কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চতুর্ত্রিংশ পর্ব
— 'থাক আর কিছু বলতে হবে না। তাহলে শুনুন, ওই কাহিনী চৌধুরীর সম্পর্কে আমি এমন ইনফরমেশন দেব, আপনাদের চ্যানেলের টি.আর.পি হুড়হুড়িয়ে বাড়বে! শুনবেন সবটা?'
— 'হ্যাঁ স্যার বলুন না! কাহিনী চৌধুরীরও কি কেচ্ছা আছে কোনো?' সকলের চোখ চকচক করতে লাগল।
— 'কেচ্ছা বলে কেচ্ছা? একদম রাম কেচ্ছা যাকে বলে! বাট আমি যে আপনাদের এত মূল্যবান একটা খবর দেব, পরিণামে তো আমারও কিছু চাই, নাকি!'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ স্যার, আপনার কত টাকা চাই?'
— 'টাকা নয়, অন্য একটা জিনিস চাই।'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
বেশ কিছুক্ষণ আলোচনার পর আকাশ হাসিমুখে বেরিয়ে এল অফিস থেকে, মনে মনে বলল, 'এবার তোমার চোখের জল ফেলার দিন শেষ স্মৃতি, আর অন্য একজনের কষ্টের দিন শুরু!'
পরেরদিন সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেল আকাশের। ও শুধু অপেক্ষা করে আছে নিউজপেপার আসবে কখন। নিউজপেপার আসতেই ও হেঁকে ডেকে সবাইকে জাগিয়ে তুলল।
— 'কি ব্যাপার আকাশ? সকাল সকাল ভীষণ খুশি দেখছি!' স্বর্ণালী হেসে বললেন।
— 'হাসব না মামণি? দেখো দেখো, কাগজের ফ্রন্ট পেজে কি লিখেছে দেখো! স্মৃতি, তুমিও এসো, দেখো।'
স্বর্ণালী আর স্মৃতি দেখল কাগজের প্রথম পাতাটা। প্রথম পাতায় হিয়ার বড়ো করে ছবি ছাপানো, আর ছবির পাশে লেখা আছে সেই বাঁকুড়ায় স্মৃতিকে পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়া থেকে শুরু করে স্মৃতি আর আকাশের সম্পর্ক নিয়ে নিউজচ্যানেলের অফিসে ফোন করে মিথ্যে গল্প বলা পর্যন্ত সবটা। আর সেই সাথে গতকাল আকাশ আর স্মৃতির সম্পর্কে ছাপানো খবরটা যে সম্পূর্ণ ভুয়ো সেটাও লেখা হয়েছে আর ক্ষমাও চাওয়া হয়েছে খবরের কাগজের পক্ষ থেকে।
— 'স্মৃতি, আর কান্নাকাটি নয় কিন্তু, একদম নয়।' আকাশ ওর হাতদুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে বলল, 'এবার দেখো, ক্লাস থেকে কাকে বেরিয়ে যেতে হয়!'
সেদিন আকাশ কলেজ গিয়েই দেখে, বন্দিতা ম্যাম হিয়াকে ক্লাসে দাঁড় করিয়ে ভীষণ রকম অপমান করছেন।
— 'শিউলি খারাপ মেয়ে না ভালো আমি জানি না, কিন্তু তুমি কি কাহিনী? ওহ সরি, তুমি আদৌ কাহিনী না হিয়া তাও আমরা জানি না, তুমি তো ক্রিমিনাল! আর তুমিই কাগজের অফিসে ফোন করে এসব ছাপাতে বলেছিলে? কলেজের বদনাম তো শিউলির চেয়ে বেশি তুমিই করলে! শিউলিকে তবুও টি.সি. দেওয়া হয়নি, শুধু ক্লাসে আসতে বারণ করা হয়েছে, কিন্তু তোমায় তো আর এক মিনিটও রাখা যাবে না এখানে, তুমি তো দিনেদুপুরে মানুষ খুন করবে দেখছি! অনিকেতদা তোমার টি.সি. রেডি করে রেখেছেন, যাও গিয়ে কালেক্ট করে নাও, যাও বলছি!'
হিয়া বাইরে বেরিয়েই দেখল, আকাশ দাঁড়িয়ে আছে হাসি মুখে।
— 'কি হিয়া ম্যাডাম, কেমন লাগছে? স্মৃতিকে তুমি ক্লাস থেকে বের করেছ, আর আমি তোমায় কলেজ থেকেই বের করে দিলাম। বেস্ট অফ লাক হিয়া!' বাঁকা হেসে চলে গেল আকাশ।
হিয়া কেঁদে পড়ল অনিকেতের পায়ে।
— 'স্যার সামনেই সেকেন্ড ইয়ারের ফাইনাল, এই সময় অন্য কোন্ কলেজ আমায় ভর্তি নেবে স্যার? প্লিজ স্যার, অন্তত একটা মাস আমায় কলেজে রাখুন! আমি ক্লাসে আসব না স্যার, শুধু পরীক্ষার দিনগুলোই আসব স্যার!'
অনেক বোঝানোর পর অনিকেত রাজি হলেন, বললেন, 'বেশ, তবে ওই পরীক্ষা পর্যন্তই কিন্তু, তারপরেই অন্য কলেজ দেখে নেবে।'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ স্যার অবশ্যই, অনেক ধন্যবাদ স্যার!'
হিয়া কাঁদতে কাঁদতে চৌধুরীবাড়ি চলে গেল।
— 'কিন্তু আকাশ, আমি যে কলেজ যাব এটা হিয়া জানল কিভাবে? আমরা তো রুমকিদি ছাড়া আর কাউকেই বলিনি, তাহলে কি রুমকিদিই....'
— 'না স্মৃতি, রুমকিদি নয়, অন্য একজন জানিয়েছে, তার হাত থেকে খুব শিগগিরই রুমকিদিকে বাঁচাতে হবে আমাদের।'
— 'বুঝতে পেরেছি আকাশ।'
সকালটা স্মৃতি আর আকাশের ভালো কাটলেও সন্ধ্যেবেলায় ঘটল বিপত্তি। সায়নীর ফোন এল আকাশের ফোনে।
— 'আমার মেয়ে কি ক্ষতি করেছিল তোমার যে তার এত বড় ক্ষতি করে দিলে তুমি? ক্ষমতার অপব্যবহারটা দেখছি ভালোই করতে পারো!'
— 'আপনার ভুল হচ্ছে আন্টি, আপনার আসল মেয়ে, মানে স্মৃতি, সে কখনো আমার কোনো ক্ষতি করেনি, তবে হ্যাঁ আমার জন্য ওর জীবনে অনেক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, এটা আপনি ভুল বলেন নি।'
— 'আকাশ কিসব বলে যাচ্ছ তখন থেকে তুমি? স্মৃতি না শিউলি যাকে তুমি বিয়ে করেছ সে কেন আমার মেয়ে হতে যাবে? আমার মেয়ে কাহিনী, তাকে আজ টি.সি. দেওয়া হয়েছে, অনেক কষ্টে অনিকেত স্যারকে রাজি করানো হয়েছে, টি.সি.টা পরীক্ষার পর দিতে রাজি হয়েছেন উনি। আর খবরের কাগজের অফিসে খবরটা তো তুমিই দিয়েছ, না? ওই স্মৃতির কথাই আজ তোমার কাছে বড়ো হল? আমাদের বাড়ির সম্মানের কথাটা একবারের জন্যও ভাবলে না তুমি? সত্যি, এখন মনে হয় ভাগ্যিস আমার জামাই হওনি তুমি, ঈশ্বর রক্ষা করেছেন!'
— 'প্লিজ আন্টি, আমার আর মুখ খোলাবেন না তো! ঝড়বৃষ্টির রাতে যখন অন্তঃসত্ত্বা একটা মেয়েকে বের করে দিতে গিয়েছিলেন, যে সবে সেইদিনই হসপিটাল থেকে ছাড়া পেয়েছে, সেদিন একবারও ভেবেছিলেন যে কোথায় যাবে ও? আমি যদি সঠিক সময়ে না আসতাম জানি না আর ওকে ফিরে পেতাম কিনা! আর শুনুন, হিয়ার হয়ে গলা ফাটানোর আগে জেনে নিন যে সে কি কান্ড ঘটিয়েছে! ওর জন্য স্মৃতিকে ক্লাস থেকে অপমানিত হয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে, কেন? কি দোষ ছিল ওর? আমায় ভালোবেসেছে ও এটাই ওর দোষ ছিল?'
— 'শোনো আকাশ, তোমার এসব অবান্তর কথা শুনতে আমার....'
— 'আমারও আন্টি, আমারও আপনার এসব মিনিংলেস কথা শোনার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, রাখছি আমি। আর শুনুন, আমায় ফোন করেছেন বেশ করেছেন, কিন্তু ভুলেও স্মৃতিকে ফোন করে আর কাঁদাবেন না ওকে, তাহলে কিন্তু ফল ভালো হবে না!'
আকাশ ফোনটা রেখে দিল।
অন্যদিকে হিয়াকে এভাবে কলেজ থেকে অপমানিত হয়ে ফিরে আসার দরুন চৌধুরীবাড়ির সকলের চোখে আরও বেশি স্নেহের পাত্রী হয়ে উঠেছে ও, আর ত্রিদিববাবু ঠিক করেছেন, কাহিনীর কুড়ি বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত আর অপেক্ষা করবেন না তিনি, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই যাবতীয় সম্পত্তি হস্তান্তর করবেন তিনি কাহিনী আর রুমকির হাতে।

0 মন্তব্যসমূহ