কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
একত্রিংশ পর্ব
— 'আর কাহিনী চৌধুরী নয়, শিউলি নস্করও নয়, আজ থেকে তুমি সবার কাছে স্মৃতি ব্যানার্জী, বুঝলে?' আকাশ হাসল।
— 'একদম গো আকাশ', রুমকি বলল, 'যে বাড়ির মানুষেরা ওকে এত অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে, সেই বাড়ির মেয়ে কাহিনী চৌধুরীর পরিচয়ের কোনো দরকার নেই তোর। আর বোন, মনোরমা মাসি তোকে সন্তানের মতোই ভালোবাসত, তবুও শিউলি নস্কর তো আসলে অন্য একজন আলাদা মানুষ, তার পরিচয়েই বা কেন বাঁচবি তুই? তাই আজ থেকে তুই না কাহিনী, আর না শিউলি, অনলি স্মৃতি, স্মৃতি ব্যানার্জী।'
— 'একদম গো আকাশ', রুমকি বলল, 'যে বাড়ির মানুষেরা ওকে এত অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে, সেই বাড়ির মেয়ে কাহিনী চৌধুরীর পরিচয়ের কোনো দরকার নেই তোর। আর বোন, মনোরমা মাসি তোকে সন্তানের মতোই ভালোবাসত, তবুও শিউলি নস্কর তো আসলে অন্য একজন আলাদা মানুষ, তার পরিচয়েই বা কেন বাঁচবি তুই? তাই আজ থেকে তুই না কাহিনী, আর না শিউলি, অনলি স্মৃতি, স্মৃতি ব্যানার্জী।'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'হ্যাঁ আন্টি, এসে থেকেই ওঁকে দেখছি, কিন্তু চিনলাম না।'
— 'উনি আমার বিশেষ বন্ধু আকাশ', হাসলেন স্বর্ণালী, 'আমি যে কলেজে পড়াই সেই কলেজেই উনিও পড়ান, ওনার নাম ড. সঞ্জয় ঘোষাল। আমি বলতেই উনি এককথায় রাজি হয়ে গেলেন উইটনেস হতে।'
— 'কি যে বলো তুমি স্বর্ণ', হাসলেন সঞ্জয়, 'তুমি কখনও কিছু চেয়েছ আমার কাছে আর আমি তোমায় দিইনি এরকম হয়েছে কখনো?'
আকাশ প্রণাম করল স্বর্ণালী আর সঞ্জয়কে। স্মৃতিও প্রণাম করতে গেল কিন্তু স্বর্ণালী আটকালেন।
— 'এই অবস্থায় এত ঝোঁকাঝুঁকি করতে নেই মা, আমরা তোমায় এমনিই আশীর্বাদ করছি।'
স্মৃতির মনটা খুশিতে ভরে উঠল। ও বলে উঠল, 'আন্টি, তুমি একদম মায়ের মতো গো।'
স্বর্ণালীর চোখদুটো ভরে উঠল আনন্দাশ্রুতে, তিনি স্মৃতির কপালে চুম্বন করে বলে উঠলেন, 'মায়ের মতো ভাবো যখন, তাহলে আর আন্টি বলে ডাকা কেন? মামণি বললেই পারো।'
— 'বেশ, আমি আর আকাশ আজ থেকে তোমায় মামণি বলেই ডাকব।'
বিয়ের পর জমিয়ে খাওয়াদাওয়া হল একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে। সবাই পেটপুরে খেলেও রুমকি সেভাবে খেল না, খুব সামান্য খেয়েই ও উঠে পড়ল।
— 'কাহিনী রে, এবার ফিরতে হবে রে আমায়, নইলে খুব দেরি হয়ে যাবে।'
— 'মানেটা কি? তুমি এখনই চলে যাবে? মোটেই না।
— 'ছেলেমানুষি করে না বোন, তোর জিজু একটু পরেই বাড়ি ফিরে আসবে, ফিরে এসে আমায় দেখতে না পেলে....' রুমকি ঢোক গিলল।
— 'কি করবে অভিজিৎদা তোমায় দেখতে না পেলে? কি লুকোচ্ছ বলো তো তুমি রুমকিদি?'
— 'ধুস', রুমকি স্বাভাবিক হওয়ার ভান করল, 'লুকোবো আবার কি, তোর জিজু বাড়ি ফিরেই আমার হাতের কফি খেতে চায়, আমি না গেলে কে ওকে কফিটা করে দেবে শুনি?'
— 'ওহ, এই ব্যাপার',আকাশ হাসল, 'আমি ওনাকে ফোনে বলে দিচ্ছি সবটা বুঝিয়ে।'
— 'না না আকাশ একদম না!' রুমকি সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল, 'তুমি বা কাহিনী ভুলেও ওকে ফোন করবে না!'
— 'কেন? কি হবে?'
— 'আরে বাবা, আমি এক্ষুণি ফিরব তো কাহিনী, আবার ফোনটোনের কি দরকার?'
রুমকি আর দাঁড়াল না, গটগট করে হেঁটে চলে গেল ও।
— 'রুমকিদি, শোনো।'
স্মৃতিও উঠে পড়ল টেবিল ছেড়ে, সাথে উঠল আকাশও।
— 'দেখলে আকাশ, রুমকিদিকে দেখলে?'
— 'হ্যাঁ স্মৃতি, রুমকিদির আচরণ মোটেই স্বাভাবিক মনে হল না। নিশ্চয়ই ওই বাড়িতে সমস্যা আছে কিছু।'
— 'হ্যাঁ গো আকাশ, বিয়ের পর রুমকিদি একদম ভালো নেই, এটুকু বুঝেছি আমি। আচ্ছা আকাশ', একটু থেমে স্মৃতি বলল, 'চলো না আকাশ, একদিন না বলেই আমরা রুমকিদির শ্বশুরবাড়িতে চলে যাই, ওদের সবাইকে হাতেনাতে ধরি!'
— 'একদম না স্মৃতি! তুমি প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর থেকেই অনেক ধকল যাচ্ছে তোমার ওপর দিয়ে, যে যখন পারছে ইনসাল্ট করছে, আমি চাইনা তুমি আর এমন কোথাও যাও যেখানে তোমায় অপমানিত হতে হবে! দরকার হলে আমি যাব স্মৃতি, কিন্তু তুমি নও, একদম না।'
— 'আচ্ছা বেশ, কবে যাবে তুমি?'
— 'ব্যস্ত হোয়োনা স্মৃতি, আমি ঠিকই যাব, আগে তো আমাদের সংসারটা একটু গুছিয়ে নিই, তোমার জীবনটা আবার আগের মতোই স্বাভাবিক করে তুলি, তারপরেই।' স্মৃতির গালে হাত রেখে বলল আকাশ।
— 'আচ্ছা বেশ।' প্রেমমাখা হাসি হাসল স্মৃতি।
সেদিনের রাতটা খুব আনন্দেই কাটল আকাশ আর স্মৃতির। আগের রাতের ঘটনাটা ওদের কাছে একটা দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই মনে হল না।
পরেরদিন সকালে আকাশ যখন রেডি হচ্ছিল, স্মৃতি সেখানে এসে হাজির। ও বলল, 'একি আকাশ, তুমি একা যাচ্ছ যে! আমায় সাথে নেবে না?'
— 'না স্মৃতি, গত পরশুই হিয়া তোমার প্রেগন্যান্সির রিপোর্টটা কলেজের গ্রুপে ছড়িয়েছে, এই অবস্থায় তুমি কলেজ গেলে....'
— 'কিন্তু আকাশ, আমাদের তো বিয়ে হয়ে গেছে, এখন আর কিসের কথা?'
— 'স্মৃতি, তোমার অভিজ্ঞতা যথেষ্ট হয়েছে ঠিকই, তবু তো বয়সটা খুবই কম, আর একজন সরল মানুষ তুমি, তাই এই সমাজের অনেক জটিলতা আজও তোমার কাছে বোধগম্যতার বাইরে। যারা শুধুই সুযোগ খোঁজে অন্যের গায়ে কাদা ছোড়ার, তোমার কপালের সিঁদুর এত সহজে তাদের চুপ করাতে পারবে না। আর আমি চাই না ভরা ক্লাসে তোমায় বিনা দোষে অপমানিত হতে হোক। আর তাছাড়া প্রপার রেস্টেরও দরকার তোমার, তুমি এক সপ্তাহ কলেজ যেও না, আমি মেডিকেল সার্টিফিকেট জমা দিয়ে দেব,ওকে? আর পড়া যেটুকু মিস হবে তার জন্য তো আমি রইলামই।' স্মৃতির কপালে স্নেহচুম্বন করে রওনা দিচ্ছিল আকাশ, হঠাৎ কি মনে করে আবার ফিরে এল ও।
— 'ও হ্যাঁ স্মৃতি, আজ কিন্তু একটু লেট হবে আমার ফিরতে, ভাড়া বাড়ি খুঁজতে যাব ফেরার পথে।'
— 'কেন আকাশ?' হঠাৎ স্বর্ণালীর প্রবেশ সেখানে, 'আমি কি এতটাই খারাপ মানুষ যে আমার সাথে এক ছাদের তলায় থাকা যায় না?'
— 'এমা ছি ছি মামণি, কি বলছ তুমি? আসলে তোমারও তো বয়স হচ্ছে বলো, দুজন মানুষের জন্য শুধু শুধু কত ব্যতিব্যস্ত হতে হচ্ছে বলো তো তোমায়!'
— 'আকাশ, আমার কোনো সন্তান নেই জানো। তোমাদের পেয়ে ভেবেছিলাম শূন্য বুকের জ্বালাটা একটু জুড়োবে, কিন্তু না, তোমরা তো আমাকে পর ভাবো! বেশ, চলেই যাও তোমরা, আমি তো তোমাদের মায়ের মতো, নিজের মা তো নই বলো, কেন শুনবে আমার কথা?'
আকাশ আর স্মৃতির অন্য কোথাও যাওয়া আর হল না, স্বর্ণালীর ফ্ল্যাটেই রয়ে গেল দুটিতে।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : দ্বাত্রিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ