কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চত্বারিংশ পর্ব
— 'সরি ম্যাডাম, আমায় ক্ষমা করবেন। আমি বা স্মৃতি কেউই এই ব্যাপারে আপনাকে হেল্প করতে পারব না বিশ্বাস করুন। পৃথিবীর সব ক্রিমিনালেরই তো পরিবার থাকে, তাহলে পরিবারের সুনাম বজায় রাখার জন্য তাদের সবাইকেই ছেড়ে দেওয়া উচিত, তাই না ম্যাডাম বলুন?'
— 'আকাশ, আমি জানি, স্মৃতির ওপর অনেক অন্যায় হয়েছে, সেজন্য আমি ক্ষমা চাইছি! কিন্তু প্লিজ এভাবে রিভেঞ্জ নিও না আমাদের ওপর! কাহিনী যদি বাড়ি না ফেরে, বাবা হয়ত আর বাঁচবেন না!'
— 'দেখুন ম্যাডাম, আপনি যেটা করছেন সেটাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল বলে, বুঝলেন? আপনার শ্বশুরমশাই অসুস্থ বলে একটা জলজ্যান্ত ক্রিমিনাল যে কিনা মানুষ খুন করতে পিছপা হয় না, তাকে ছেড়ে দেব আমি? কখনোই না।' আকাশ ফোনটা কেটে দিল।
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
ডিনারের পর স্মৃতি ঘুমিয়ে পড়ল। আকাশও ঘুমিয়ে পড়ার জোগাড় করছে হঠাৎ আবার ফোন এল।
— 'উফ আবার ওই চৌধুরীবাড়ি থেকে কেউ ফোন করে ঘ্যান ঘ্যান করবে নিশ্চয়ই হিয়াকে ছাড়ানোর জন্য।'
কিন্তু ফোনটা তুলেই আকাশ দেখে, প্রকাশ ফোন করেছেন।
— 'আরে মিস্টার প্রকাশ ব্যানার্জী যে? আপনি কেন ফোন করেছেন আমি জানি, তবে সরি, আমি আপনার জন্য কিছুই করতে পারব না। আপনি হাজার রিকোয়েস্ট করলেও প্রমীলা ব্যানার্জীকে কিছুতেই আমি জেলের বাইরে বের করব না, আপনার ঠুনকো সম্মান তাতে চলে গেলেও না!'
— 'না আকাশ, ওই মহিলাকে আমি জেলের বাইরে বের করতে বলব তোমায়, তুমি ভাবলে কিভাবে? আমি ঠিক করেছি, মহিলাকে ডিভোর্স দিয়ে দেব আমি। তবে হ্যাঁ দ্বিতীয় পক্ষের ছেলেমেয়েদের আমি আমার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করব না,বাড়ি থেকেও চলে যেতে বলব না, কিন্তু ওই মহিলা? ওর আর কোনোদিন এই ব্যানার্জীবাড়িত্র ঠাঁই হবে না।'
— 'দেখুন মিস্টার ব্যানার্জী, এসব আপনার বাড়ির ভেতরকার ব্যাপার, আমি এসব জেনে কি করব?'
— 'প্লিজ আকাশ, তুমি বাড়ি ফিরে এসো। আমি বুঝতে পারছি তুমি এতদিন যা যা বলেছ তার একটা কথাও ভুল নয়, তুমি প্রমীলাকে কখনো পছন্দ করতে না, বলতে ও মানুষ ভালো না, টাকার লোভে আমায় বিয়ে করেছে, কিন্তু আমি কখনো বিশ্বাস করিনি, আর আজ দেখো তার ফল হাতেনাতে পাচ্ছি।'
— 'সরি মিস্টার ব্যানার্জী, যে বাড়ি থেকে একদিন আমার স্ত্রীকে অপমান করে বের করে দেওয়া হয়েছে, আপনি হাজার রিকোয়েস্ট করলেও সেই বাড়িতে আমি কোনোদিনই ফিরব না।'
— 'প্লিজ আকাশ, আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। তুমি ফিরে এসো, সাথে করে আমার ঘরের লক্ষ্মীকেও নিয়ে এসো প্লিজ।'
— 'সরি, আমি আপনার এই রিকোয়েস্টটা রাখতে পারলাম না। এই আপনিই একদিন প্রমীলা ম্যাডামকে চোখের মণি করে রেখেছিলেন, আজ যেই তার জন্য আপনার বদনাম হল, তাকে ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কে বলতে পারে কাল একই কারণে আমাদেরও আপনি বের করে দেবেন না? তার চেয়ে ওই বিশাল রাক্ষুসে বাড়িতে আপনি একাই থাকুন, সেটাই বেস্ট হবে।' আকাশ ফোনটা রেখে স্মৃতির পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরেরদিন সকালে উঠে স্মৃতি, স্বর্ণালী,আকাশ আর রুমকি সবে চা খেতে বসেছেন, হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। আকাশ গিয়ে দরজাটা খুলতেই ভেতরে ঢুকে পড়ল সায়নী আর অনন্ত।
— 'এ কি ছোটমা, তোমরা? এত সকালে?'
সায়নী এসেই স্মৃতির হাতদুটো ধরল, 'দোহাই শিউলি, তোর পায়ে পড়ি, কাহিনীকে প্লিজ জেল থেকে ছাড়ার ব্যবস্থা কর, প্লিজ!'
— 'অদ্ভুত মানুষ তো আপনারা! কালই তো আমি আপনাদের ফোন করে যা বলার বললাম, তারপরেও সটান এখানে চলে এলেন? আমাদের ঠিকানা কোথায় পেলেন আপনারা?'
— 'কাহিনীর কাছ থেকেই, ও ই কিছু লোককে পাঠিয়েছিল যারা তোমাদের ফলো করত রোজ।' মাথা নিচু করে বলল অনন্ত, 'আমাদের মেয়ে যে এতটা নিচে নেমে যাবে তা কোনোদিন ভাবিনি আমরা।'
— 'অথচ আমাদের বাড়িতে দিব্যি চলে এলেন সেই মেয়েকেই ছাড়ানোর জন্য, বাহ!'
— 'আসতাম না আকাশ, বিশ্বাস করো! ডাক্তার বলেছেন, কাহিনীকে যদি বাবার সামনে এনে না দাঁড় করাতে পারি, ওনাকে আর বাঁচানো যাবে না।' সায়নী কেঁদে ফেলল, 'বাবা কিছুতেই মানতে পারছেন না ওঁর প্রিয় ছোট নাতনীর এই পরিণতি।'
সায়নী স্মৃতির পায়ে পড়তে গেল, কিন্তু স্মৃতি ব্যস্ত হয়ে আটকাল সায়নীকে, 'কি করছ তুমি ছোটমা?'
— 'তুই তো আমাকে তোর মা ভাবিস শিউলি, তোর মা আজ তোর কাছে ভিক্ষা চাইছে রে আঁচল পেতে, ফিরিয়ে দিস না!'
শেষমেশ আকাশ আর স্মৃতি রাজি হল বাধ্য হয়েই।
— 'বেশ, এই শেষবার। এরপর যদি আপনার প্রিয় মেয়ে আমাদের আর কোনোরকম সমস্যায় ফেলার চেষ্টা করে, আর কিন্তু...'
— 'না না বাবা, ওর হয়ে আমরা কথা দিচ্ছি গো, আর কখনো শিউলিকে বা তোমাকে ও বিরক্ত করবে না।' সায়নী বলল।
— 'রুমকি, তুই এখানে আছিস? হ্যাঁ, তোর শ্বশুরমশাই একদিন ফোন করেছিলেন, করে সব বলেছিলেন। কিন্তু হ্যাঁ রে, আমাদের কাউকে ফোন করতেও ইচ্ছে করে না তোর মা? এত অভিমান আমাদের ওপর?' অনন্ত বলল।
রুমকি কিছু না বলে চুপচাপ নিচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
— 'দিদি কত কাঁদে তোর জন্য, তোর কি নিজের মাকেও মনে পড়ে না?' সায়নী প্রশ্ন করল।
— 'ছোটমা, একটা গল্প আছে জানো, তুমি ছোটবেলায় আমায় শোনাতে, মাসি তুমি আমার ফাঁসির কারণ। মনে পড়ে তোমার?'
হিয়াকে জেল থেকে ছাড়িয়ে বাড়ি ফিরিয়ে আনা হল। ওকে দেখে ত্রিদিববাবু এতটাই আনন্দিত হলেন যে শরীর অনেকটাই সুস্থ বোধ করতে শুরু করলেন।
— 'এসো দিদিভাই, আমার বুকে এসো গো।'
হিয়াকে বুকে টেনে নিলেন ত্রিদিববাবু। হিয়া নকল কান্নাকাটি করতে শুরু করল।
— 'দাদু, বিশ্বাস করো, এসব মিথ্যে। ওই হতভাগা শিউলিটাকে তাড়িয়ে দিয়েছি না আমরা সবাই মিলে, সেটার প্রতিশোধ নিয়েছে ও!'
সায়নী এবার দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল হিয়ার দিকে, ওকে ত্রিদিববাবুর বুক থেকে তুলে নিয়ে সজোরে এক চড় মারল ও।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : একচত্বারিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ