কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
পঞ্চচত্বারিংশ পর্ব
একটু থেমে হরিশচন্দ্র বলতে শুরু করলেন, 'অদ্ভুতভাবে হিয়াকে সেদিন কোত্থাও খুঁজে পেলাম না আমি। আমি নিশ্চিত, উমার মৃত্যুর জন্যও হিয়াই দায়ী, ও হয়ত হিয়াকে আটকাতে গিয়েছিল, আর হিয়া ওকে ঠেলে দিয়েছিল! হিয়াকে তারপর কত খুঁজেছি আমি, কত লোকে কত কথা বলল, কেউ বলল, দেখুন গিয়ে কার না কার সাথে পালিয়ে গেছে, এরপর গলায় মালা আর সিঁথিতে সিঁদুর পরে ফিরবে! আজ মনে হচ্ছে যদি সত্যি সেটাই হত, বড় ভালো হত, কিন্তু ও তো গিয়েছিল নিজের জীবন গোছাতে নয়, অন্য একজনের জীবন শেষ করে দিতে। কিন্তু ওকে কিছুতেই বোঝাতে পারিনি, অন্যের ক্ষতি করে কখনো ভালো থাকা যায় না, আর তার ফলস্বরূপ আজ!'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'দাদু', স্মৃতি বলল, 'কিন্তু শেষ পর্যন্ত হিয়ার খোঁজ আপনি পেলেন কিভাবে?'
— 'ওই যে, আকাশ ব্যানার্জী কাগজে বিস্তারিত লিখেছিল সবটা, সাথে হিয়ার ছবিটাও ছিল। আমি সেদিনই রওনা দিই কাগজের অফিসে, হিয়ার নম্বরটাও আমি অফিস থেকেই পাই। কিন্তু ওকে ফোন করতেই ও হুমকি দেয়, আমি যদি কাউকে কিছু বলি, তাহলে নাকি ও শুধু আমাকেই নয়, সাথে কাহিনীকেও মেরে ফেলবে, ক্ষতি করবে চৌধুরী পরিবারেরও। বাধ্য হয়েই আমি চুপ করে ছিলাম, তবে চেষ্টা চালিয়ে গেছি যাতে সবাইকে ওর কবল থেকে বের করতে পারি। শেষ পর্যন্ত আমি বীণাপানির সাথে যোগাযোগ করি, বীণাপানিও খবরটা পড়ে যোগাযোগ করে কাহিনী চৌধুরীর সাথে, কিন্তু কাহিনীই...'
— 'হ্যাঁ দাদু', স্মৃতি বলল, 'আমি নিজেকে চৌধুরীবাড়ির মেয়ে হিসেবে প্রমাণ করতে চাইনি, চেয়েছিলাম বাড়ির মানুষরাই আমায় চিনে নিক, তাই বীণামাসিকে বারণ করেছিলাম কাউকে কিছু জানাতে, কিন্তু তখন আমি বুঝিনি যে হিয়া এভাবে সবাইকে বের করে দেবে! জানলে আমি নিজের সিদ্ধান্ত বদলাতাম।'
— 'দাঁড়ান কাহিনী ম্যাডাম, এখনই ব্যস্ত হবেন না, এখনও তো দুজন মাস্টারমাইন্ডকেই অ্যারেস্ট করে আনা বাকি!'
— 'আপনি কাদের কথা বলছেন স্যার?'
— 'আমি ফোর্স পাঠিয়েছি ম্যাডাম, এক্ষুণি ওদের নিয়ে আসা হবে, তখনই দেখতে পাবেন।'
একটু পরেই নিয়ে আসা হল ওদের, ওদের দেখে স্মৃতি আর আকাশ তো অবাক হলই, সাথে অবাক হল সৌনকও। রুমকি আর কাকলির হাতে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে, নিয়ে এসেছে কিছু মহিলা কনস্টেবল।
— 'সৌনক, তুমি এখানে?'
— 'আমারও তো একই প্রশ্ন, তোর্সা চৌধুরী, তুমি এখানে?'
— 'মানে? স্যার, রুমকিদি, আপনারা একে অপরকে চেনেন?'
— 'ও আমার ক্লাসমেট ছিল রে কাহিনী।'
— 'হুম ম্যাডাম, কখনো ভাবিনি ওর সাথে এভাবে দেখা হবে কখনো।'
— 'যে যেমন কাজ করবে তার পরিণতি তো তেমনই হবে সৌনক, এতে আর অবাক হওয়ার কি আছে?' শ্লেষের হাসি হাসল রুমকি।
— 'ওদের তাহলে নিয়ে যাই স্যার?'
সৌনক একটা ঘোরের মধ্যে ছিল, কলেজজীবনের কথা মনে পড়ছিল ওর। কোনোরকমে ঘোর কাটতেই ও জবাব দিল, 'হুম।'
রুমকি আর কাকলিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, কিন্তু স্মৃতি আটকাল।
— 'ওদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই স্যার, ছেড়ে দিন ওদের।'
— 'তা হয়না কাহিনী। অন্যায়ের শাস্তি সবাইকেই পেতে হয় যে!' কাকলি বলল, সায় দিল রুমকিও।
— 'হ্যাঁ স্মৃতি ম্যাডাম, হিয়ার বয়ানে যে ওনাদের কথা আছে। ওনাদের কিভাবে ছেড়ে দিই বলুন?'
— 'স্যার, একবার দিপুর মোবাইলটা দেবেন?'
— 'সিওর।'
দিপুর মোবাইলটা নিয়েই আকাশ রেকর্ডিংটা ডিলিট করে দিল।
— 'এ কি করলেন আকাশবাবু?'
— 'আর তো কোনো প্রমাণ নেই স্যার রুমকিদিদের বিরুদ্ধে, আমাদেরও আর অভিযোগ নেই কোনো। এখন তাহলে আপনি ওদের ছেড়ে দিতে বাধ্য কিন্তু স্যার।'
— 'একদম স্যার।' স্মৃতি সায় দিল আকাশের কথায়।
— 'ব্যস, তাহলে আর কি! এই ছেড়ে দাও ওদের!'
হাসল সৌনক। রুমকি আর তার মা মুক্ত হওয়ায় ওর মনেও খুশির জোয়ার এল কি?
সবাই চলে গেল, দাঁড়িয়ে রইল কেবল রুমকি আর সৌনক।
— 'কেমন আছ তোর্সা?'
— 'আমার মতো স্বার্থান্বেষী মানুষেরা কি কখনও খারাপ থাকতে পারে সৌনক? ভালো আছি আমি, খুব ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?'
— 'এই, চলে যাচ্ছে।'
— 'বিয়ে করেছ?'
— 'নাহ, আর ইচ্ছে হল না। কলেজজীবনে যাকে ভালোবাসতাম, সে তো আমি গরীব পরিবারের ছেলে বলে আমায় প্রত্যাখ্যান করেছিল, তারপর থেকে এই ভালোবাসা, সম্পর্ক, সংসার এসবের প্রতি আগ্রহটাই চলে গেছে।'
রুমকির চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল। সেই জলটা শাড়ির আঁচলে মুছে নিয়ে ও বলল, 'আমি কিন্তু বিয়ে করেছি জানো, ভীষণ সুখী আমি বুঝলে, আমার হাসব্যান্ড আমায় খুব ভালোবাসে।'
— 'হুম, সেসব আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই, তোমার বোনের মুখ থেকে সব শুনেছি আমি।'
— 'তার মানে তুমি জানতে আমিই কাহিনীর দিদি?'
— 'না, শুধু জানতাম ওই অভিজিৎ সরকার ওর জামাইবাবু, যে ড্রাগ পাচারের কেসে ধরা পড়ে এখন জেল খাটছে। স্মৃতি ম্যাডাম কেবল রুমকিদি রুমকিদি বলতেন, তখন তো আর জানতাম না যে তোমার ডাকনাম রুমকি।'
রুমকি কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
— 'ডিভোর্স হয়ে গেছে?'
— 'হুম।' রুমকি হাসল, 'ভালোবাসা রিফিউজ করে যে টাকাকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে, তার সংসারটা তো এমনই হবে, তাই না?'
— 'তবে ফেরার রাস্তা এখনও খোলা আছে কিন্তু।'
— 'তা আর হয় না সৌনক। তুমি এমন একজন মেয়েকে ডিসার্ভ করো, যে লক্ষ্মী, একেবারে আমার বোনের মতো।' একটু থামল রুমকি, 'কিন্তু আমি যে অলক্ষ্মী!'
রুমকি চলে যাচ্ছিল, কিন্তু সৌনক ওর হাতটা ধরল, তারপরেই হ্যাঁচকা টানল, আর রুমকি এসে পড়ল সৌনকের বুকে।
সৌনক রুমকির চুলটা কানের পাশে সরিয়ে দিয়ে বলল, 'কিন্তু আমি যে অলক্ষ্মীকেই চাই!'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ষটচত্বারিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ