কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ত্রিচত্বারিংশ পর্ব
— 'কেন মিসেস কাকলি চৌধুরী, তুমিই তো কাল রুমকিদির নামে যে সম্পত্তিটা ছিল, সেটা আমায় দিয়ে দিয়েছ স্বেচ্ছায়, মনে নেই?'
— 'মানে?'
— 'এই দেখো।' হিয়া কাগজটা দেখাল সবাইকে।
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'তার মানে কাল রাতে তুমি যে...'
— 'হ্যাঁ, কাল রাতে আমি ডাহা মিথ্যে বলে সওওওবটা নিজের নামে করিয়ে নিয়েছি, বুঝলে? আর এক্ষুণি উকিলবাবু এলেন বলে, ওনাকে ফোন করে দিয়েছি আমি কালকেই। উনিই এসে তোমাদের সমূলে উৎখাত করবেন এখান থেকে।'
— 'হিয়া ম্যাডাম, অধম হাজির!' একমুখ হাসি নিয়ে এলেন উকিলবাবু।
— 'আরে রাধানাথ বাবু, আসুন আসুন। আপনাকে না তাড়াতাড়ি আসতে বললাম, এতক্ষণে এলেন?'
— 'সরি ম্যাডাম, একটু দেরি হয়ে গেল।'
— 'আমাকে আর কৈফিয়ত দিতে হবে না, ওই পাবলিকগুলোকে লিগ্যাল পেপারগুলো দেখিয়ে বের করে দিন তো তাড়াতাড়ি! আমার আর এদের এসব নাটক ন্যাকামি ভালো লাগছে না।'
রাধানাথ আর হিয়া সকলকে বাধ্য করল বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে।
— 'কি বলছিস তুই সায়নী? তোদের সবাইকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে?'
— 'শোন্ না বীণা, তোর কাছে তো নিশ্চয়ই কাহিনীর ছবি আছে, একটা ছবি আমার ফোনে পাঠাতে পারবি?'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই ফোনটা রাখ, আমি এক্ষুণি পাঠাচ্ছি।'
বীণার পাঠানো ছবিগুলো দেখে সবাই নিশ্চিত হয়ে গেল যে শিউলিই কাহিনী।
— 'ভুল করেছি যখন, মাশুল তো গুনতেই হবে!' দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন ত্রিদিববাবু।
— 'আচ্ছা দিদি, শিউলি আর হিয়ার ডি.এন.এ রিপোর্টটা পালটে দিয়েছিল তোমার গুণধর মেয়ে, তাই না?'
— 'হ্যাঁ রে ছোট, যার সাহায্য নিয়েছিল ও সেদিন, আজ তার জন্যই মেয়েটা! ওর শাশুড়ি বলছিল, ওর দিকে নাকি তাকানো যেত না, গোটা গা জুড়ে কালসিটে, রক্ত! কত রাত যে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে!' গলা বুজে এল কাকলির।
— 'দিদি, রুমকি আমারও মেয়ে, তুমি কাহিনীর ক্ষতি চাইলেই যে আমিও রুমকির ক্ষতি চাইব তেমন অমানুষ আমি নই, তবুও বলব, হয়ত নিজের পাপের ফল পেয়েছে রুমকি, যেমন আজ আমরা পাচ্ছি।'
— 'কিন্তু বৌমা, শিউলি তো বীণাকে ডেকে এনেও সবটা প্রমাণ করে দিতে পারত, সেটা কেন করেনি ও?' হেমনলিনী দেবী অবাক গলায় প্রশ্ন করলেন।
— 'কেন আবার মা? অভিমানে। সত্যিই তো, আমাদেরই তো উচিত ছিল ওকে চিনে নেওয়া, কিন্তু পারিনি আমরা। ইচ্ছে করে চোখের ওপর পর্দা নামিয়ে রেখেছিলাম, তাই অভিমানে ও আরও দূরে সরে গেছে।'
— 'কিন্তু সায়নী, এই বয়স্ক দুজন মানুষকে নিয়ে এখন কোথায় যাব আমরা? অন্য যেখানে যা বাড়িজমি ছিল, সবই তো এখন হিয়ার নামে!'
— 'আর কোথায় অনন্ত? যার কাছে গেলে সে ফিরিয়ে দেবে না! আজ তো লক্ষ্মীপুজো, মা লক্ষ্মীর কাছেই যাব আমরা।'
স্বর্ণালীর ফ্ল্যাটে সবাই তখন লক্ষ্মীপুজোর জোগাড়ে ব্যস্ত, হঠাৎ কলিংবেলটা বেজে উঠল। আকাশই গিয়ে দরজাটা খুলল।
— 'এ কি আপনারা? একেবারে সদলবলে চলে এলেন যে! আপনাদের মেয়েকে তো আমরা ছাড়িয়ে দিয়েছি!'
— 'ওটাই সবচেয়ে ভুল হয়ে গেছে বাবা!' ত্রিদিববাবু বললেন।
— 'মানে?'
সবাই সবটা খুলে বললেন। সবটা শুনে ভীষণ রেগে গেল স্মৃতি, 'হিয়ার এত সাহস? তোমাদের সবাইকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে?'
সায়নী শ্লেষের হাসি হেসে বলল, 'তোকে যেদিন অন্যায়ভাবে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলাম, আকাশ বলেছিল, ভুলে যাবেন না, karma বলেও একটা বস্তু আছে!'
স্বর্ণালীর ফ্ল্যাটেই সকলের থাকার ব্যবস্থা হল।
— 'তোমায় খুবই অসুবিধায় ফেললাম গো মা! এতজন মিলে এভাবে....' হেমনলিনী দেবী ইতস্তত করলেন।
— 'চিন্তা করবেন না মাসিমা। আমার ফ্ল্যাটটা ছোট হতে পারে, তবে সুখ শান্তির কোনো অভাব পাবেন না এখানে। সবাই মিলে একসাথেই থাকব মিলেমিশে।' স্বর্ণালী হেসে বললেন।
— 'কিন্তু মামণি, ওদের সবার সাথে যে অন্যায়টা হয়েছে, তার তো বিচার হতে হবে!' রাগান্বিত হয়ে উঠল স্মৃতি।
— 'তুমি ভেবো না স্মৃতি, এর শেষ দেখে তবেই আমি ছাড়ব।' আকাশ বলে উঠল।
সায়নী ছুটে এসে স্মৃতিকে বুকে জড়িয়ে ধরল, 'বীণার চ্যালেঞ্জে আমি গোহারা হেরে গেছি রে মা! তোকে দিনের পর দিন চোখের সামনে দেখেও!' কান্নায় ভেঙে পড়ল সায়নী।
— 'এখন এসব কথা থাক না মা,' সায়নীর চোখের জল মুছিয়ে দিল স্মৃতি, 'তোমরা সবাই এতটা রাস্তা এলে, আগে একটু রেস্ট নাও।'
— 'আমাদের ক্ষমা করে দিও গো কাহিনী দিদিভাই।' ত্রিদিববাবু আর হেমনলিনী দেবী কান্নাভেজা গলায় বললেন।
স্মৃতি কিছু বলতে যাবে তার আগেই রুমকি বেরিয়ে এল ঘর থেকে, 'যাক, শেষ পর্যন্ত যে আমার বোনটা সুবিচার পেল, দেখেই ভালো লাগছে!'
কাকলি এগিয়ে এল স্মৃতির দিকে।
— 'তোর কাছে সবচেয়ে বড় অপরাধী তো আমি রে কাহিনী! ছোট রুমকিকে মেয়ের মতো স্নেহ করে গেছে আজীবন, আর আমি? আর সে কারণেই তো আমার মেয়েটা আজ....'
— 'বাহ, মিসেস কাকলি চৌধুরী, এখনও আপনি শুধু নিজের মেয়ের কথাই ভেবে চলেছেন?'
— 'রুমকি!' শ্লেষের হাসি হাসল কাকলি, 'তোর মা এক সময় সত্যিই খারাপ ছিল রে, কিন্তু আজ আর সে তেমন নেই, তোরই মতো সেও নিজেকে বদলে নিয়েছে, আর তাই তো আমি স্মৃতির কাছে এসেছি ক্ষমা চাইতে।'
— 'থাক, এসব আসলে তোমার নাটক!'
— 'আহ রুমকিদি! বড়মার সাথে এভাবে কথা বোলো না, প্লিজ! মানুষটা সত্যিই বদলে গেছে গো, আর কষ্ট দিও না তুমি।'
কাকলি রুমকিকে বুকে জড়িয়ে ধরল। রুমকিও আর বাধা দিল না।
একদিন সন্ধ্যেয় হিয়া মনের সুখে বসে টিভি দেখছিল, হঠাৎ কলিংবেলের শব্দ। দরজাটা খুলেই হিয়া অবাক।
— 'এ কি দিপুদা, তুমি?'
— 'তোমায় কংগ্র্যাচুলেট করতে চলে এলাম!'
— 'হা হা, এসো এসো, ভেতরে এসো। তা কি খাবে বলো।'
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল দিপু, 'সত্যি মাইরি, আমি কি খাব সেটাও বলে দিতে হবে তোমায়? তুমি কি আজ নতুন দেখছ আমায়?'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : চতুঃচত্বারিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ