কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
অষ্টবিংশ পর্ব
শিউলি লুটিয়ে পড়ল আকাশের বুকে। একেই আজ হসপিটাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ও, তার ওপর এত মারধোর, ঠেলে ফেলে দেওয়ায় একটা ট্রমা তৈরি হয়েছিল শিউলির। ও যখন বুঝতে পারল যে ও পড়ে যায়নি, বরং সুরক্ষিত আছে প্রিয় মানুষটির কাছে, ও ট্রমা থেকে মুক্ত হল, আর কান্নায় ভেঙে পড়ল।
আকাশের চোখও ভিজে গেল। শিউলির একটা বিপদ ও আন্দাজ করেছিল ঠিকই, কিন্তু ও কল্পনাও করেনি যে শিউলিকে এই অবস্থায় দেখবে ও। শিউলিকে শক্ত করে জড়িয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল আকাশ।
____________________________
একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ : পড়ুন
______________________________
— 'আকাশ তুমি? এসো এসো, ভেতরে এসে বসো না।' সায়নী ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
হিয়া প্রমাদ গুনল আকাশকে দেখে, ও তাড়াতাড়ি দিপুকে মেসেজ করে চৌধুরীবাড়িতে চলে আসতে বলল।
দিপু রিপ্লাই করল, 'সরি কাহিনী, ফেস্টের রাতে যা মার খেয়েছিলাম ওই হতচ্ছাড়া আকাশ ব্যানার্জীর কাছে, আজও ভুলিনি। এখনও তবু হাড়গোড় আস্ত আছে, আজ যদি ও বাড়িমুখো হই, তাহলে আর বেঁচে ফিরতে পারব না।'
হিয়া বিড়বিড়িয়ে উঠল, 'অপদার্থ, রাস্কেল কোথাকার!'
— 'কি হল বাবা? দাঁড়িয়ে রইলে কেন? এসো ভেতরে এসো!' ত্রিদিববাবু বললেন।
— 'শাট আপ!' আকাশ রক্তচক্ষুতে তাকিয়ে গর্জন করে উঠল, 'একটা অসুস্থ প্রেগন্যান্ট মেয়েকে রাতে বের দিচ্ছেন, একবার ওর দিকে তাকিয়ে দেখেছেন? কপাল থেকে রক্ত পড়ছে, গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে, এত রাতে এই অবস্থায় ওকে রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া মানে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া! সেই ঠুনকো সম্মান রেখে কাজ কি যে সম্মান বজায় রাখার জন্য অসহায়ের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার করা যায়? আর সেই নরকে আমি এসে বসব এটা কল্পনাই বা করলেন কিভাবে?'
— 'তুমি জানোই না আকাশ', সায়নী বলে উঠল, 'ওর চরিত্র তুমি জানো না! একটা রাজ বখাটে ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে....'
— 'হ্যাঁ স্যার!' হিয়া এগিয়ে এল দ্রুতপায়ে, 'মা একদম ঠিক বলেছে, ও আসলে ওই ফেলু সুদীপ গুছাইতের গার্লফ্রেন্ড, আর ওর সাথেই মিশেই আজ....'
শেষ করতে পারল না হিয়া, তার আগেই ওর গালে নেমে এল আকাশের প্রকান্ড চড়। চড় খেয়েই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল হিয়া।
— 'এই চড়টা মারতে অনেক দেরি করে ফেললাম, ফার্স্ট ক্লাসেই মারা উচিত ছিল আমার! আর শুনুন', আকাশ গর্জন করতে লাগল, 'এই চড়টা শুধু আমি ওর গালে মারিনি, মেরেছি সেই সব মানুষকে, যারা শুধু অন্যায় করেই না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই অন্যায় সাপোর্টও করে।' শিউলির হাতটা শক্ত করে ধরে আকাশ বলল, 'আজ যে অন্যায়টা আপনারা সবাই করলেন, এর ফল খুব শীগগিরই পাবেন। ভুলে যাবেন না karma বলেও একটা বস্তু আছে।'
হিয়ার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল। এই কান্না আসলে অপমানের, পরিকল্পনা অসফল হওয়ার রাগের।
— 'ওই রাস্তার মেয়েটার জন্য তুমি আমাদের মেয়েটাকে মারলে?' কাকলি গর্জে উঠল, 'একদিন ওই মেয়েটার জন্যই তোমার নাক কাটা যাবে সবার কাছে, দেখে নিও।'
— 'ওই যে বললাম, আমার সম্মান আপনাদের মতো পলকা নয়। আর কোনোকিছুই আমার কাছে স্মৃতির থেকে বড় নয়। আর হ্যাঁ হিয়া, গ্রুপে স্মৃতির প্রেগন্যান্সির খবরটা রটিয়ে যে ভুল বার্তা দিয়েছ ওকে ছোট করবে বলে, তার বিরুদ্ধে আমি ব্যবস্থা নেব। ভুলে যেও না, ওই কলেজের শিক্ষকমহলে আমিও আছি। চলো স্মৃতি, এখানে আর এক মুহূর্তও নয়।'
শিউলির হাত ধরে চৌধুরীবাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল আকাশ।
শিউলির আর হাঁটার ক্ষমতা ছিল না, তাই আকাশ বাড়ির কাছেই একটা বাসস্ট্যান্ডে বসাল স্মৃতিকে, নিজেও বসল। আকাশের কাছে যে রুমালটা ছিল, সেটা দিয়েই ও শিউলির কপালের রক্তটা মুছিয়ে দিল খুব সাবধানে, ওর চোখের জলটাও মুছিয়ে দিল ও সস্নেহে।
— 'কিছু খাওয়া হয়নি নিশ্চয়ই? তুমি একটু বোসো লক্ষ্মীটি, আমি নিয়ে আসছি।'
শিউলির বসার ক্ষমতা ছিল না একদমই, তবু মনে জোর রেখে ও বসে রইল কোনোরকমে।
আকাশ একটু পরেই খাবার আর জল নিয়ে এল। সেসব খেয়ে শরীরে একটু জোর পেল শিউলি, বলল, 'কিন্তু আকাশ, তুমি কি করে....'
— 'আমি কি করে সঠিক সময়ে পৌঁছে গেলাম চৌধুরীবাড়িতে, তাই তো? শিউলি, তুমি যখন ফোনটা করলে, তখন আমি ভাড়া বাড়ি খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। তুমি 'রাখছি' বলার পরেই আমি শুনতে পেলাম হিয়া আর মিসেস কাকলি চৌধুরীর গলা। শুনেই আমি আঁচ করলাম, কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে, আর তারপরেই দেখলাম গ্রুপে হিয়ার মেসেজটা। আর কিছু বুঝতে বাকি রইল আমার, সাথে সাথেই রওনা দিলাম চৌধুরীবাড়ির দিকে। তবে স্মৃতি', কিছুক্ষণ নীরব থেকে আকাশ বলল, 'আমি যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও বেশি খারাপ অবস্থায় পেলাম তোমায়।' আকাশের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল।
শিউলি মুছিয়ে দিল আকাশের চোখের জল, তারপর চিন্তিতমুখে বলল, 'আকাশ, এখন তাহলে কোথায় যাব আমরা?'
— 'যেখানে কখনো আমি আর ফিরতে চাই না, আর তোমাকে তো নিয়ে যেতে চাইই না, সেখানেই আবার নিয়ে যেতে হবে তোমায়, এতটাই গুড ফর নাথিং আমি!'
— 'আকাশ নিজেকে দুষছ কেন তুমি?'
— 'তাছাড়া আর কি করব বলতে পারো? আজ তোমার এই অবস্থা তো আমারই জন্য!' শিউলির হাতদুটো ধরে আকাশ বলল, 'ব্যানার্জী বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে তোমায়। ভাড়া বাড়ি একটাও পাইনি আমি, বিয়ের অফিসিয়াল ডকুমেন্ট না দেখে ওরা কিছুতেই ভাড়া দেবে না বলছে। আর রাতটা তো রাস্তায় কাটানো সম্ভব নয় বলো!' দীর্ঘশ্বাস ফেলল আকাশ।
একটা ট্যাক্সি ধরল আকাশ আর শিউলি। রওনা দিল ব্যানার্জীবাড়ির দিকে।
ব্যানার্জীবাড়ির পিছনের গেট দিয়ে ঢুকল ওরা। বাড়ির ভেতর না ঢুকে ওরা কোয়ার্টারে ঢুকল, যেখানে ড্রাইভার বিকাশ থাকে তার পরিবার নিয়ে। শিউলি আর দাঁড়াতে পারল না, জ্ঞান হারাল। আকাশ ব্যস্তসমস্ত হয়ে ওকে তুলে শুইয়ে দিল বিকাশদের বিছানায়।
— 'এত জ্বর গায়ে, আর পারে মানুষটা?' বিকাশের স্ত্রী বনশ্রী বলে উঠল, 'কপালে জলপট্টি দিন, দাদাবাবু। জ্বর সেরে যাবে দেখবেন।'
আকাশ জলপট্টি দিতে লাগল শিউলির কপালে। ও ঘড়িতে দেখল, রাত দশটা বাজে।
প্রায় বারোটা বাজে যখন, আকাশ দেখল, শিউলির জ্বরটা অনেকটা কমেছে। শিউলির কপালের কাটা অংশে ওষুধ লাগিয়ে দিল আকাশ।
— 'দাদাবাবু, কিছুই তো খেলেন না, এবার তো আপনিও অসুস্থ হয়ে পড়বেন! দাঁড়ান আমি খাবার নিয়ে আসি, আপনি খান, দিদিমণিকেও খাইয়ে দিন।' বনশ্রী খাবার নিয়ে আসতে গেল।

0 মন্তব্যসমূহ