কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ষটচত্বারিংশ পর্ব
কেটে গেল বেশ কয়েকমাস। রুমকি আজ সৌনকের স্ত্রী। চৌধুরীবাড়ির মানুষেরাও সসম্মানে ফিরে গেলেন নিজেদের বাড়িতে।
— 'স্মৃতি, আজ রেজাল্ট। টেনশন হচ্ছে নাকি?' আকাশ একটু হেসে প্রশ্ন করল।
— 'ওই আর কি, একটু একটু।'
— 'ধুস, টেনশন কিসের আবার? তুইই তো ফার্স্ট হবি!' স্বর্ণালী স্মৃতির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন।
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
স্বর্ণালীর কথাটাই ফলে গেল। স্মৃতি প্রথম হল আবার, তবে হিয়ার নামটা প্রথম দশের মধ্যেও ছিল না। কলেজের স্টুডেন্ট থেকে টিচার, সকলেই জেনে গেছে স্মৃতি আর হিয়ার আসল পরিচয়, তাই সবার আচরণেই পরিবর্তন এসেছে। স্মৃতি স্বাভাবিকভাবেই কলেজ আসছে, ওকে আর অপমান করছে না কেউই।
সেদিন স্মৃতি কলেজ থেকে ফেরার পর আকাশ স্মৃতির গলায় গোল্ড মেডেল পরিয়ে দিল।
— 'এটা আমি সেকেন্ড ইয়ারে পেয়েছিলাম জানো, কিন্তু এটা আমার চেয়ে তুমিই বেশি ডিসার্ভ করো। যেভাবে হাজার প্রতিকূলতা পেরিয়েও তুমি প্রথম স্থানটা বজায় রাখলে, তাতে....'
— 'ঠিক আছে স্যার, হয়েছে হয়েছে! বেশি প্রশংসা করে আমার স্বভাব আর খারাপ করে দিতে হবে না!'
আকাশ হাসিমুখে স্মৃতিকে জড়িয়ে ধরল।
কেটে গেল আরও কিছু সময়। একদিন স্মৃতি আর আকাশ কলেজ থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসেছে, হঠাৎ স্মৃতির প্রসব যন্ত্রণা শুরু হল। আকাশ আর স্বর্ণালী তড়িঘড়ি ওকে নিয়ে চললেন হসপিটালে। গাড়িতে স্মৃতি চিৎকার করছিল ভীষণ, ওর মনে হচ্ছিল পেটটা বুঝি ছিড়ে যাবে। আকাশের জামাটা চেপে ধরল ও যন্ত্রণায়, আকাশ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, 'হসপিটাল প্রায় এসে গেছে স্মৃতি, আর বেশিক্ষণ তোমায় কষ্ট সহ্য করতে হবে না।'
স্মৃতিকে নিয়ে যাওয়া হল হসপিটালে। বাইরে চিন্তিতমুখে অপেক্ষারত রইলেন আকাশ আর স্বর্ণালী। ইতিমধ্যেই এসে গেছেন চৌধুরীবাড়ির সকলে, সাথে সৌনক আর রুমকিও।
একটু পরেই হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার, 'কনগ্র্যাচুলেশনস আকাশ ব্যানার্জী, আপনি এখন এক ফুটফুটে কন্যাসন্তানের বাবা।'
আকাশের চোখ দিয়ে ঝরে পড়ল আনন্দাশ্রু।
— 'আর স্মৃতি?'
— 'আপনার স্ত্রীও একদম সুস্থ আছেন, যান, দেখে আসুন।'
আকাশ ছুটল কেবিনে, ও ঢুকেই দেখল, স্মৃতি শুয়ে আছে হাসিমুখে, আর পাশে একটা দোলনায় শুয়ে আছে ওদের সদ্যজাত কন্যা। আকাশ স্মৃতির কপালে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কেমন আছ?'
— 'একদম ঠিক আছি আমি।'
এরপর নার্স এসে শিশুকন্যাকে তুলে দিল আকাশের কোলে। আকাশ ওকে কোলে নিয়ে বলল, 'তোমার কি নাম হবে জানো? তোমার নাম হবে মেঘা, যে সবসময় আকাশের কোলজুড়ে খেলবে। আর শোনো মেঘা, তোমায় পৃথিবীতে আনতে মাকে অনেক কষ্ট, অপমান, বাধা সহ্য করতে হয়েছে, তাই মাকে সবসময় ভালোবেসো, কেমন?'
স্মৃতির গোটা মুখ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল খুশি।
আকাশ বলল, 'তোমার মনে আছে স্মৃতি, একদিন লাইব্রেরিতে তুমি বলেছিলে, মা আর সন্তানের মধ্যে যে নাড়ির টান থাকে, সেটা একদিন আমি বিশ্বাস করবই। সত্যি স্মৃতি, তোমার কথাটাই সত্যি প্রমাণিত হল আজ, আজ সত্যিই তোমায় আর মেঘাকে দেখে এই টানটা অনুভব করতে পারছি।'
সকলে এসে দেখলেন কন্যাশিশুকে, আশীর্বাদও করলেন। এরপর সবাই চলে যাওয়ার পর আকাশও চলে গেল, যাওয়ার আগে বলে গেল, 'আমি কাল সকালে আবার আসব, কেমন?'
— 'দেরি করবে না কিন্তু, আমি অপেক্ষায় থাকব।'
— 'একদম না! তোমাদের ছেড়ে বেশিক্ষণ কি থাকতে আমারও ভালো লাগবে বলো?'
আকাশ চলে যাওয়ার পরেই স্বর্ণালী এলেন, কন্যাশিশুকে বুকে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি।
— 'কাঁদছ কেন মামণি? কি হয়েছে?'
— 'জানিস স্মৃতি, তোর মেয়ের চোখদুটো হুবহু আকাশের মতো হয়েছে, এমনকি হাসিটা পর্যন্ত। আকাশ যখন এরকম ছোট্টটি ছিল, ঠিক এরকমই জুলজুল করে তাকাত আমার দিকে, ঠিক এভাবেই হাসত, তারপর আমার ঘুমপাড়ানি গান শুনে ঘুমিয়ে পড়ত আমার কোলে। তোর মেয়েকে কোলে নিয়ে আমার সেইদিনগুলোর কথা বড্ড মনে পড়ছে রে মা!'
— 'মামণি!'
— 'স্মৃতি, আমার আসল নাম স্বর্ণালী নয় রে, আমি সোনালি, আকাশের জন্মদাত্রী মা!'
স্মৃতি বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু শুনতে থাকে। সোনালি বলতে থাকেন, 'আসল নামটা বললে আকাশকে কি আর এতদিন আমার কাছে রাখতে পারতাম বল্? জানিস স্মৃতি, আমার জীবনের গল্পটাও অনেকটা তোর মতো, তবে হুবহু নয়। আমি তখন কলেজ পাস করেছি, মাস্টার্স করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মা বাবা রাজি হয়নি, ওরা চেয়েছিল, আমি বিয়ে করি৷ অবশ্য ওদেরও বিশেষ দোষ দিতে পারি না আমি, কারণ আমার পরে দুই ভাই বোন ছিল আমার, আমি সকলের বড়ো, আর সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, তাই আমার পড়াশুনার খাতে খরচ করার সাধ্য আর ছিল না মানুষদুটোর, বলেছিল, 'বিয়ের পরে পড়বি, কত মেয়েই তো বিয়ের পর পড়াশুনা করে!' আমিও আর না বলতে পারিনি। আমার বিয়ে ঠিক করা হল প্রকাশ ব্যানার্জীর সাথে, ও তখন একটা কলেজের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, যদিও পরে অবশ্য কলেজ ছেড়ে এক নামী ইউনিভার্সিটি জয়েন করে ও, তবে সেসব অনেক পরের কথা, আকাশের তখন প্রায় ছ-সাত বছর বয়স। যাই হোক, আমি শর্ত রেখেছিলাম, বিয়ের পরেও পড়াশুনা করব আর চাকরিও করব। ওরা তখন দিব্যি হাসিমুখে মত দিয়েছিল, আর আমিও খুশিমনে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলাম। বিয়ের পর মাস তিন চার ভালোই ছিলাম জানিস, মাস্টার্সে ভর্তিও হয়েছিলাম, একেবারে স্বপ্নের মতো কাটছিল দিনগুলো, কিন্তু সমস্যা হল তারপরেই। ওই যে কথায় আছে, মুখোশ যতই নিখুঁত হোক, একদিন না একদিন তা খসে পড়বেই, প্রকাশের ক্ষেত্রেও তাই হল। ও নিজেকে যতই আধুনিকমনস্ক দেখাতে চাক না কেন, যত দিন গড়াতে লাগল, ততই ওর মনের ভেতরের অন্ধকারটা বেরিয়ে আসতে লাগল কদর্যভাবে।'
স্মৃতি নীরবে শুধু শুনতে থাকে। সোনালি বলে চলেন, 'ও একেবারেই চাইত না যে ঘরের বৌ পড়াশুনা করতে যাক পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে, তাই মাঝে মাঝেই বলত, 'কি লাভ মাস্টার্স করে? আমি তো চাকরি করি, যা টাকাপয়সা লাগবে আমায় বোলো, আমি দিয়ে দেব! আমিও ছাড়ার পাত্রী নই, প্রতিবাদ করেছিলাম, 'টাকার ব্যাপার নয় প্রকাশ, আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই, স্বাধীন হতে চাই আমি।' প্রকাশ মুখ বেঁকিয়ে বলত, 'থাক থাক হয়েছে, আর শাক দিয়ে মাছ ঢেকো না তো! তোমাদের মত পুওর ফ্যামিলির মেয়েকে যে আমি বিয়ে করেছি এই ঢের! আর তুমি তো আমায় বিয়ে করেছ টাকার জন্যই, আর এখন বলছ টাকা নয়, স্বাধীনতা চাই! ওই স্বাধীনতার মানে কি, আমি বুঝিনা ভেবেছ?'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : সপ্তচত্বারিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ