Advertisement

কাহিনী (ঊনচত্বারিংশ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ঊনচত্বারিংশ পর্ব



স্মৃতির হঠাৎ মাথায় খেলল আকাশের সকালে বলা কথাটা। একটা পাকা মাথা কাজ করছে এর পেছনে, প্রমীলা ব্যানার্জীই কি সে?

— 'বুঝলাম।'

— 'শুধু কি তাই রে? চৌধুরীবাড়ির ছোটমেয়েটাও কম হাড়ে বজ্জাত নয়, ঠিক জানে কোন্ দেবতা কোন্ ফুলে তুষ্ট, তাই চৌধুরীবাড়ির সিন্দুকের গয়নার লোভ দেখিয়েছে, আর আমার বড়মাসিটিও তেমন, গয়নার লোভে আমায় লাগিয়ে দিল তোদের পেছনে!'

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


— 'আর তুই?'

— 'আসলে দাভাই', মাথা চুলকে অনিমেষ নেশার ঘোরে বলল, 'আমাকেও ওই গয়নার ভাগ দেবে বলেছিল, তাই আর কি!'

— 'আর তাই তুই আমরা যে গাড়িটায় যাতায়াত করি ওটার কলকব্জা বিগড়ে দিলি, তাই তো?'

— 'আর বলিস না রে, এটাও ওই বজ্জাত প্রমীলা ব্যানার্জীর প্ল্যানের অংশ ছিল জানিস।'

আরও একটা গ্লাসে মাদক ঢেলে আকাশ এগিয়ে দিল অনিমেষের দিকে। হাসিমুখে অনিমেষ গ্লাসটা নিল, এক চুমুকে সবটা শেষ করল।

— 'আর তুই শুধু সোনাদানার লোভে একটা প্রেগন্যান্ট মেয়েকে এতটা ঝামেলায় ফেললি, না? স্মৃতির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখ, কতটা টেনশন গেছে ওর ওপর দিয়ে!'

— 'এসব কি বলছিস তুই? পাগল হয়ে গেছিস?'


আকাশ এবার ঝাঁপিয়ে পড়ল অনিমেষের ওপর, ওর কলারটা ধরল সজোরে, 'পাগলামির কি দেখেছিস জানোয়ার? কি ভেবেছিস, সব ছেলে তোর মতো হয়? যারা মেয়েদের শুধু একটা মাংসপিণ্ড ছাড়া আর কিছুই ভাবে না! তুই স্মৃতিকে সমানে অপমান করে যাচ্ছিলি, কি ভেবেছিলি, তোকে কিচ্ছুটি বলব না আমি?'

অনিমেষ মদের নেশায় টলছিল, ও আকাশকে মারার চেষ্টা করেও কিচ্ছু করতে পারল না। আকাশ এলোপাথাড়ি চড়, ঘুঁষি মেরে আধমরা করে ফেলল ওকে।

— 'আকাশ কি করছ? এত মেরো না, ও তো মরে যাবে!'

— 'না স্মৃতি, সকাল থেকে অনেক বাঁদরামি করেছে ও, এত সহজে তো ওকে ছাড়ছি না আমি! তোমায় রাস্তার মেয়ে বলেছে!'

মারতে মারতে আকাশ স্মৃতির পায়ের কাছে এনে ফেলল অনিমেষকে। মার খেয়ে অনিমেষের চোখে মুখে কালসিটে পড়ে গেছে, ধুঁকছে ও কোনোরকমে।

— 'যাকে এতক্ষণ ধরে নোংরা নোংরা কথা বলছিলি, সে তোর বৌদি। এক্ষুণি পায়ে ধরে ক্ষমা চা স্মৃতির, ও যদি ক্ষমা করে, তবেই তোকে ছেড়ে দেব আমি, নইলে এখান থেকে তোর লাশ যাবে!'

কোনোরকমে ধুঁকতে ধুঁকতে অনিমেষ বলল, 'আমায় ক্ষমা করে দাও বৌদি, খুব ভুল হয়ে গেছে আমার!'

আকাশ এবার চুলের মুঠি ধরে অনিমেষকে তুলল, 'শোন ব্রো, তুই এতক্ষণ যা যা বললি, সব রেকর্ড হয়ে গেছে আমার ফোনে, এটা গিয়ে থানায় জমা দিলে প্রমীলা ব্যানার্জী থাকবে গরাদের ওপারে, সাথে কাহিনী চৌধুরীও। আর হ্যাঁ, আমি আর স্মৃতি ডিভোর্স পেপারে সই করেছি ঠিকই, তবে ভ্যানিশিং কালিতে।' বাঁকা হাসি হাসল আকাশ।

হোটেলের ম্যানেজারকে ফোন করে সবটা বলল আকাশ, ম্যানেজারবাবুই পুলিশ ডাকলেন। পুলিশ এসে টানতে টানতে নিয়ে গেল অনিমেষকে। ও.সি.কে রেকর্ডিংটা শোনাল আকাশ।

— 'বুঝতে পারছেন তো স্যার, এসবের পেছনে মাস্টারমাইন্ডটা কে? প্রমীলা ব্যানার্জীকে এখন আপনি কোথায় পাবেন সেটাও বলে দিচ্ছি আপনাকে।' ব্যানার্জীবাড়ির ঠিকানা দিল আকাশ পুলিশকে।

— 'প্রকাশ ব্যানার্জী, আপনি যার কথায় ওঠাবসা করেন, যাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন, তাকেই যখন পুলিশ টানতে টানতে নিয়ে আসবে থানায়, আপনার মুখটা কেমন হবে সেটাই শুধু ভাবছি!' নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল আকাশ।

সেদিন বাড়ি ফিরতে যথেষ্ট দেরি হল আকাশ আর স্মৃতির। বাড়ি ফিরে সবে ফ্রেশ হয়েছে খেতে বসেছে দুজন, হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল আকাশের৷ ফোনটা হাতে নিয়ে ও দেখে, সায়নী ফোন করেছে।

— 'আমি জানি আপনারা কি বলবেন, কিন্তু আমি এটাই বলব পুলিশ কাউকে বিনা দোষে অ্যারেস্ট করে না বুঝলেন ম্যাডাম! আপনার প্রিয় মেয়ে কাহিনী প্রমীলা চৌধুরীর প্ল্যানে জড়িয়ে ছিল, তাই প্রমীলা চৌধুরীর সাথে তাকেও পুলিশ কোমরে দড়ি পরিয়ে নিয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। তাই এর জন্য আবার আমার স্ত্রীকে দোষারোপ করবেন না দয়া করে!'

— 'না আকাশ, আমি শিউলিকে আজ বিন্দুমাত্রও দোষারোপ করব না বিশ্বাস করো! আমি জানি আজ সব দোষ আমার মেয়েরই, রেকর্ডিংটা আমরা সবাই শুনেছি। তোমায় একটা অন্য কারণে ফোন করেছিলাম আমি।'

— 'যাক, ফাইনালি আপনি মেয়ের স্বরূপ চিনেছেন!'

— 'হ্যাঁ আকাশ, যা বলেছ!' সায়নী কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'যেদিন শিউলিকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলাম আমরা, আমি ওর গালে চড় মেরে বলেছিলাম, তোর জায়গায় কাহিনী থাকলে কখনো এমন অন্যায় করত না, কিন্তু আজ ভাগ্যের পরিহাস দেখো! আমার নিজের মেয়েই এমন কাজ করল যে....'

— 'বুঝলাম। তা ফোন করার কারণ?'

— 'আকাশ, চৌধুরীরা এক সময় জমিদার ছিল, আজও এই পরিবারের কথা গোটা শহর জানে, অন্যতম বনেদী পরিবার হিসেবে সুনামও আছে, তা তো তুমি জানোই। এই বাড়িতে কখনো পুলিশ আসবে কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি, নিউজ চ্যানেল গুলোও এই খবরটা রসিয়ে রসিয়ে শোনাচ্ছে জানো!'

— 'হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনাদের পরিবারের ঠুনকো সম্মানের কথা আমি ভালোই জানি, তা ফোনটা করলেন কেন?'

— 'আকাশ আমি তোমার দুই পায়ে পড়ছি, কাহিনীর ওপর থেকে সব অভিযোগ তোমরা তুলে নাও প্লিজ! বাবার বয়স হয়েছে তুমি তো জানোই, উনি এসব সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আকাশ! কাহিনীকে যদি ছাড়িয়ে না আনতে পারি আমরা হয়ত মানুষটাকে বাঁচাতে পারব না, প্লিজ আকাশ! তুমি আর শিউলি প্লিজ ওর ওপর থেকে সব অভিযোগ তুলে নাও!'

— 'বাহ ম্যাডাম, বাহ! এরকমই একটা রাতে স্মৃতিকে বাড়ি থেকে মেরে বের করে দিয়েছিলেন আপনারা একদিন, মনে পড়ে? স্মৃতি সেদিন আপনাকে প্রশ্ন করেছিল, ওর জায়গায় কাহিনী থাকলে আপনি কি করবেন, আপনি কোনো উত্তর না দিয়ে ওকে মেরেছিলেন, মনে পড়ে? উত্তরটা আমি দিচ্ছি শুনুন, ওর জায়গায় যদি আপনার প্রিয় মেয়ে থাকত, তাহলে খুব বেশি হলে একটু বকাঝকা করেই মাফ করে দিতেন, কারণ হাজার হোক সে আপনাদের নামী চৌধুরী বাড়ির ছোটমেয়ে। কিন্তু স্মৃতিকে সেদিন বেরিয়ে আসতে হয়েছিল শুধু আশ্রিতা বলে। আচ্ছা সেদিন যদি রাস্তায় কোনো বিপদ হত আমাদের? সেসব ভেবেছিলেন একবারও? ভাবেননি, উলটে ওকে তাড়িয়ে দিয়ে আরাম করে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আপনি ভাবলেন কি করে, আমি আপনাদের আজ সাহায্য করব? আমি হিয়াকে বের করে আনি, তারপর আবার সে স্মৃতির বিপদের কারণ হোক, তাই না?'

— 'না আকাশ, ও বাড়ি ফিরলে আর ওকে শিউলির ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেব না, বিশ্বাস করো!' ব্যাকুল কন্ঠে বলে ওঠে সায়নী।


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : চত্বারিংশ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ