কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দ্বাত্রিংশ পর্ব
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
রুমকিকে গতকাল যখন আকাশ ফোনে জানাচ্ছিল কথাটা, ও ভীষণই খুশি হল, বলল, 'যাক, বোনটা আমার আবার স্বাভাবিক জীবন পেল, এবার মন দিয়ে পড়াশুনা করতে পারবে আবার।'
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কথাটা অভিজিতের কানে গেল, আর সাথে সাথেই সে জানিয়ে দিল হিয়াকে। খবরটা পাওয়া মাত্রই রেগে কাঁপতে লাগল হিয়া, আর মোবাইল থেকে একটা নম্বর ডায়াল করল।
স্মৃতি আর আকাশ যখন বেরোতে যাচ্ছিল, স্বর্ণালী ডাকলেন।
— 'আমার গাড়িটা তো আছে, ওতেই তোমরা কলেজ যাও। স্মৃতিকে এই সময় বাসে ট্রামে না নিয়ে যাওয়াই ভালো, এমনিতেই ডাক্তারবাবু ওকে সাবধানে থাকতে বলেছেন।'
— 'কিন্তু মামণি, তুমি তাহলে কলেজ যাবে কিসে?'
— 'আমার কটাদিন ছুটি আছে কলেজ। আর যখন খুলবে, তখন আমিও ওই গাড়িতেই যাব। এমনিতেই তোমাদের কলেজটা তো আমার কলেজ যাওয়ার রাস্তাতেই পড়ে, অসুবিধা হবে না কোনো।'
— 'আচ্ছা মামণি, আমরা তাহলে আসি?'
— 'সাবধানে এসো।'
আকাশ আর স্মৃতি কলেজ পৌঁছল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে দুজন ক্যাম্পাসে ঢুকতেই সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। স্মৃতি বেশ অবাক হলেও আকাশ এসবে পাত্তা দিল না একদমই, ও স্মৃতির হাত ধরে ওকে নিয়ে চলল সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাসরুমের দিকে। স্মৃতিকে ক্লাসরুমে পৌঁছে দিয়েই আকাশ চলল স্টাফরুমের দিকে।
আকাশ চলে যেতেই সবাই স্মৃতির দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি করতে লাগল। হিয়া বলে উঠল, 'কি রে শিউলি, তুই তো ফেমাস হয়ে গেলি! খবরের কাগজে প্রথম পাতায় তোর নাম আর ছবি দিয়ে হেডলাইন বেরিয়েছে, উফ! ভাবতেই যে কি গর্ব হচ্ছে!'
— 'শুধু কি তাই? সোশ্যাল মিডিয়াতেও তোকে নিয়ে লোকেরা যে মিষ্টি মধুর কথা লিখছে তা আর কি বলব! সত্যি মাইরি, কলেজের মুখটা কি দারুণ উজ্জ্বলই না করলি তুই!' হিয়ার একজন চামচে বলে উঠল।
— 'মানে? কি বলতে চাইছিস তোরা?'
— 'কেন? আমরা কেন বলতে যাব? নিজের মোবাইল তো আছে, তাতেই দেখে নে!'
স্মৃতি বেঞ্চে বসে সবে মোবাইলটা বের করতে যাবে, অমনি ক্লাসটিচার বন্দিতা ম্যাম ক্লাসে এলেন। বাধ্য হয়েই মোবাইলটা সাইলেন্ট করে ব্যাগে ভরে রাখল স্মৃতি।
বন্দিতা ম্যাম নিজের চেয়ারে এসে বসতেই তাঁর চোখ গেল ফার্স্ট বেঞ্চের দিকে, আর সেদিকে তাকিয়েই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন তিনি।
— 'এই মেয়ে, তুমি এত নির্লজ্জ? নিজে তো নষ্ট হয়েই গেছ সাথে এই কলেজটার মানসম্মান পর্যন্ত ধুলোয় মিশিয়েছ, তারপরেও আশ মেটেনি? আজ আবার চলে এসেছ কলেজে আমাদের সবার মুখে চুনকালি লেপে দিতে?'
— 'কিন্তু ম্যাম আমি কি করেছি....'
— 'এতকিছুর পরেও এটা জিজ্ঞেস করছ তুমি? কি করোনি সেটাই বলো! এতদিন আমরা সকলে তোমায় ভালোবাসতাম, তোমায় শান্তশিষ্ট পড়াশুনায় ভালো একজন স্টুডেন্ট হিসেবে ভাবতাম, কিন্তু আজ তো দেখছি একদম উলটো তুমি!'
— 'ম্যাম আমি...'
— 'যাস্ট শাট আপ শিউলি নস্কর!'
— 'ম্যাম আপনি একটু ভুল করছেন', হিয়া টোন কাটল, 'এখন তো আর নস্কর নয়, এ.বি. স্যারকে বিয়ে করে ও শিউলি ব্যানার্জী হয়েছে, না রে শিউলি?'
— 'ভুল বলছিস কাহিনী', অন্য একজন বাঁকা হেসে বলল, 'এ.বি. স্যার তো ওকে স্মৃতি বলে ডাকেন, সেই হিসেবে ওর নাম স্মৃতি ব্যানার্জী!'
— 'এনাফ ইজ এনাফ!' গর্জন করে উঠলেন বন্দিতা ম্যাম, 'ওর নাম যা ই হোক, এই ক্লাসে আমি আর একমুহূর্তও টলারেট করতে পারছি না ওকে! শিউলি শোনো, হয় তুমি এই মুহূর্তে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাবে, নইলে আমিই বেরিয়ে যাব ক্লাস থেকে, এবার তুমি ঠিক করো কি করবে!'
স্মৃতির চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল, সেই জল মুছে নিয়ে রক্তিম চোখে ও বলল, 'আপনি কেন যাবেন ম্যাম? আমিই বেরিয়ে যাচ্ছি, শুধু একবার যদি আমার অন্যায়টা কি সেটা জানতে পারতাম....'
বন্দিতা ম্যাম নিজের ব্যাগ খুলে খবরের কাগজটা বের করে ছুড়ে দিলেন স্মৃতির দিকে, 'এটা দেখে নাও!'
তাড়াতাড়ি কাগজটা খুলে দেখল স্মৃতি। কাগজের প্রথম পাতাটা খুলেই ও বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। ওর আর আকাশের বড়ো বড়ো ছবি দেওয়া, আর হেডলাইনে লেখা, 'জে.পি.দত্ত মেমোরিয়াল কলেজে শিক্ষক-ছাত্রীর অবৈধ সম্পর্কের জেরে অন্তঃসত্ত্বা ছাত্রী।'
— 'হেডলাইন পড়ে নিয়েছ? এবার বেরিয়ে যাও ক্লাস থেকে! কাহিনী যেদিন গ্রুপে শেয়ার করেছিল তোমার রিপোর্ট, আমরা কেউই গুরুত্ব দিইনি, ভেবেছিলাম কারোর ব্যক্তিগত জীবনে আমরা টিচাররা মাথা ঘামাব না, কিন্তু কিভাবে জানব এসবের জন্য আকাশ দায়ী? শুধু তুমিই না, আমরা আকাশের বিরুদ্ধেও স্টেপ নেব। ছি ছি, শিক্ষক আর ছাত্রীর মধ্যে একটা পবিত্র সম্পর্ক থাকে, সেটা তোমরা এইভাবে নষ্ট করলে? ছি!'
স্মৃতি আর দাঁড়াল না, ও ছুটে বেরিয়ে গেল ক্লাস থেকে কাঁদতে কাঁদতে। ও যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিল, ও মুখোমুখি হয়ে গেল আকাশের।
— 'এ কি স্মৃতি, কোথায় যাচ্ছ তুমি? এখন বন্দিতাদির ক্লাস না?'
স্মৃতি নীরবে দাঁড়িয়ে রইল, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল।
— 'তুমি কাঁদছ কেন স্মৃতি? নিশ্চয়ই কেউ কিছু বলেছে তোমায়, কে বলেছে শুধু তার নামটা একবার বলো, তারপর আমি তাকে দেখে নিচ্ছি।'
— 'আকাশ প্লিজ পাগলামো কোরো না, এটা তোমার কাজের জায়গা। এখানে কাউকে উল্টোপাল্টা কিছু বললে তোমার চাকরি নিয়ে টানাটানি হতে পারে, সেটা একটু বোঝো!'
— 'আমার কিচ্ছু বোঝার নেই স্মৃতি। আমার কাজ, কেরিয়ার তোমার চেয়ে বড়ো নয় যে ওগুলোর জন্য তোমায় অসম্মান, কষ্টের সাথে কম্প্রোমাইজ করতে হবে। বাই দ্য ওয়ে, তোমার হাতে ওটা কি স্মৃতি?'
স্মৃতির হাত থেকে কাগজটা নিয়ে আকাশ প্রথম পাতাটা খুলল। সম্পূর্ণ আর্টিকেলটা পড়েই আকাশ ভীষণ রেগে গেল, ও বলল, 'আর এইজন্যই বন্দিতাদি তোমায় ক্লাস থেকে বের করে দিয়েছে, তাই তো?'
স্মৃতি কিছু বলল না, কিন্তু ওর জলে ভেজা চোখদুটো সায় দিল আকাশের কথায়।
আকাশ স্মৃতির হাতটা ধরল, 'চলো স্মৃতি।'
— 'প্লিজ আকাশ, আমি ক্লাসরুমে আর যাব না, গেলেই আবার সেই.….'
— 'না স্মৃতি, ক্লাসরুমে নয়, অন্য জায়গায় যাব আমরা, চলো।'

0 মন্তব্যসমূহ