কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ঊনত্রিংশ পর্ব
আকাশ আর শিউলি সামান্য কিছু খেল। এখন অনেকটা ভালো আছে শিউলি, তাই উঠে বসল ও বিছানায়। যদিও আকাশ ওকে শুয়ে থাকতেই বলছিল বারবার, কিন্তু শিউলি আপত্তি জানাল, 'এতক্ষণ তো শুয়েই ছিলাম, এবার তো একটু বসি!'
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
অন্যদিকে প্রমীলা সেদিন রাত পর্যন্ত নিজের ঘরে পায়চারি করছিল। চৌধুরীবাড়িতে কি কি ঘটেছে তা ওর অজানা ছিল না হিয়ার বদান্যতায়, ও হিয়ার সাথে প্ল্যান আঁটছিল চ্যাটে, হঠাৎ ওর কানে এল বিকাশদের ঘরটা থেকে কথাবার্তার শব্দ আসছে। ওর ঘরের জানালা থেকে বিকাশের ঘরটা দেখা যায়।
জানলার পর্দাটা সরিয়েই প্রমীলা অবাক হয়ে গেল।
— 'বিকাশরা তো দশটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে, আজ রাত সাড়ে বারোটা বেজে গেল, এখনও আলো জ্বলছে? ব্যাপারটা তো স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না মোটেও! কেউ এসেছে নাকি ওদের ঘরে? কথা বলার শব্দও তো পাচ্ছি!'
আকাশের বুকে মাথা রেখে শিউলি ঘুমিয়ে পড়েছিল, আকাশের চোখটাও সবে লেগেছিল, হঠাৎ করেই চেনা গলার আওয়াজে চমকে জেগে উঠল ওরা। প্রথমে আকাশ জেগে উঠল, তারপর আকাশের নড়াচড়া শিউলিকেও জাগিয়ে দিল।
— 'দেখো প্রকাশ, তোমার গুণধর ছেলের কান্ড দেখো! একটা নষ্ট মেয়েছেলে, কার না কার সাথে শুয়ে আজ প্রেগন্যান্ট হয়েছে, আর তাকে নিয়ে তোমার ছেলে কেমন আদিখ্যেতা করছে!' মুখ বেঁকিয়ে বলল প্রমীলা।
— 'মুখে লাগাম দাও তুমি প্রমীলা ব্যানার্জী!' গর্জে উঠল আকাশ, 'এতদিন আমার নামে মিথ্যে বলে বাবার অনেক ব্রেন ওয়াশ করেছ, কিচ্ছু বলিনি, কিন্তু আজ যদি স্মৃতির সম্পর্কে একটাও বাজে কথা আমি শুনেছি, তাহলে ভুলে যাব যে তুমি আমার চেয়ে বয়সে বড়ো!'
— 'ছি ছি আকাশ, আজ কোথায় নেমে গেছ তুমি? মায়ের সাথে কিভাবে কথা বলছ তুমি?' প্রকাশ বলে উঠলেন।
— 'প্লিজ বাবা! আমার কোনোদিন কোনো মা ছিল না, আর ওই মহিলা? উনি আবার কবে আমার মা হলেন?'
প্রকাশ এবার শিউলির দিকে রাগান্বিত চোখে তাকালেন, 'এই রাস্তার মেয়েটাই তোমায় এসব বলতে শিখিয়ে দিয়েছে না? আর তুমিও তেমন আকাশ, ও কেন এসব করছে বুঝছ না? সবটাই টাকার লোভ, খ্যাতির লোভ! আর এই মেয়ে, বোকা ছেলে পেয়ে দিব্যি মাথাটা চিবিয়ে খাচ্ছ না?'
সারাদিন শারীরিক আর মানসিক কষ্টের পর অপমানের তীরগুলো আর সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না শিউলির। ও এবার প্রতিবাদ করল, 'প্লিজ আঙ্কেল! আমার কারোর কোনো টাকাপয়সা, যশ কিচ্ছু চাই না! আমার নিজের যেটুকু যোগ্যতা আছে, তা দিয়েই আমি ওসব অর্জন করে নেব। আর হ্যাঁ, আমি কারোর মাথা চিবিয়ে খাইনি, আকাশ আমাকে ভালোবাসে। যাই হোক, আমি আর এক মুহূর্তও এখানে থাকব না।' একটু থামল শিউলি, আকাশের দিকে তাকিয়ে শ্লেষের হাসি হেসে বলল, 'আকাশ, আমি তাহলে আসি।'
শিউলি এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ওর হাতটা ধরল আর একটা হাত।
— 'এখানে আমারও থাকার ইচ্ছে নেই এক মুহূর্তও স্মৃতি।' আকাশ বলল, 'সত্যি মিস্টার প্রকাশ ব্যানার্জী, ধন্য আপনার মানবিকতা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখুন, রাত একটা বাজে। শুধু রাতটুকুই কাটাতাম আমরা এখানে, ভোরের আলো ফুটলেই আমরা চলে যেতাম। কিন্তু না, আপনার তো বরাবরই বাইরের লোকদের প্রতি বেশি টান, আপন মানুষদের নিয়েই আপনার যত প্রবলেম! ঠিক আছে, আপনি থাকুন আপনার প্রিয় লোকেদের নিয়ে। গুডবাই!'
আকাশ আর শিউলি বেরিয়ে গেল একে অপরের হাত ধরে। প্রকাশ বারবার ডাকলেন আকাশকে ফিরে আসার জন্য, কিন্তু আকাশ ফিরেও তাকাল না।
আকাশ আর শিউলি হাঁটতে লাগল রাতের রাজপথ ধরে। আকাশের কোণে বিদ্যুতের ঝিলিক দিচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরেই, এবার শুরু হল ঝোড়ো হাওয়া।
— 'স্মৃতি, আবহাওয়া যা দেখছি, এক্ষুণি বৃষ্টি আসবে। তোমার সবে জ্বরটা নামল, এখন যদি বৃষ্টিতে ভেজো,আবার জ্বর আসবে!' একটু থেমে আকাশ বলল, 'কোনো হোটেলে যে তোমায় নিয়ে যাব রাতটুকু থাকার জন্য সেও উপায় নেই। বিয়ের প্রমাণপত্র ছাড়া কেউ রুম তো দেবেই না, উল্টে....', দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশ শিউলির হাতদুটো শক্ত করে ধরল, 'আমার জন্য তোমায় অনেক অপমানিত হতে হয়েছে, আর নয়।'
ইতিমধ্যেই বৃষ্টি শুরু হল গুঁড়ি গুঁড়ি। আকাশ আর শিউলি তাড়াতাড়ি একটা অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজে আশ্রয় নিল। এই আশ্রয়টুকুও জুটত না যদি ওয়াচম্যান জেগে থাকত। বৃষ্টির রাতে সেও গভীর ঘুমে মগ্ন, তাই অ্যাপার্টমেন্টের ভেতর ঢুকতে বিশেষ অসুবিধা হল না দুজনের।
শুরু হল কান ফাটানো বজ্রপাত, আর সাথে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টি। শিউলি আকাশের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল, হঠাৎই কোনো এক খারাপ স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল ওর, ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ও।
— 'স্মৃতি, কাঁদছ কেন? আমি তো সবসময় আছি তোমার পাশে।'
— 'আকাশ আসলে আজ সারাদিন যা যা হল সেইসব স্বপ্নে এসেছিল, আর দেখলাম আমি কলেজ যেতেই সবাই ঘিরে ধরেছে আমাকে, আর বলছে....' আর বলতে পারল না শিউলি। গলা বুজে এল ওর।
— 'থাক স্মৃতি, আর কিচ্ছু বলতে হবে না। তোমার এখন বিশ্রামের খুব প্রয়োজন। ঘুমিয়ে পড়ো তুমি, আর একটা কথা জেনো, আকাশ ব্যানার্জী থাকতে কোনো আঁচড় লাগবে না তোমার গায়ে।'
শিউলি চেষ্টা করল ঘুমোতে, কিন্তু পারল না। কান্নায় ভেঙে পড়ল ও।
— 'জোর করে কান্না থামানোর দরকার নেই স্মৃতি, তুমি কাঁদো। অনেক সময় নিজেকে হালকা করাটাও ভীষণ প্রয়োজন হয়ে পড়ে জানো।' আকাশও আর আটকাতে পারল না নিজেকে। স্মৃতিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল ও। মুষলধারে বৃষ্টি ওদের কান্নার আওয়াজকে সকলের কাছ থেকে আড়াল করল নিপুণভাবে। দূর থেকে ভেসে আসছিল রবিঠাকুরের গান,
যেতে যেতে একলা পথে
নিবেছে মোর বাতি।
ঝড় এসেছে, ওরে, এবার
ঝড়কে পেলেম সাথি।
আকাশ-কোণে সর্বনেশে
ক্ষণে ক্ষণে উঠছে হেসে,
প্রলয় আমার কেশে বেশে
করছে মাতামাতি।
একটু পরেই শিউলি ঘুমিয়ে পড়ল কাঁদতে কাঁদতে, কিন্তু ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও আকাশের চোখে ঘুম এল না, ওর চোখে ফুটে উঠল এক আগুন। যারা যারা আজ ওর প্রিয়তমাকে চূড়ান্ত অপমানে শেষ করে দিতে চেয়েছে, তাদের সবাইকে যোগ্য জবাব দেবেই ও।
পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ত্রিংশ পর্ব

0 মন্তব্যসমূহ