কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
সপ্তত্রিংশ পর্ব
— 'সত্যি আকাশ, হিয়ার কথা যতই ভাবি হাসি পায় আমার!'
— 'না স্মৃতি, এটা হিয়ার কাজ নয়। হিয়া এই প্ল্যানে আছে ঠিকই, কিন্তু এত গুন্ডা ভাড়া করার ধক হিয়ার নেই। ও শুধু দিপুকে লাগাতে পারে, এই পর্যন্তই। আর যে লোকগুলো এসেছিল ওরা কেউই এই কলেজের নয়, দিপুর বন্ধুবান্ধবদের মুখ আমার ভালোই চেনা।'
— 'তাহলে?'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'কোনো পাকা মাথা রয়েছে এর পেছনে স্মৃতি, হিয়ার কাঁচা মাথা এতকিছু করতে পারবেনা কখনোই।'
— 'তাহলে কে? বড়মা?'
— 'না স্মৃতি, আমি কাকলি আন্টিকে যতটা চিনি উনি ঝগড়াঝাঁটি করে সিনক্রিয়েট করতে পারেন, ঐটুকুই, কিন্তু গুন্ডা ভাড়া করা? না না, এটা ওনার পক্ষে পসিবল না।'
— 'সে কি আকাশ, এরা ছাড়া আর কোন পাকা মাথার শত্রু আছে আমাদের?'
— 'সিম্পল স্মৃতি, আমি আর তুমি আলাদা হয়ে গেলে যার লাভ আছে ভীষণই!'
— 'হ্যাঁ কিন্তু কে সে?'
— 'স্মৃতি', আকাশ স্নেহমাখা গলায় বলল, 'তুমি না পরীক্ষা দিতে এসেছ! এখন এসব শুনে কাজ নেই, তুমি যাও মন দিয়ে পরীক্ষাটা দিয়ে এস তো!' স্মৃতির গাল টিপে দিল আকাশ, 'এবারেও কিন্তু গোল্ড মেডেল এনে সবার মুখে ঝামা ঘষে দিতে হবে, পারবে তো?'
— 'তোমার আশীর্বাদ থাকলে অবশ্যই পারব।' স্মৃতি আকাশকে প্রণাম করতে যাচ্ছিল, আকাশ আটকাল।
— 'স্মৃতি, তোমায় কতবার বলেছি তোমার জায়গা আমার পায়ে নয়, আমার বুকে।'
— 'তা হোক, তবু আমার টিচার তো তুমি, এই প্রণামটা তোমার তাই প্রাপ্য।'
— 'আচ্ছা ঠিক আছে ম্যাডাম, তোমার প্রণাম আমি নিয়ে নিয়েছি অলরেডি, আর পায়ে হাত দিতে হবে না! এবার তুমি যাও, নইলে কিন্তু লেট হয়ে যাবে।'
স্মৃতি ক্লাসরুমের দিকে যাচ্ছিল, আকাশ ডাকল।
— 'বেস্ট অফ লাক মাই ডিয়ার!'
— 'থ্যাংক ইউ স্যার!' হাসিমুখে স্মৃতি রওনা দিল।
পরীক্ষাটা নির্বিঘ্নেই মিটল। কিন্তু ফেরার পথে আবার বিপদের মুখে পড়ল দুজন। আকাশ আর স্মৃতি গাড়িতে ওঠার পর আকাশ যতবারই গাড়িতে স্টার্ট দিতে যাচ্ছে, কিছুতেই স্টার্ট নিচ্ছে না গাড়িটা। বাধ্য হয়েই মোটর মেকানিক ডেকে আনল আকাশ।
— 'এ তো দেখছি সারাতে গোটা একটা দিন লাগবে!'
— 'মানে? এই তো আসার সময় দিব্যি ঠিকঠাক ছিল, হঠাৎ দু-আড়াই ঘন্টার মধ্যে এমন কি হয়ে গেল?'
— 'বেশ কিছু কলকব্জা বিগড়ে গেছে দেখছি স্যার!'
— 'যাক বাবা, কি আশ্চর্য! তা এরকম হঠাৎ কেন হতে গেল বলতে পারো?' আকাশ অবাক গলায় প্রশ্ন করল।
— 'স্যার যন্ত্রপাতির ব্যাপার, কখন যে বিগড়োয় আগে থেকে কি বলা যায়! আপনি আজ রেখে যান, কাল এসে নিয়ে যাবেন এটা কেমন?'
— 'অগত্যা!'
আকাশ আর স্মৃতি কলেজ থেকে হেঁটে বেরিয়ে এল।
— 'এখন আমরা বাড়ি কিভাবে ফিরব বলো তো!'
— 'কিভাবে আবার! যেভাবে সবাই ফেরে, বাসে!'
— 'তুমি পাগল হয়ে গেছ স্মৃতি! আগেরবার সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে কি ক্রিটিক্যাল কন্ডিশন হয়েছিল তোমার, মনে নেই? না স্মৃতি, বাসে এইসময় যা বাদুড়ঝোলা ভিড় থাকে, একটা দুর্ঘটনা ঘটতে আর কতক্ষণ?'
আকাশ আর স্মৃতি কথা বলছিল নিজেদের মধ্যে, হঠাৎ একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল ওদের সামনে। আকাশ আর স্মৃতি উঠে বসল ট্যাক্সিতে, ড্রাইভারকে ওদের গন্তব্য জানিয়ে দিল।
— 'তা ম্যাডাম, কেমন হল প্রথম দিনের এক্সাম?'
— 'মনের মতোই হয়েছে, এবার দেখা যাক মার্কস কেমন আসে।'
— 'কেমন আবার আসবে? যেমন আগের বছর এসেছিল, দুর্দান্ত আসবে, আবারও সবার মুখে মুখে ঘুরবে, রেকর্ড মার্কস নিয়ে পাস করেছেন স্মৃতি ব্যানার্জী!'
— 'থাক থাক আকাশ, আগে রেজাল্ট আউট হোক তো, তারপর দেখা যাবে, এখন থেকেই অত ঢাক পেটাতে হবে না!'
— 'বাহ, ঢাক পেটাব না? আরে বাবা, তুমি এবারেও ফার্স্ট হবে, মিলিয়ে নিও। কার বৌ দেখতে হবে না?'
আকাশ আর স্মৃতি খোশগল্পে মগ্ন ছিল, হঠাৎ আকাশের খেয়াল হল গাড়িটার যে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথা সেদিকে না গিয়ে একটা নির্জন গলি দিয়ে চলছে।
— 'এ কি দাদা, এ কোন্ দিকে যাচ্ছেন? আপনি বোধহয় বুঝতে পারেননি আমাদের ডেস্টিনেশনটা।'
— 'পেরেছি দাদা, আসলে বড় রাস্তার দিকে বিশাল জ্যাম! আসলে সামনেই পুজো, বোঝেনই তো কলকাতার রাস্তায় এই সময় জ্যাম লেগে থাকে কেমন!'
— 'হ্যাঁ সে তো জানি, কিন্তু এই রাস্তাটাও তো চেনা লাগছে না একদমই!'
— 'চিন্তা করবেন না দাদা, এদিকে শর্টকাট হবে বলেই নিয়ে যাচ্ছি। একদম রাইট লোকেশনেই নিয়ে যাব আপনাদের।'
ক্রমশ বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামল। রাস্তাটা ক্রমশ সরু থেকে আরও সরু হতে লাগল, তবু বড় রাস্তার চিহ্নমাত্র পাওয়া গেল না। জনমানবহীন রাস্তার আশেপাশে ছিল গাছগাছালির ভিড়, আর ঝিঁঝি ডাকছিল থেকে থেকে।
— 'আকাশ!'
— 'উম!'
— 'আমার না কেমন ভয় ভয় করছে!' নিচু গলায় স্মৃতি বলল আকাশকে।
আকাশ স্মৃতিকে শক্ত করে জড়িয়ে রইল, বলল, 'আমি আছি তো স্মৃতি।'
— 'দাদা, আর কতক্ষণ লাগবে বলুন তো? এ কোন্ দিকশূন্যপুরে নিয়ে এলেন বলুন তো!'
— 'এই তো দাদা, এসে গেছি।'
গাড়ি থামিয়ে দিল লোকটা, তারপর গাড়ি থেকে নেমেই জোরে শিস দিল।
শিস দিতেই ঘটল এক ভয়ানক ঘটনা। এক বিশাল গুন্ডাবাহিনী এসে হাজির হল সেখানে। আকাশ আর স্মৃতি সিঁটিয়ে গেল ভয়ে।
গুন্ডাদের হেড অনিমেষ এগিয়ে এল, আর ওকে দেখেই আর এক দফা চমকানোর পালা আকাশের।
— 'অনিমেষ, তুই এখানে?'
— 'হ্যাঁ রে দাদাভাই, তোর জন্য বড্ড মন খারাপ করছিল রে, তাই আর না এসে পারলাম না!' ক্রূর হেসে বলল অনিমেষ।
অনিমেষ প্রমীলার ছোট বোন মোনালির একমাত্র ছেলে। বড়োলোকের অতিরিক্ত আদরে বিগড়ে যাওয়া বাঁদর ছেলে অনিমেষ। সারাদিন পার্টি, মদ, আর নতুন নতুন মেয়ে এসব ছাড়া আর কোনো কিছুরই কোনো গুরুত্ব নেই তার কাছে।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : অষ্টত্রিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ