কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চতুঃচত্বারিংশ পর্ব
— 'থাক থাক হয়েছে, মদ আর মাংস তাই তো? দাঁড়াও, মেডদের বলছি।'
দিপু হিয়ার গালদুটো টিপে দিয়ে বলল, 'এইজন্যই তো তোমায় এত্ত ভালোবাসি আমি ডার্লিং!'
— 'সরো তো, ন্যাকামি কোরো না। তা দিপুদা, তোমার গার্ল তো দিব্যি বিয়েটিয়ে করে সংসার গুছিয়ে নিল, এখন কি করবে তুমি? সত্যি, তোমার কপালটাই ফাটা মাইরি, সব মধু আকাশ ব্যানার্জীই খেয়ে নিল, আর তোমায় ভাগ্যে কাঁচকলাটাও জুটল না!'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'কে বলেছে? এবারে শিউলির থেকেও একটা আইটেম জুটিয়েছি, মেয়ে তো না, সে একেবারে অ্যাটম বম্ব!'
— 'বা বা, কে সেই মেয়ে? খুব হট বুঝি?'
— 'হট বলে হট, এক্কেবারে আগুন!'
— 'তা নাম কি তার? আর কোথায় আলাপ হল? কোনো পার্টিতে?'
— 'ধুস, তুমি আমার কথা ছাড়ো তো কাহিনী, ওপস সরি সরি, তুমি তো কাহিনী নও, হিয়া। তা হিয়া, এত বড় একটা দাঁও মারলে কি ভাবে? তোমার তো হেব্বি বুদ্ধি ঘটে!'
— 'তবে? জে.পি.দত্ত মেমোরিয়াল কলেজের সেকেন্ড গার্ল আমি, তোমার মতো ফেলু মদন নাকি?'
— 'আহ ডার্লিং, আবার খোঁচা মারলে তো? অবশ্য মেয়েদের কাছ থেকে এরকম মিষ্টি খোঁচা খেতে আমার হেব্বি লাগে। তা সে যাক, এবার তো গল্পটা শুনি। কিভাবে এত বড় বাড়িটা বাগালে তুমি? আর এই এই, শুনলাম তুমি নাকি সত্যি কাহিনী নও, আসল কাহিনী নাকি ওই শিউলিই?'
— 'আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, একদম ঠিক শুনেছ তুমি। ওই মেয়েটাকে খুন করে আমি কাহিনী সেজে আসব সেটাই ওই বজ্জাত তোর্সা চৌধুরীর প্ল্যান ছিল, ভেবেছিল হিয়াকে আঙুলের ডগায় নাচাবে! শেষে আমারই হাতের পাপেট হয়ে গিয়েছিল মালটা, তারপর বরের হাতে মার টার খেয়ে পালিয়ে এসে এখন শিউলির সাথে কোথায় যেন একটা থাকে।'
— 'ও ব্বাবা, তার মানে আকাশ ব্যানার্জী যে খবরের অফিসে গিয়ে ওসব বলে এসেছিল, একটাও মিথ্যে নয়? সব সত্যি?'
— 'বিলকুল!'
— 'কিন্তু ও তো মরেনি।'
— 'হ্যাঁ, ওটাই তো ভুল ছিল সবচেয়ে। রুমকিদি ঠেলল ঠিকই, কিন্তু আরেকটু জোর দিতে পারল না! তাহলেই তো একদম খাদের গভীরে গিয়ে পড়ত! তা না, গাছের সাথে ওড়না জড়িয়ে গেল ওর!'
— 'আচ্ছা, তারপর তারপর?'
— 'তারপর আমরা যখন জানতে পারলাম, অভিজিৎ সরকারকে পাঠালাম ওর ঘরে ওর গায়ে কলঙ্ক লেপে দেওয়ার জন্য, এবারেও বেঁচে গেল ব্যাটা!'
— 'উরিব্বাস মনে হচ্ছে যেন সিনেমার গল্প শুনছি। তারপর?'
হিয়া যাবতীয় ঘটনা খুলে বলল।
— 'উরে ব্বাবা, তুমি সত্যিই একখানা চিজ!'
— 'তবে? আরে ওই তো, বলতে বলতেই তোমার প্রিয় খাবার হাজির!'
মেড এসে মাদক আর চিকেন পকোড়া রেখে গেল।
হিয়া আর দিপু সেসব গোগ্রাসে খেল, তারপর একটা গ্লাসে মাদক ঢেলে হিয়ার দিকে এগিয়ে দিল দিপু।
হাসিমুখে হিয়া সবে দু'চুমুক খেয়েছে, অমনি দিপু মোবাইলটা বের করে একটা রেকর্ডিং শোনাল। এতক্ষণ হিয়া যা যা বলেছে, সেসব রেকর্ড করেছে দিপু।
— 'দ-দিপুদা! তুমি তার মানে!'
— 'শুধু রেকর্ড করিইনি, সাথে ও.সি.কে সেন্ডও করে দিয়েছি এটা। উনি বেরিয়েও পড়েছেন, সদলবলে আসছেন তোমায় অ্যারেস্ট করতে!'
— 'তুমি শিউলিদের দলে নাম লিখিয়েছ? কেন?'
— 'তাছাড়া আর কি উপায় হত বলো? সোজা কথায় বললে কি তুমি আমায় বিয়ে করতে রাজি হতে? তুমি জানো না ম্যাডাম, ওই অভিজিৎ সরকার যে ড্রাগ ডিলার ছিল, আমি ওই কাজে ওর ডানহাত ছিলাম, আমাকেও পুলিশ অ্যারেস্ট করেছিল, কিন্তু একটা শর্তেই ছেড়েছে আমায়, তা হল তোমায় ধরিয়ে দিতে হবে হাতেনাতে! আর আমিও সুযোগটা লুফে নিলাম! তোমায় পাওয়ার এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর পেতাম আমি?
— 'মানে?'
— 'মানে আমি মনে মনে যে হট আইটেম বম্বটাকে ভালোবাসি, সে তো আসলে তুমি! অনেক ভেবে দেখলাম জানো, ওই শিউলি না কাহিনী, ও তো একটা স্টিরিওটাইপ ন্যাকা মেয়ে, ওরকম একটা মেয়ের সাথে ফুর্তি করা যায়, কিন্তু দিনরাত ওরকম একটা পাবলিককে চোখের সামনে সহ্য করা? ইম্পসিবল, ওই আকাশ ব্যানার্জীই ওকে ডিসার্ভ করে, আর আমি? তোমার মতো একটা আগুনের গোলা চাই আমার, তুমি আর আমিই আসলে রাজযোটক, বুঝলে? উফ, এটা যে আমি আগে কেন বুঝিনি!'
— 'শয়তান হাড়বজ্জাত ছেলে কোথাকার! তুমি মনে মনে আমায় চাও?'
— 'একদম সোনা! তুমি কি সোজা কথা শোনার মেয়ে নাকি? তোমার মতো সাপকে ধরতে গেলে বুদ্ধিমান সাপুড়ে হতে হবে! শোনো হিয়া ম্যাডাম, তোমার সামনে দুটো রাস্তা, হয় তুমি গরাদের ওপারে যাবে, নয়ত আমায় বিয়ে করে গুছাইত বাড়ির একমাত্র ছেলের বৌ হবে, ব্যস, তাহলেই পুলিশ তোমার টিকিটিও ছোঁবে না। জানো তো, আমার বাবার হাত অনেকটা লম্বা।'
— 'সুদীপ গুছাইত, তুমি ডালে ডালে চললে আমিও পাতায় পাতায় চলি। আর যার বাবা নিজের ছেলেকেই বাঁচাতে পারে না, সে আবার তার ছেলের বৌকে কি বাঁচাবে? আর আমার সামনে একটা থার্ড রাস্তা খোলা আছে, তা হল পলায়ন, বুঝলে?'
হিয়া চৌধুরীবাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল।
— 'এই ডার্লিং, দাঁড়াও বলছি! এই দেখো আমি রেজিস্ট্রি ম্যারেজের পেপারও নিয়ে এসেছি, আজ তোমায় সই করতেই হবে এখানে বলে দিচ্ছি, পালিয়ে বাঁচবে না তুমি!'
হিয়া রাস্তা দিয়ে ছুটতে লাগল পড়ি কি মরি, পিছনে দৌড়ে আসতে লাগল দিপু। ছুটতে ছুটতে হঠাৎ একটা বড় গাড়ির সাথে অ্যাক্সিডেন্ট হল হিয়ার। রক্তাক্ত হিয়া রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল। দিপু সেদিকে ছুটে যাচ্ছিল, হঠাৎ পুলিশের গাড়ি এসে পথ আটকাল ওর।
মর্গে শোয়ানো আছে হিয়ার রক্তাক্ত মৃত শরীরটা। অ্যাক্সিডেন্টে স্পট ডেড হয়েছে ও, হসপিটালে নিয়ে গিয়ে কোনো লাভ হয়নি, ডাক্তার মৃত বলে ঘোষণা করেছেন।
দিপুর গালে এক চড় মারল তরুণ পুলিশ অফিসার সৌনক, 'আমরা তোকে কেন ছেড়েছিলাম জানোয়ার? যাতে হিয়াকে আমরা হাতেনাতে ধরতে পারি, আর তুই কি করলি? মেয়েটাকে বিয়ে করবি বলে হড়বড় করে বলে দিলি যে সব রেকর্ড করেছিস তুই! সেজন্যই তো ও পালাতে গেল, আর পালাতে গিয়েই...'
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'আসলে স্যার, লোভে পাপ, আর পাপে...' বলেই স্মৃতির দিকে তাকাল ও।
হিয়ার দাদু হরিশচন্দ্রও হাজির ছিলেন সেখানে, বললেন, 'আমাদের একমাত্র ছেলে আর বৌমা অ্যাক্সিডেন্টে যখন মারা যায়, হিয়া তখন মাত্র তিন বছরের শিশু। ওর ঠাম্মি আর আমি কখনো ওকে খারাপ শিক্ষা দিইনি, তাও যে কিভাবে এমন ক্রিমিনাল তৈরি হল ও! আমি সেদিন সন্ধ্যেবেলায় বাড়ি ফিরে দেখি, উমা মেঝেতে পড়ে আছে, নাকের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে দেখি শ্বাস পড়ছে না। তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডেকে আনলাম, কিন্তু লাভ হল না, উমা ততক্ষণে!'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : পঞ্চচত্বারিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ