
— 'ভয় নেই রুমকিদি, তোমায় চৌধুরীবাড়ি যেতে হবে না, তুমি তোমার বোনের কাছে থাকবে, চলো।'
— 'কি যে ছেলেমানুষি করো না তুমি আকাশ!' হাসল রুমকি, 'বোনের শ্বশুরবাড়িতে থাকা কি ভালো দেখায়?'
— 'বোনের শ্বশুরবাড়িতে থাকা না নয় অসম্মানের, কিন্তু ভাইয়ের বাড়িতে থাকায় তো কোনো অসম্মান নেই রুমকি!' স্বর্ণালী বললেন, 'আকাশ তো তোমার ভাই নাকি!'
এবার আর আপত্তি করতে পারল না রুমকি।
স্মৃতি জানত, রুমকিকে এখানেই আনা হবে, তাই ও অপেক্ষা করছিল, রুমকি আসতেই ওকে বুকে জড়িয়ে ধরল স্মৃতি।
— 'কাহিনী, আমার একটা কথা রাখবি সোনা?'
— 'হ্যাঁ বলো না রুমকিদি।'
— 'তুই প্লিজ চৌধুরীবাড়িতে কিচ্ছুটি জানাস না রে!'
— 'বেশ রুমকিদি।'
কেটে গেল আরও কিছু দিন। এগিয়ে এল পরীক্ষার দিন। আকাশ আর স্মৃতি গাড়িতে সবে উঠে বসেছে, কিছু গুন্ডা এসে পথ আটকাল ওদের।
— 'শুনুন আকাশবাবু, আপনার সাথে কোনো শত্রুতা নেই আমাদের, আপনি যেখানে যাচ্ছেন যান, শুধু শিউলি ম্যাডামকে বাড়িতে রেখে আসুন এক্ষুণি!' লোকগুলো এসে দাঁড়াল গাড়ির সামনে।
আকাশ স্মৃতিকে নিচুগলায় বলল, 'এসব হচ্ছে হিয়ার কন্সপিরেসি বুঝলে? ওকে কলেজ থেকে বেরিয়ে যেতে হবে পরীক্ষার পরেই, তাই তোমায় পরীক্ষা দিতে দেবে না ও, রিভেঞ্জ নিচ্ছে ও, বেশ, আমিও তাহলে দেখছি ও কি করতে পারে!'
আকাশ আর স্মৃতি কেউই গাড়ি থেকে নামল না, বরং গাড়ি স্টার্ট দিল আকাশ, চেঁচিয়ে বলল, 'আমরা চললাম, তোমরা যদি গাড়ির তলায় চাপা পড়তে চাও, পড়তে পারো।'
লোকগুলো সরে গেল ঠিকই, তবে একজন একটা ঢিল ছুড়ে মারল, যাতে উইন্ডস্ক্রিন ভেঙে গেল। ঢিলটা আরেকটু হলেই স্মৃতির গায়ে লাগত, সামান্যর জন্য বেঁচে গেল ও।
আকাশ গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে চলল কলেজের দিকে। ও জানত, কলেজের গেটের সামনেও এরকম গুন্ডাবাহিনী দাঁড়িয়ে থাকবে, তাই আগে থেকেই কলেজের শিক্ষক শিক্ষিকাদের সব জানিয়ে দিল আকাশ।
আকাশ যা ভেবেছিল ঠিক তাই হল, গাড়ি থেকে নেমে কলেজের গেটের দিকে যেতেই ওরা দেখল, গুন্ডাবাহিনী দাঁড়িয়ে আছে।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : সপ্তত্রিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ