Advertisement

কাহিনী (ত্রয়োত্রিংশ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ত্রয়োত্রিংশ পর্ব



আকাশ আর স্মৃতি একে অপরের হাত ধরে বিভাগীয় প্রধানের ঘরের দিকে গেল। স্মৃতি কিছুতেই ঢুকতে চাইছিল না, ও বলল, 'আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি, তুমি ভেতরে যাও।' 

কিন্তু আকাশ কিছুতেই ওর হাত ছাড়ল না, ও বলল, ''আমরা যদি অন্যায় করেই থাকি, তাহলে আমরা দুজনেই সমান দোষী। তাহলে লজ্জা শুধু তোমাকেই কেন পেতে হবে? তুমি মেয়ে বলে?'

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


বিভাগীয় প্রধান অনিকেত কাঞ্জিলাল ওদের দেখেই ভীষণ বিরক্তির চোখে তাকালেন, বললেন, 'নিউজপেপারগুলো পড়েছ আকাশ? দ্যাট ওয়াজ নট এক্সপেক্টেড ফ্রম ইউ!'

— 'স্যার, নিউজপেপারে ছাপানো সব খবরই কি সত্যি হয়? ভুয়ো খবরও তো অনেকসময় রংচং মাখিয়ে পরিবেশন করা হয় পাবলিক খাবে বলে, এটাও সেরকমই অতিরঞ্জিত একটা খবর স্যার।'

— 'হুম সেই, আর তাই জন্যই তো ও বিয়ের আগেই! যাক যে, এসব ব্যাপারে কথা বলতেও আমার বাধছে। আর ওকে কেন নিয়ে এসেছ তুমি?'

— স্যার, আমি তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম যে আমি আর স্মৃতি, মানে শিউলি অন্যায় করেছি, কিন্তু তাই বলে একজন স্টুডেন্টকে ক্লাস করতে দেওয়া হবেনা? বের করে দেওয়া হবে ক্লাস থেকে? শিক্ষার অধিকার তো সবারই আছে, তাই না স্যার?'

— 'হুম নিশ্চয়ই, ওর যেমন ক্লাস করার অধিকার আছে তেমন যিনি ক্লাস নেন তাঁরও অধিকার আছে ক্লাসের পরিবেশটা যাতে নষ্ট না হয়, একজন স্টুডেন্টকে স্বেচ্ছাচার করতে দেখে বাকিরাও যাতে সাহস না পেয়ে যায় সে চেষ্টা করতে, তাই না?'

আকাশ আর স্মৃতির গালদুটো ভিজে গেল। এবার মুখ খুলল স্মৃতি, 'আমি যদি আপনার মেয়ে হতাম স্যার, তাহলেও কি একই কথা বলতেন?'

— 'জাস্ট শাট আপ!' গর্জে উঠলেন অনিকেত, 'তোমার ভাগ্য খুব ভালো যে তুমি আমার মেয়ে নও, যদি আমার মেয়ে এরকম কাজ করত তাকে আমি গলা টিপে মেরে ফেলতাম বুঝলে! আর এখানে কথা হচ্ছে দুজন টিচারের মধ্যে, তুমি একজন স্টুডেন্ট হয়ে কোন সাহসে এখানে এলে? বেরিয়ে যাও এক্ষুণি!'

আকাশ স্মৃতির হাতটা শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করল, কিন্তু সফল হল না, ওর হাত ছাড়িয়ে বেরিয়ে গেল শিউলি।


চোখের জল মুছে রক্তিম চোখে আকাশ বলল, 'মেয়েটা জীবনে কষ্ট ছাড়া আর কিছুই পায়নি স্যার, আপনি এভাবে ওকে না বললেই পারতেন। ডাক্তারবাবু বলেছেন ওকে যত্নে রাখতে, যাতে স্ট্রেসড না হয় খেয়াল রাখতে, কিন্তু কলেজে এসে থেকেই....'

— 'শোনো আকাশ, তোমাদের দুজনেরই ভাগ্য খুব ভালো যে ওকে এখনো টি.সি. দিইনি আমরা! কিন্তু প্লিজ ওকে আর কলেজে নিয়ে এসো না! অ্যাটেনডেন্স দিয়ে দেওয়া হবে ওকে, আর এক্সামের সময় ও আসতে পারবে, বাট দয়া করে রোজকার ক্লাসে আর নিয়ে এসো না তুমি!'

স্মৃতি বাইরে থেকে সবটাই শুনছিল। কান্নায় ভেঙে পড়ল ও।

— 'বাহ্ স্যার, ভালো বিধান দিলেন আপনি! স্মৃতি কলেজে আসতে পারবে না, কিন্তু আমি রেগুলার আসব, ক্লাসও নেব, আমার ক্ষেত্রে কোনো বাউন্ডারি নেই, তাই তো?'

— 'দেখো আকাশ, তোমার মতো একজন ভালো টিচারকে এই কলেজ হারাতে চায় না, সামনের মাসেই পরীক্ষা, তুমি না এলে স্টুডেন্টদেরও তো লস হবে বলো?'

— 'সেই স্যার, আসলে মানসম্মান যাওয়ার ব্যাপারটাও স্টেটাস, জেন্ডার, প্রয়োজন এগুলোর হিসেবে ভ্যারি করে! তাই তো গোল্ড মেডেলিস্ট হয়েও স্মৃতিকে কলেজ থেকে বেরিয়ে যেতে হয়, আর দিপুর মতো স্টুডেন্ট বারবার ফেল করেও, মেয়েদের হ্যারাস করেও দিব্বি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় কলেজ ক্যাম্পাসে! ধন্য আপনি স্যার, আর আপনার এই সমাজ!'

আকাশ আর দাঁড়াল না, বেরিয়ে চলে এল ঘর থেকে।

    

স্মৃতি মাটিতে বসে হাউহাউ করে কাঁদছিল। আকাশ তাড়াতাড়ি ছুটল সেদিকে। স্মৃতির হাতে তখনও কাগজটা ধরা। আকাশ কাগজটা ওর হাত থেকে নিয়েই ছিঁড়ে কুচিয়ে ফেলল, তারপর উড়িয়ে দিল।

— 'আর কতদিন আকাশ? আর কতদিন আমায় চরিত্রহীনার তকমা দেওয়া হবে? আমি ক্লান্ত আকাশ, ভীষণ ক্লান্ত! আর পারছি না আমি!'

আকাশ স্মৃতিকে বুকে টেনে নিল, শক্ত করে ওকে জড়িয়ে রইল।

— 'সবকিছু হল শুধু আমার জন্য স্মৃতি! সেদিন যদি তোমায় ফেস্টে আসার জন্য জোর না করতাম এসব কিচ্ছু হত না। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, আমি মরে যাই, কিন্তু তাহলে যে সবাই তোমায় ছিঁড়ে খাবে, সেই ভেবে সুইসাইডও....'

— 'আকাশ প্লিজ! আমার এই জীবনে কাছের মানুষ বলতে তুমি ছাড়া আর কে আছে বলো?'


ওদের পাশ দিয়ে হিয়া সহ বাকি স্টুডেন্টরা হেঁটে গেল বাঁকা হেসে, কিন্তু ওরা লক্ষ্যই করল না সেসব। একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে রইল দুজনে।


বেশ কিছুক্ষণ পরে যখন আকাশ আর স্মৃতি সামলে নিল নিজেদের, আকাশ বলল, 'এখানে আর এক মিনিটও থাকার দরকার নেই, চলো তোমায় বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।'

আকাশ আর স্মৃতি গাড়িতে উঠল। আকাশ ড্রাইভ করতে লাগল, আর স্মৃতি নীরবে বসে রইল ওর পাশে৷ আসলে কিছু পরিস্থিতিতে কথা বলার চেয়ে নীরব থাকাটাই উপযুক্ত।


গাড়ি চলতে লাগল। স্মৃতি আকাশের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। অদূরেই বাজছিল গানটা,


কতবার তোর আয়না ভেঙে চুরে,

ঘুরে তাকাই

আমার মতে তোর মতন কেউ নেই।

কতবার তোর কাঁচা আলোয় ভিজে,

গান শোনাই

আমার মতে তোর মতন কেউ নেই।


আকাশ স্মৃতির ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে শ্লেষের হাসি হাসল।


স্মৃতিকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েই আকাশ চলল নিউজ চ্যানেলের অফিসে। অফিসের সকলে বেশ আনন্দিত হল ওকে দেখে।

— 'আসুন আসুন স্যার, আপনার ইন্টারভিউটাও খুব শিগগিরই নেব ভেবেছিলাম।'

— 'হ্যাঁ সে আর আমার জানতে বাকি নেই, তাই আপনাদের আর কষ্ট দিলাম না, নিজেই চলে এলাম অফিসে। তা সবার আগে এটা বলুন তো, এত সুন্দর রঙচঙে একখানা খবর পেলেন কোথায়?'

— 'সরি স্যার, এটা কনফিডেনসিয়াল।'

— 'ওকে ওকে, বলতে হবে না আর! যে জানিয়েছিল, তার নাম কাহিনী চৌধুরী, ঠিক বললাম?'

সকলের নীরবতা সায় দিল আকাশের কথাকে।


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : চতুর্ত্রিংশ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ