কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দ্বিচত্বারিংশ পর্ব
— 'কি ব্যাপার হিয়া, কিছু বলবে?'
— 'হ্যাঁ বড়মা, কিছু ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলার ছিল।'
— 'কি ব্যাপারে?'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'রুমকিদির ব্যাপারে গো।' হিয়া নরম সুরে বলল, 'দেখো বড়মা, রুমকিদি অনেক কষ্ট পেয়েছে। ওই অমানুষ অভিজিৎ সরকার কি অত্যাচারটাই না করেছে! এখন ওই হতভাগী স্মৃতি ওকে রেখেছে ঠিকই নিজের কাছে, কিন্তু সে কি আর এমনি এমনি? দুদিন পর ওর বাচ্চাকাচ্চা হবে, তখন রুমকিদিকেই ন্যানি বানাবে ওর বাচ্চার। তারপর বাচ্চাটা যেই বড়ো হয়ে যাবে, পত্রপাঠ বিদেয় করে দেবে ওকে!'
কাকলি কিছু বলল না। ওর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল।
হিয়া বলে যেতে লাগল, 'তাই রুমকিদির ফিউচারটা সিকিওর করাটা খুব দরকার গো বড়মা। পায়ের নিচের মাটিটা শক্ত করাটা খুবই দরকার গো রুমকিদির, তাই আমি আর দেরি করতে চাই না গো। এই বাড়ির সম্পত্তির অর্ধেক তো পেয়েই গেছে রুমকিদি, বাকি অর্ধেকও আমি আজকেই রুমকিদিকে দিয়ে দিতে চাই গো। হাজার হোক, আজ যে আমি এরকম একটা লাইফ লিড করছি, সেটা তো রুমকিদির জন্যই বলো, তাই রুমকিদির কথা তো সবার আগে ভাবতে হবে আমায়, তাই না?'
কাকলি ভাবলেশহীন গলায় বলল, 'কোথায় সই করতে হবে আমায়?'
— 'এ-এই তো বড়মা', হিয়া কাগজটা এগিয়ে দিল, 'এখানে সই করে দাও।'
কাকলি কাগজটা পড়েও দেখল না, সই করে দিল।
— 'থ্যাঙ্কিউ বড়মা।' বাঁকা হেসে কাগজটা নিয়ে বেরিয়ে গেল হিয়া।
কাকলি অন্ধকারে বসে রইল চুপচাপ। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল। ঘরের দেওয়াল জুড়ে রুমকির বিভিন্ন বয়সের ছবি টাঙানো।
— 'আজ তোর এই পরিণতির জন্য আমিই দায়ী রে মা! আমি কোনোদিন বুঝিনি অন্য মায়ের কোল খালি করে কখনো নিজের সন্তানকে সুখ দেওয়া যায় না। হয়ত একেই বলে কর্মফল! সম্ভব হলে তোর এই অভাগী মা টাকে ক্ষমা করে দিস রে।'
কান্নায় ভেঙে পড়ল কাকলি।
অন্যদিকে হিয়া নিজের ঘরে গিয়েই একটা নাম্বারে ফোন করল, যে নাম্বারটা আগে থেকেই হিয়ার মোবাইলে সেভ করা ছিল, এমনকি নাম্বারের মালিকও ওর পরিচিত।
পরেরদিন সকালে সবাই খুব ব্যস্ত, কারণ লক্ষ্মীপুজো যে আজ। হঠাৎ হিয়া এসে হাজির সেখানে, 'কি নাটক হচ্ছে এসব সকাল সকাল? এটা বাড়ি, নাকি মাছের বাজার?'
— 'কাহিনী এসব কি ধরণের কথা? জানিস না আজ লক্ষ্মীপুজো! আমাদের বাড়িতে....'
— 'ওয়েট, কি বললে মিসেস সায়নী চৌধুরী? তোমাদের বাড়ি?' অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল হিয়া, 'এটা আমার বাড়ি, শুধু আমার, তোমাদের কারোর না!'
— 'মায়ের সাথে কিভাবে কথা বলছিস কাহিনী তুই?'
— 'কে আমার মা মিস্টার অনন্ত চৌধুরী? আমি যখন অনেক ছোট, আমার মা, বাবা দুজনেই তখনই পটল তুলেছে। অবশ্য তার জন্য বিশেষ দুঃখ আমার নেই, যাদের টাকাপয়সাই নেই, তাদের জন্য এই হিয়ার মনে কোনো জায়গা নেই।'
— 'ও দিদিভাই, রাগের বশে এসব কি উল্টোপাল্টা বকছ তুমি?'
— 'এই বুড়ি, কানের কাছে ফ্যাক ফ্যাক কোরো না তো! সব ঠাম্মাগুলোই শালা এক হয়, সব সময় শুধু নীতিকথা! এই কোরো না, ওই কোরো না! আরে দুদিন পর ঘাটে যাবে যারা, তাদের আবার....'
হিয়া কথাটা শেষ করার আগেই সায়নী ওকে চড় মারতে উদ্যত হয়, কিন্তু হিয়া সায়নীর হাতটা ধরে এমন ঠেলে দিল যে ছিটকে গেল ও, অনন্ত এসে ঠিক সময়ে না ধরলে পড়েই যেত সায়নী।
— 'বাড়ি এসে থেকেই দেখছি, তোমার বড্ড সাহস! কথায় কথায় আমার গায়ে হাত তোলো! কিভাবে সাহস হয় হ্যাঁ? আমারই বাড়িতে আমার দয়ায় বাস করছ, কোথায় এককোণে ঝিয়ের মতো পড়ে থাকবে, তা নয় বড় বড় চোপা?'
— 'দিদিভাই, এসব কেন বলছ তুমি? ত্রিদিববাবু প্রশ্ন করলে অবাক গলায়।
— 'আমি তোমার কেউ নই গো, না তো আমি তোমার নাতনী আর না তো এইবাড়ির মেয়ে আমি!'
— 'তাহলে? তাহলে কে তুই?' সায়নী প্রশ্ন করল।
— 'বলছি বলছি, সব বলছি। তোমরা এখন ঢোড়া সাপ, সব সত্যি জানলেও কিস্যু করতে পারবে না, আর এতদিন অনেক তেলিয়েছি তোমাদের, আর নয়! আমি ক্লান্ত ওই ন্যাকা কাহিনীর অ্যাক্টিং করতে করতে!'
হিয়া নিজের স্কুলের কথা, বাড়ির কথা থেকে শুরু করে কাহিনীকে খাদ থেকে ফেলে দেওয়া, রুমকির ওকে এই বাড়িতে সাজিয়ে নিয়ে আসা সবটা বলল। সব শুনে বাড়ির সকলে হতবাক হয়ে গেল।
— 'তার মানে শিউলি যা বলেছে আমাদের সবটা সত্যি!'
— 'হ্যাঁ মিসেস সায়নী চৌধুরী! তোমার মত এত ন্যাকা একজন মহিলার মেয়েও যে ন্যাকাই হবে তাতে আর আশ্চর্য কি?'
কাকলি বাড়ির এককোণে চুপটি করে বসেছিল। বাড়িতে ঘটে চলা ঘটনার বন্যা ওকে বিচলিত করতে পারছে না এতটুকুও। সায়নী দৌড়ে গেল কাকলির দিকে। তারপর ওকে টেনে তুলে ওর কাঁধ ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করল, 'তুমি নিজেও তো একজন মা, নিজে মা হয়ে আমার সাথে এত বড় অন্যায়টা করলে শুধু সম্পত্তির জন্য? এতই যদি টাকার লোভ হত তুমি আমায় বলতে, আমি কাহিনীর ভাগটা তোমার মেয়েকে দিয়ে দিতাম! তা না করে কিনা তুমি! ছিঃ!'
কাকলির স্বামী অজিত এগিয়ে গেল কাকলির দিকে।
— 'ছিঃ কাকলি, এতটা নিচ তুমি? আমরা সকলে জানতাম তুমি একটু রাগী, অভিমানী, কিন্তু এখন তো দেখছি তুমি একটা ক্রিমিনাল! আমাদের মেয়ের জীবনটাও নষ্ট হয়েছে শুধু তোমার জন্য।'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ তাই!' কাকলি চিৎকার করে উঠল, 'আমার মেয়ের জীবন আমি নিজের হাতে ভেঙে দিয়েছি! এর চেয়ে ঢের ভালো হত যদি রুমকিকে আমি নিজের হাতে খুন করতাম! অন্তত মেয়েটাকে দিনের পর দিন এত কষ্ট পেতে হত না, চোখের জল ফেলতে হত না!' মেঝেতে বসে পড়ল কাকলি, চোখের জলে মেঝে ভিজে গেল।
— 'দিদি তোমার মনে পড়ে, একদিন শিউলিকে কত অপমান করে, মারধোর করে বের করে দিয়েছিলাম আমরা? সেদিন মেয়েটা বারবার বোঝাতে চেয়েছিল সত্যিটা, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করিনি। তুমি তো সবটা জানতে তুমি, জেনেও চুপ করে ছিলে তুমি? উফ, কি সাংঘাতিক মানুষ গো তুমি!' সায়নী ঘৃণাভরে বলল।
— 'এই শোনো, তোমাদের এসব ড্রামা বাড়ির বাইরে গিয়ে করো, আমার এসব অসহ্য লাগছে! এক্ষুণি বেরিয়ে যাও তো সবাই!'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ত্রিচত্বারিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ