Advertisement

কাহিনী (পঞ্চত্রিংশ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
পঞ্চত্রিংশ পর্ব



— 'শোনো হিয়া, এসব সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ারার খবর আবার রুমকিকে দিতে যেও না যেন! ওনার তো আবার ওসবে মন নেই, উলটে এসে বাগড়া দেবে হয়ত, যে শিউলিকেও সম্পত্তির একটা পার্ট দিতে হবে! কি বলব, রুমকি বিয়ের পর থেকে একটাদিনও এবাড়ির কাউকে ফোন করে না, এখানে আসেও না, আর কেউ যদি ফোন করে ওকে, সামান্য হুঁ হাঁ ছাড়া আর কিছুই বলে না! আর ওই হারামজাদা আকাশ, ও ও দেখবে হয়ত সম্পত্তির লোভে বৌয়ের আঁচল ধরে চলে আসবে! শেষে আমাদের এত পরিশ্রমই মাটি হবে!' কাকলি বলল।

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


— 'কি যে বলো না তুমি বড়মা! আমি কি তোমায় মেয়ের মতো ঘাসে মুখ দিয়ে চলি নাকি? হিয়া এত কাঁচা কাজ করে না বুঝলে!'

— 'একদম। রুমকির হয়ে সম্পত্তির ভাগটা আমিই নেব, আর তারপর কাহিনীর প্রাপ্য ভাগটা তুমি আমায় লিখে দেবে, যেমনটা কথা ছিল।'


ক্রূর হেসে সায় দিল হিয়া। মনে মনে সাজিয়ে নিল নকশাটা, যেটা এতদিন ধরে বুনে এসেছে ও।


দেখতে দেখতে এগিয়ে এল সেকেন্ড ইয়ারের ফাইনাল। গত একমাস ধরে স্মৃতি সবটুকু দিয়ে পড়াশুনা করেছে, আর সবসময় আকাশ বসে থেকেছে ওর পাশে। কত রাতে যে ও পড়তে পড়তে আকাশের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে, আর আকাশও ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে পরম যত্নে, তার ইয়ত্তা নেই।


এরমধ্যেই একদিন আকাশ আর স্বর্ণালী গেলেন রুমকির শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু গিয়ে দেখেন, রুমকি আর অভিজিৎ বাড়িতে নেই, অভিজিতের মা বাবা সমরেশবাবু আর তন্দ্রাদেবী বসতে বললেন আকাশ আর স্বর্ণালীকে।

— 'আমরা এখানে বসতে আসিনি আঙ্কেল, আন্টি, আমরা এসেছি রুমকিদির সাথে দেখা করতে। ডেকে দিন রুমকিদিকে।

— 'কিন্তু বাবা, তোর্সা আর অভিজিৎ তো বাড়িতে নেই, একটা পার্টিতে গেছে ওরা।'

— 'আচ্ছা তাই? কখন ফিরবে ওরা?'

— 'পার্টি কখন শেষ হবে, তার কি আর কোনো সীমা পরিসীমা আছে ম্যাডাম? হয়ত সারারাত আর ফিরবেই না, কাল সকালে ফিরবে।'

— 'আচ্ছা বেশ আন্টি, আমরা রইলাম এখানে। রুমকিদি ফেরা না পর্যন্ত আমরা এখানেই থাকব।'

— 'সে থাকো না বাবা, তোমাদের যতদিন খুশি এখানে থাকো না। তুমি তো শিউলির স্বামী, আর আপনি? শিউলির শাশুড়ি না?'

এই প্রশ্নটা আকাশের বুকে গিয়ে বিঁধল যেন। চুপ করে রইল ও।

— 'একদম ঠিক বুঝেছেন, তবে একটু কম। আমি শুধু স্মৃতির শাশুড়িই নই, মাও বটে, বুঝলেন?'

— 'আচ্ছা বেশ বেশ, ভালো তো, খুব ভালো। তা প্রথমবার বাড়িতে এলেন আপনারা, শুকনো মুখে থাকবেন নাকি? একটু চা মিষ্টি খান। বলি ও মেনকা, চা কর দেখি দুটো।'


আকাশ কিছু বলতে যাবে হঠাৎ সেখানে এসে হাজির অভিজিৎ। মদের নেশায় টলছে ও, দাঁড়াতেই পারছে না, আর ওর সাথে রয়েছে কয়েকটা মেয়ে। ওরাই ওকে কোনোরকমে নিয়ে এসেছে বাড়িতে।

— 'তা কাকে সোহাগ করে বসিয়ে মিষ্টি খাওয়াচ্ছ শুনি?' নেশাতুর গলায় বলল অভিজিৎ।

— 'সে কি আঙ্কেল, আপনারা বললেন যে রুমকিদি নাকি অভিজিৎদার সাথেই পার্টিতে গেছে? তা কই, এখানে তো দেখছি রুমকিদি নেই, তার বদলে নটীরা.....'

— 'এই এই এই!' অভিজিৎ তেড়ে এসে আকাশের কলারটা ধরল, 'তুই কে রে শালা এত বেকার বকছিস? আমি কাকে নিয়ে পার্টিতে যাব আর কাকে নিয়ে যাব না সেটা তুই ঠিক করবি নাকি?'

সমরেশ এগিয়ে এলেন ব্যস্তসমস্ত হয়ে, 'আহ্, অভিজিৎ কি করছ কি? ও শিউলির হাসব্যান্ড, আমাদের গেস্ট, গেস্টের সাথে এ কেমন ব্যবহার করছ তুমি?'

— 'ওহ্! শিউলি! মানে তোর্সাদের বাড়িতে কাজ করত যে রাস্তার নোংরা মেয়েটা? তোমায় তো দেখে ভদ্রঘরের ছেলেই মনে হচ্ছে, সত্যি মাইরি, তুমি বিয়ের জন্য আর মেয়ে পেলে না? শেষে একটা দু টাকার মাগী...'

— 'মুখ সামলে কথা বল্ জানোয়ার!' নিজের কলারটা ছাড়িয়েই আকাশ সজোরে চড় মারল অভিজিতের গালে, 'এতক্ষণ সবটা জেনেও চুপ করে আছি বলে কি ভেবেছিস মাথা কিনে নিয়েছিস? স্মৃতির নামে আর একটা বাজে কথা বললে মেরে হাড় গুঁড়ো করে দেব!'

— 'তবে রে শালা! দাঁড়া তোর ব্যবস্থা করছি আমি।'

অভিজিৎ নিজের ঘরে গেল, তারপর ঘর থেকে কয়েকটা প্যাকেট নিয়ে এল, এসেই গর্জাতে লাগল, 'এগুলো তোকে গিলিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দেব, আর পরেরদিনই খবরের কাগজে হেডলাইন হবে, কলেজের প্রফেসর মাতাল হয়ে...'

— 'একটু ভুল বলছেন অভিজিৎ সরকার! কাল হেডলাইনে আকাশবাবু আসবেন ঠিকই, কিন্তু মাতাল হয়ে রাস্তায় ঘুরেছেন বলে নয়, বরং একজন ড্রাগ পাচারকারীকে হাতে নাতে ধরিয়ে দিয়েছেন বলে।'

সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেন পুলিশ এসেছে। তাড়াতাড়ি ওরা এসেই অভিজিতের হাতে হাতকড়া পরাল। ও.সি. হেসে বললেন, 'বারবার প্রমাণের অভাবে শয়তানটা বেঁচে যায়, এবারে একেবারে হাতেনাতে ধরেছি ব্যাটাকে!'

— 'ওর ঘরটা খুঁজে দেখুন স্যার, আমি সিওর আরও প্যাকেট পাবেন।'

অভিজিৎকে গাড়িতে তোলা হল। আকাশ, স্বর্ণালীসহ কিছু পুলিশ দোতলায় অভিজিতের ঘরের দিকে গেলেন। সাথে এলেন সমরেশবাবু আর তন্দ্রাদেবী। আকাশের কথাটাই ফলে গেল পুরোপুরি। অভিজিতের ঘর থেকে উদ্ধার হল বাক্সভর্তি ড্রাগস আর হেরোইন।

— 'সবই তো হল, কিন্তু রুমকিদি? জানেন স্যার', আকাশ চিন্তিত গলায় বলল, 'আমি রুমকিদির হাতে গলায় কালসিটের দাগ দেখেছি, আমি সিওর নিশ্চয়ই ওই জানোয়ারটা রুমকিদির এই হাল করেছে স্যার! আমরা এসে থেকে রুমকিদিকে দেখতেই পাইনি জানেন!'

— 'আর এনারা বলছিলেন তখন রুমকি নাকি পার্টিতে গেছে অভিজিতের সাথে, কিন্তু যায় যে নি সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি!'

— 'ওহ আই সি! সমরেশ বাবু, আপনার ছেলেটি তো রত্ন! ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের কেসেও তো ভালোই ফাঁসবে দেখছি!' বাঁকা হেসে বললেন ও.সি., 'তা এবার ভালোয় ভালোয় বলুন তো, পুত্রবধূকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন? যদি না বলেন, আপনাদেরও কোমরে দড়ি পরিয়ে লকাপে নিয়ে যাব টানতে টানতে বলে দিলাম!'

— 'হ্যাঁ স্যার, এনারাও কম যান না! অন্যায় সহ্য করাটাও সমান অপরাধ!'


হঠাৎই চিলেকোঠার ঘরের দিক থেকে একটা গোঙানির শব্দ ভেসে এল৷ সবাই পড়ি কি মরি ছুটে গেলেন সেদিকে।


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ষটত্রিংশ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ