কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
একচত্বারিংশ পর্ব
— 'মা তুমি কিচ্ছু জানো না!' নকল কান্নার সুরে হিয়া বলল, 'ওই মেয়ের অসাধ্য কিচ্ছু নেই গো! অনিমেষকে ঘুষ দিয়ে ও ই ওইসব মিথ্যে বলিয়েছে গো!'
— 'হ্যাঁ ছোটবৌমা, কাহিনী দিদিভাই সত্যি কথাই বলছে।' ত্রিদিববাবু মুখ খুললেন এবার।
— 'বাবা আপনি সবটা শুনেও...'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'বৌমা, সাদা চোখে সবসময় যা দেখা যায় সেটাই সত্যি হয় না গো। চৌধুরীবাড়ির মেয়ে কখনো এমন অন্যায় করতে পারে না, নিশ্চয়ই ওকে ফাঁসানো হয়েছে।'
— 'হ্যাঁ গো বৌমা', হিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন হেমনলিনী দেবী, 'তোমার বাবা একদম ঠিক বলেছেন গো। আমাদের দিদিভাই একটু রাগী হতে পারে, তাই বলে অন্যায়? না না, এ অসম্ভব।'
ত্রিদিববাবুর বুকে মাথা রেখে বাঁকা হাসি হাসল হিয়া।
পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। প্রকৃতি সময়ের স্রোতে গা ভাসাতে ভাসাতে চলে এল শরৎকালে। দেবীপক্ষের সূচনা হল, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে, মন্ডপে মন্ডপে দুর্গামূর্তি পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলতে লাগল। চৌধুরীবাড়িতেও পুজো হয় প্রতিবার, শহরের অন্যমত বনেদীবাড়ির পুজোতে অনেক দর্শনার্থীদেরও সমাগম হয়। স্মৃতি ঘুমোচ্ছিল, হঠাৎ একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল ওর। ও দেখল, চৌধুরীবাড়িতে দুর্গাপুজো হচ্ছে, চারিদিক আলোয় আলোকিত, আর ও পুজোর কাজে সাহায্য করছে সবাইকে। কাজের ফাঁকে ফাঁকেই মায়ের মূর্তির দিকে তাকাচ্ছে স্মৃতি। মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তির চোখদুটো বড্ড জীবন্ত লাগছে যেন! হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙে গেল স্মৃতির। ঘুমটা ভেঙেই মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল স্মৃতির, মনে হল, যাহ, এটা শুধু স্বপ্ন ছিল মাত্র? বিছানা থেকে নামল স্মৃতি। আকাশ তখন অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে স্মৃতি দেখে, ভোর পাঁচটা বাজে। আলো ফোটেনি তখনও। স্মৃতি জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হঠাৎ ও দেখে, রাস্তায় একটা লরিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দুর্গামূর্তি। দুর্গামূর্তিটা কোন্ বাড়িতে যাচ্ছে সেটা বুঝতে দেরি হল না ওর এতটুকুও। একটু আগেই এই মুর্তিই তো ও স্বপ্নে দেখল। চোখে জল এল ওর অজান্তেই। আজ তো এইবাড়ির পুজোতে ওরও থাকার কথা ছিল, পুজোর সব কাজে হাত লাগানোরও অধিকার তো ছিল ওরই, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে একই শহরে থেকেও ওই বাড়ির পুজোতে কাজ করা তো দূর, বাড়ির ঠাকুরকে একবারটি দেখতে যাওয়ার অধিকারটুকুও ওর নেই। কান্নায় ভেঙে পড়ল স্মৃতি। হঠাৎই কানে একটা চেনা কন্ঠে গান ভেসে এল,
'দেখো দেখো, দেখো, শুকতারা আঁখি মেলি চায়
প্রভাতের কিনারায়৷
ডাক দিয়েছে রে শিউলি ফুলেরে -
আয় আয় আয়।'
স্মৃতি অবাক হয়ে ঘুরে দেখে, আকাশ গাইছে। আকাশ এগিয়ে এসে স্মৃতির চোখের জল মুছিয়ে দিল, তারপর আকাশের দিকে আঙুল দেখাল। ওর আঙুল বরাবর স্মৃতি তাকিয়ে দেখে, শুকতারা জ্বলজ্বল করছে। আকাশ গেয়ে চলে,
‘ও যে কার লাগি জ্বালে দীপ,
কার ললাটে পরায় টিপ,
ও যে কার আগমনী গায়-- আয় আয় আয়।’
মুহূর্তেই স্মৃতির মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। আকাশ স্মৃতিকে জড়িয়ে ধরে গাইতে থাকে,
‘জাগো জাগো সখী,
কাহার আশায় আকাশ উঠিল পুলকি।
মালতীর বনে বনে ওই শোনো ক্ষণে ক্ষণে
কহিছে শিশিরবায়-- আয় আয় আয়।’
আকাশ স্মৃতির হাত ধরে ওকে বিছানায় নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেয়, তারপর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে গানটা গুনগুন করতে থাকে। অচিরেই ঘুম নেমে আসে স্মৃতির দু'চোখে।
পুজোটা সানন্দে কাটে সবার। আকাশ আর স্মৃতিও খুব আনন্দে কাটাল পুজো। মন্ডপে মন্ডপে ঘুরে ঘুরে ঠাকুরও দেখল দুটিতে। দশমীর দিন আকাশ স্মৃতির গালে, সিঁথিতে সিঁদুর লাগিয়ে দিল। রুমকি শ্লেষের হাসি হেসে দেখতে লাগল। সঠিক মানুষকে যদি বিয়ে করত ও, তবে আজ ওও এভাবে প্রিয় মানুষটির হাত থেকে সিঁদুর পরতে পারত। সকলের অলক্ষ্যে চোখের জল শাড়ির আঁচলে মুছে নিল রুমকি।
পুজো কেটে যাওয়ার পরেই চৌধুরীবাড়িতে সম্পত্তি হস্তান্তরের তোড়জোড় শুরু হল।
— 'বাবা, এত তাড়াহুড়ো করার কি খুব দরকার ছিল? কাহিনীর এখন সবে উনিশ বছর বয়স, এই বয়সেই...' সায়নী আর অনন্ত আপত্তি জানাল।
— 'না গো, আমি বুড়ো মানুষ, আজ আছি, কাল নেই। তাই এসব আর ফেলে রাখতে চাই না আমি। দুই নাতনীর ভবিষ্যৎ যাতে সুনিশ্চিত হয়, সে ব্যবস্থা তো করতে হবে নাকি!'
হিয়া বাঁকা হাসি হাসল।
অন্যদিকে কাকলি আগে যেমন মানুষ ছিল, অল্পেই ঝগড়াঝাঁটি অশান্তি করত, সম্পত্তির প্রতি লোভ ছিল, আজ চরিত্রে অনেকটাই বদল ঘটেছে যেন ওর। সেভাবে কথাবার্তা বলে না, উৎসব অনুষ্ঠানেও থাকে না, এমনকি ঘর থেকেও বেরোয় না সেভাবে।
— 'কিন্তু রুমকিদিদি তো আর কোনোদিন এ বাড়িতে আসবে না বলেছে, তাহলে ওর সই পাবে কোথায়?' হেমনলিনী দেবী প্রশ্ন করলেন।
— 'তুমি চিন্তা কোরোনা ঠাম্মি!' হিয়া ব্যস্ত হয়ে উঠল, 'রুমকিদি নাই বা থাকল, বড়মা তো আছে নাকি! বড়মাই না হয় রুমকিদির হয়ে সই করে দেবে!'
হিয়ার কথামতোই সবটা হল। কাকলিই সই করে দিল রুমকির হয়ে, আর হিয়াও সই করল। হিয়া মহাখুশি হয়ে সেই রাতেই রওনা দিল বারে। বন্ধুবান্ধবদের সাথে রাতভর পার্টি করল ও। পরেরদিন সকালে যখন বাড়ি ফিরল ও, চোখ লাল হয়ে গেছে, নেশার ঘোরে টলছে ও। ওই অবস্থাতেই নিজের ঘরে চলে গেল ও।
— 'জানো অনন্ত, আমার মাঝে মাঝে খুবই সন্দেহ হয়, এ কি সত্যিই আমাদের মেয়ে? আমাদের মেয়ে কিভাবে এরকম হল গো?' হতাশ গলায় সায়নী বলল, 'তুমি আমি এমন নই, এই পরিবারের কেউই এরকম উশৃঙ্খল জীবনযাপন করেনি কখনো, তাহলে কাহিনী কিভাবে এমন হল?'
— 'জানিনা সায়নী। তবে আমার মনে হয়, ওর বয়সটা তো কম, তাই হয়ত এরকম করছে। বয়সটা বাড়ুক, দেখবে ও নিজেই নিজেকে বদলে নেবে।'
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : দ্বিচত্বারিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ