কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
সপ্তচত্বারিংশ পর্ব
একটু থেমে সোনালি বললেন, 'আমি প্রশ্ন করেছিলাম, 'ও বোঝো? তা কি বোঝো শুনি? প্রকাশ বাঁকা হেসে জবাব দিয়েছিল, 'স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা, বাইরের পুরুষমানুষদের সাথে ঢলাঢলি করা!' কি বলব স্মৃতি, ওর কথা শুনে ঘেন্নায় গা রি রি করছিল আমার, বলেছিলাম, 'ও, একজন মেয়ের স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাওয়া মানেই নোংরামি, আর তোমার? তুমিও তো বাইরে চাকরি করতে যাও, সেখানেও তো অনেক মেয়ে থাকে, কই আমার তো কখনো মনে হয়নি তুমি মেয়েদের সাথে ঢলাঢলি করতে যাও?' এই কথা শুনে প্রকাশ আমার গালে এক চড় মেরেছিল এমন যে গালে পাঁচ আঙুলের দাগ পড়ে গিয়েছিল। আমার শ্বশুর শাশুড়িও যথারীতি ছেলেকেই সাপোর্ট করেছিলেন, বলেছিলেন, 'আমাদের সংসারে কি আর তোমার বাপের বাড়ির মতো অত অভাব অনটন আছে নাকি যে তোমায় চাকরি করতে যেতে হবে? ঘরের বৌ, ঘরে থাকো, মাঝে মাঝে ইচ্ছে হলে স্বামীর সাথে বেড়াতে যাও, শপিংয়ে যাও, শুধুমুদু পড়তে যাওয়ার কিসের দরকার?' আমি হাসতাম, আসল কারণটা আমার অজানা ছিল না। আমি পড়াশোনা করে যদি প্রকাশকে টপকে যাই, তাহলে যে ওর মেল ইগো হার্ট হবে, আর সেটা ওর পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব। দিন দিন ব্যানার্জীবাড়িটা আমার কাছে শরশয্যা হয়ে উঠছিল, এদিকে বাড়িতেও ফোন করে কিচ্ছুটি জানাতে পারিনি, কারণ বাপের বাড়িতে ফিরে আর মানুষগুলোর ওপর চাপ বাড়াতে চাইনি আমি। কিন্তু মনের মধ্যে জেদটা দিনে দিনে বাড়তে লাগল আমার, হাজার কটু কথা শুনেও ইউনিভার্সিটি যাওয়া বন্ধ করিনি, বন্ধ করিনি পড়াশুনা করাও। এরই মাঝে এক ক্লাসমেটের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে আমার, ছেলেটির নাম কি জানিস?'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'সঞ্জয় ঘোষাল।'
নামটা শুনেই যেন আকাশ থেকে পড়ল স্মৃতি, 'উনিই তো আমাদের বিয়ের একজন উইটনেস ছিলেন না?'
— 'হ্যাঁ রে স্মৃতি। সঞ্জয় আমাকে আজও আগের মতোই ভালোবাসে, ও আমায় ডাকত স্বর্ণ বলে,আজও ডাকে।'
স্মৃতি বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু শুনে যেতে থাকে। সোনালি বলে চলেন, 'সবাই যখন জানতে পেরেছিল আমাদের সম্পর্কটা, সবাই বলেছিল আমি চরিত্রহীন নষ্ট মেয়ে, যে বিবাহিত হয়েও পরকীয়ায় লিপ্ত হয়, এমনকি আমার মা বাবাও। কিন্তু তুই বল্ তো স্মৃতি, দিনের পর দিন শ্বশুরবাড়িতে অসম্মানিত, অত্যাচারিত যে মানুষ, যার বাপেরবাড়ি যাওয়ার রাস্তা পর্যন্ত বন্ধ, সে যদি জীবনে এমন কোনো মানুষকে পায় যে তাকে বোঝে, তার কথাগুলো শোনে, তার কষ্টে সমব্যথী হয়, তবুও সেই মানুষটিকে ভালোবাসবে না সে?'
— 'অবশ্যই বাসবে মামণি, ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার সব মানুষেরই আছে, তাই তুমি কোনো ভুল করোনি সঞ্জয় আঙ্কেলকে ভালোবেসে, বেশ করেছ তুমি! আর রইল সমাজের কথা, সমাজ একসময় আমাকে কম অপমান করেছে আন্টি? কম কাদা ছুড়েছে? কিন্তু আমি ওসব পাত্তা দিইনি কখনোই।'
স্মৃতির মাথায় হাত বুলিয়ে সোনালি বললেন, 'লক্ষ্মী মেয়ে আমার।'
— 'তারপর কি হল মামণি?'
— 'দেখতে দেখতে মাস্টার্সের ফাইনাল হয়ে গেল, হাজার লড়াই করে আমি পাশ করলাম মাস্টার্স। কিন্তু রেজাল্ট বেরোনোর দিন বাড়ি এসেই হঠাৎ মাথাটা কেমন ঘুরে গেল আমার। জানা গেল, মা হতে চলেছি আমি। খবরটা শুনে আমার মা, বাবা, শ্বশুর শাশুড়ি সকলেই ভীষণ খুশি হলেন, হল না শুধু প্রকাশ। ওর মনে একটা সন্দেহ ছিল, আর সেটা অমূলক যে নয় সেটা আমিও জানতাম। প্রকাশের সাথে আমার সম্পর্ক গত ছ-সাত মাস ধরেই আর পাঁচটা স্বামী স্ত্রীর মতো ছিল না, ডিসট্যান্স মেইনটেইন করতাম আমরা। প্রকাশ আমায় ঘরে নিয়ে এসেই বাঁকা হাসল, 'এই বাচ্চাটার বাবা কে, তা আমি জানি না ভেবেছ?' আমি প্রমাদ গুনলাম, প্রশ্ন করলাম, 'মানে?' প্রকাশ এবার আক্রোশে আমার গালদুটো জোরে টিপে ধরল, 'আবার মানে জিজ্ঞেস করছ? আমার কানে সব খবরই আসে বুঝেছ? ওই সঞ্জীব না সঞ্জয় কি নাম, তার সাথে আজকাল প্রায়ই তোমায় রেস্টুরেন্টে, গঙ্গার পারে দেখা যায়, এগুলো আমি জানি না ভেবেছ?' আমি হাসলাম, 'জানোই যখন, আর প্রশ্ন করছ কেন?'
এরপর আরও সিওর হওয়ার জন্য ডি.এন.এ টেস্টও করা হল, আর ওখানেই প্রমাণিত হল, প্রকাশ নয়, আমার হবু সন্তানের বাবা সঞ্জয়।'
— 'তার মানে সঞ্জয় আঙ্কেলই আকাশের বাবা?'
— 'হ্যাঁ রে মা। কিন্তু তোর ক্ষেত্রে যেমন আকাশ তোর পাশে ছিল প্রতিটা মুহূর্তে, আমার ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি,অবশ্য তার জন্য আমি সঞ্জয়কে দোষ দিইনা, ওর সত্যিই কোনো উপায় ছিল না, আমিই বারণ করেছিলাম ওকে আমার পাশে দাঁড়াতে।'
— 'তুমি বারণ করেছিলে?'
— 'তাছাড়া যে আর উপায় ছিল না স্মৃতি! সঞ্জয়ও তখন সবে মাস্টার্স পাস করেছে, চাকরির চেষ্টা করছে, মধ্যবিত্ত বাড়িতে বিধবা মা আর এক বোন আছে, সংসারের হালটা যে ওকেই ধরতে হত। আর তাছাড়া...'
— 'তাছাড়া?'
— 'আমি প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ হয়ে গেল আমার পুরোপুরি। শ্বশুর শাশুড়ি কিছুই জানতেন না, আসল ব্যাপারটা অবশ্য কেউই জানত না আমি, প্রকাশ আর সঞ্জয় ছাড়া। প্রকাশ আমায় বলল, মানে শর্ত রাখল, বাচ্চা জন্ম দেওয়ার পরেই আমাকে চলে যেতে হবে সংসার থেকে, ও ডিভোর্স দেবে আমাকে, আর যদি না যাই, আমার আর সঞ্জয়ের নামে এত কুৎসা রটাবে যে আমরা কোথাও চাকরি পাব না, এমনকি আমার সন্তানের জীবনটাও নরক করে তুলবে ও।'
— 'প্রকাশ ব্যানার্জী এতটা নিচ?'
— 'হ্যাঁ রে মা, ও যে কি লোক তা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে? আমি প্রতিবাদ জানাতেই ও বলল, 'যাও, থানায় যাও, ওখানেও আমার বন্ধু আছে, কিচ্ছু সুবিধা পাবে না, বাচ্চার কাস্টডি তো আমিই পাব, মাঝখান থেকে তোমার আর সঞ্জয়ের নাক কাটা যাবে সবার সামনে।' আমার আর কিচ্ছুটি করার ছিল না রে স্মৃতি, সত্যিটাও যে বাপের বাড়িতে জানাব সেই ক্ষমতাও আমার ছিল না, জানালে যে আমার গায়েই কাদা লাগত, প্রকাশের দোষ কেউ দেখত না! আর এই সুযোগটাই নিয়েছিল ও, আকাশকে কৌশলে আমার কোল থেকে ছিনিয়ে নিল বরাবরের মতো।'
— 'কিন্তু মামণি, প্রকাশবাবু কখনও কাউকে জানালেন না কেন, যে আকাশ ওঁর সন্তান নয়?'
— 'কেন আবার? মেল ইগো, আর সেই সাথে ব্যানার্জীবাড়ির সম্মান! দেখলি না, সম্মানহানির ভয়ে ও নিজের প্রিয় কচি বৌটাকে পর্যন্ত ডিভোর্স দিয়ে দিল?'
— 'তারপর কি হল মামণি?'
— 'তারপর আমার কোল আলো করে আকাশ এল, ওর মায়াজড়ানো চোখদুটো আর হাসিটা আমার মনের সব শূন্যতা দূর করে দিত, কিন্তু সেই সুখটুকুও আমি হারালাম। একদিন রাতের অন্ধকারে প্রকাশ আমার হাত ধরে টেনে বাড়ির বাইরে বের করে দিল, বলল, 'যে চুলোয় খুশি যাও, শুধু ভুলেও আকাশের দিকে হাত বাড়িও না, তাহলেই সব যাবে!'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : অষ্টচত্বারিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ