কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ত্রিংশ পর্ব

রাতের অন্ধকার কেটে ভোরের আলো ফুটল। মুখে রোদ এসে পড়ায় ঘুম ভেঙে গেল আকাশের। ও ওয়াচের দিকে তাকিয়ে দেখে, ছ'টা বাজে। শিউলি তখনও ঘুমোচ্ছে। ওকে ডাকতে ইচ্ছে হল না আকাশের, তবুও আর তো কোনো উপায় নেই, অ্যাপার্টমেন্টের কেউ ওদের দেখে নিলেই অন্য ঝামেলায় পড়তে হবে দুজনকে।
শিউলির ঘুম ভাঙছিল না, আকাশের ডাকে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল ও।
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'শিউলি, এবার আমাদের যেতে হবে এখন থেকে। আগে কিছু খেয়ে নাও তুমি, তারপর বেলা বাড়লেই আগে রেজিস্ট্রি অফিস যাব।'
— 'আচ্ছা, চলো।'
আকাশ আর শিউলি রওনা দিতে যাবে হঠাৎ শোনা গেল এক নারীকণ্ঠ, 'রেজিস্ট্রি ম্যারেজে তো উইটনেস লাগবে, আছে তোমাদের উইটনেস?'
আকাশ আর শিউলি ভীষণ অবাক হয়ে ঘুরে তাকিয়ে দেখে, একজন প্রৌঢ়া দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে চশমা, পরনে সাদা শাড়ী, ডানহাতে ঘড়ি, আর মুখে হালকা হাসি। আকাশেরা কি জবাব দেবে ভেবে পায়না, ইনি সঠিক কথাই তো বলেছেন।
আকাশ কিছু বলার আগেই তিনি বললেন, 'আমি এই অ্যাপার্টমেন্টেই থাকি। তোমাদের তো দেখে মনে হচ্ছে ভালো করে খাওয়া, ঘুম কোনোটাই হয়নি। আগে এসো তো, আমার ফ্ল্যাটে বসবে এসো, তারপর যা কথা বলার বলবে।'
আকাশ আর শিউলি সেই ভদ্রমহিলার সাথে চলল তাঁর ফ্ল্যাটের দিকে। ফ্ল্যাটটা চারতলায়, শিউলির এই অবস্থায় সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হবে বলে ওরা লিফটে উঠল চারতলায়, তারপর ভদ্রমহিলা নিয়ে এলেন ওদের তাঁর ফ্ল্যাটে।
— 'সকাল সকাল একটু চা না খেলে হয় নাকি? এই কাবেরী, তিনটে চা কর তো, দুটো দুধ-চা আর একটা লিকার চা। এই রে, আমার তো জানাই হল না, স্মৃতি, তুমি দুধ-চা খাও তো? আকাশ দুধ-চা খেতে ভালোবাসে আমি জানি, তাই আর জিজ্ঞেস করিনি।'
— 'ওয়েট, আপনি জানলেন কিভাবে আন্টি?' আকাশ অবাক হয়ে প্ৰশ্ন করল।
— 'সব জানবে আকাশ, অত তাড়া কিসের?' রহস্যময় হাসি হাসলেন ভদ্রমহিলা, 'স্মৃতি, তুমি কিন্তু বললে না!'
— 'আমার দুধ-চা, লিকার-চা সব চলে আন্টি।' শিউলি হাসল, 'আর আমার নাম শিউলি, আন্টি, স্মৃতি নয়, আকাশ স্মৃতি বলে ডাকে।'
— 'ওহ', হেসে উঠলেন ভদ্রমহিলা, 'স্মৃতি নামটাই কিন্তু বেশি ভালো লাগল আমার, তা আকাশ, তোমার হবু বৌকে যদি আমি স্মৃতি বলে ডাকি, আপত্তি নেই তো তোমার?'
— 'একদমই নেই আন্টি।' হেসে উঠল আকাশ, সাথে যোগ দিল শিউলিও।
শিউলিকে অনেকদিন পর মন খুলে হাসতে দেখে মনটা ভরে গেল আকাশের। ও মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল ওর প্রিয়াকে।
কিন্তু আকাশের এই খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। শিউলির জ্বরটা আবার এল হঠাৎ।
— 'সবে কাল জ্বরটা ছেড়েছে, তার ওপর সারারাত বাইরে কেটেছে ওর, ঝোড়ো হাওয়া লেগেছে গায়ে, জ্বর তো আসবেই আন্টি!' চিন্তিত মুখে বলল আকাশ।
— 'তুমি অত চিন্তা করছ কেন আকাশ? আমি তো আছি নাকি!'
ভদ্রমহিলা ডাক্তার ডেকে আনলেন। তিনি ভদ্রমহিলার পূর্বপরিচিত। শিউলিকে ভালোভাবে চেকাপ করে ওষুধ লিখে দিলেন তিনি। আকাশ দেরি না করে বেরিয়ে পড়ল ওষুধগুলো আনতে।
সন্ধ্যের দিকে অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠল শিউলি।
— 'স্মৃতি ম্যাডাম তো দেখছি প্রায় সুস্থ', হেসে বললেন ভদ্রমহিলা, 'তাহলে আকাশ, কালকেই রেজিস্ট্রি ম্যারেজটা সেরে নেওয়া যাক। দুজন উইটনেস তো আমি জোগাড় করেই নিয়েছি, তৃতীয় জনকে তোমরাই জোগাড় করে নাও।'
— 'অলরেডি ডান আন্টি।' হেসে বলল আকাশ।
— 'মানে? তুমি কাকে জোগাড় করলে আবার? কই আমায় বলোনি তো?' স্মৃতি প্রশ্ন করল।
— 'কিছু জিনিস সারপ্রাইজ থাকুক, বুঝলে?' আকাশ হাসল।
— 'কিন্তু আন্টি, এতক্ষণ আপনার ফ্ল্যাটে আছি, আপনার নামটাই তো জানা হল না!'
— 'আমার নাম স্বর্ণালী, স্বর্ণালী মৈত্র।'
আকাশ হঠাৎ করেই যেন চমকে উঠল। বহুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া একটা চেনা নামের সাথে এই নামটার যে বড্ড মিল! সেই নামটা স্বর্ণালী ছিল না, ছিল সোনালি। তবু নামের অর্থটা তো একই, উচ্চারণও অনেকটা একরকম।
কোনোরকমে সামলে নিল আকাশ নিজেকে। এখন ওর স্মৃতি আর ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার সময়, পুরোনো অতীতকে আঁকড়ে বসে থাকার সময় নয়।
পরেরদিন রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে স্মৃতি দেখে, স্বর্ণালী আর একজন ভদ্রলোক বসে আছেন, আর আরেক পাশে বসে আছে রুমকি।
স্মৃতি কিছু না বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসল।
— 'কি ম্যাডাম, কেমন লাগল এই আকাশের এই সারপ্রাইজ?' মুচকি হাসল আকাশ।
— 'সত্যি আকাশ, তুমি পারোও বটে। কখন আবার রুমকিদির সাথে কথাও বলে নিয়েছ আমার চোখ এড়িয়ে!'
কিন্তু রুমকির দিকে তাকিয়েই শিউলির সব হাসি উবে গেল। এ কি চেহারা হয়েছে রুমকির! চোখের তলায় কালি, চুলগুলো উস্কোখুস্কো, বেশ রোগাও হয়ে গেছে ও, গাল বসে গেছে, আর হাতে গলায় কালসিটের দাগ। রোগা শরীরটা ভারী গয়না আর শাড়িটা যেন অনেক কষ্টে বহন করছে।
শিউলি ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে গেল রুমকির দিকে।
— 'নিজের কি অবস্থা করেছ তুমি রুমকিদি? তোমায় দেখে মনে হচ্ছে কতদিন তুমি ঠিক ভাবে খাও না, ঘুমোও না! কি হয়েছে বলো তো তোমার রুমকিদি? ওই বাড়িতে ঠিক আছো তো তুমি?'
— 'আহ্ কাহিনী, আজ তোদের জীবনে একটা স্পেশাল দিন, আমার মতো একটা সামান্য মানুষকে নিয়ে এত যে কেন ভাবছিস, উফ! আকাশ', আকাশের দিকে ফিরে বলল রুমকি, 'যাই বলো, লাল বেনারসিতে আমার বোনটাকে যা মানিয়েছে না কি বলব! শাড়িটা নিশ্চয়ই তোমার পছন্দের, না?'
আকাশ কিছু না বলে সলজ্জ হাসল।
— 'রুমকিদি, তুমি কিন্তু এড়িয়ে যাচ্ছ আমার কথাগুলো!'
— 'একদম চুপ!' রুমকি শিউলিকে নিয়ে গিয়ে আকাশের পাশে বসাল, 'এক্ষুণি উকিলবাবু এলেন বলে, চুপচাপ বোস তো এখন।'
একটু পরেই উকিল এলেন। প্রথমে মালাবদল হল শিউলি আর আকাশের, তারপর আকাশ পরম যত্নে সিঁথি রাঙিয়ে দিল শিউলির। এরপর আইনিভাবে বিয়েটাও সম্পন্ন হল ওদের।
0 মন্তব্যসমূহ