Advertisement

কাহিনী (সপ্তবিংশ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
সপ্তবিংশ পর্ব




— 'ছোট, মনে আছে রুমকির বিয়ের দিন কি বলেছিলি তুই আমাকে? শিউলি যদি কখনো এমন কিছু করে যাতে এই বাড়ির মানসম্মান ধুলোয় গড়াগড়ি যায়, তাহলে আমি সেদিন টানতে টানতে ওকে রাস্তায় বের করে দেব, তুই বাধা দিবি না!'

সায়নী গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে রইল নীরবে।

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


— 'ছোটমা, যেদিন আমার মা মারা গিয়েছিল, তুমি বলেছিলে আমি যেন তোমাকেই আমার মা মনে করি। আচ্ছা, আজ যদি কাহিনী থাকত আমার জায়গায়, তুমি কি তখনও বড়মার সাথে সহমত হতে?' গলায় একরাশ যন্ত্রণা নিয়ে জিজ্ঞেস করল শিউলি।

সায়নী দ্রুতপায়ে এগিয়ে এল শিউলির দিকে, তারপরেই এক চড় মারল ওর গালে। চড় খেয়ে হকচকিয়ে গেল শিউলি।

সায়নী রাগীস্বরে বলল, 'কাহিনী আর দিদি আমায় সবসময় বলত, তোর আর আমাদের ক্লাস আর স্ট্যান্ডার্ড নাকি এক নয়, আমি শুনতামই না, রাগ করতাম ওদের কথায়। আজ তার ফল হাতেনাতে পাচ্ছি! মনে আছে একদিন তুই এসে দাবি করেছিলি, তুই নাকি কাহিনী? সেদিন আমি তোকে জবাবটা দিতে পারিনি ঠিকমতো, আজ দিচ্ছি শোন!' শিউলির কাঁধদুটো ধরে ঝাঁকিয়ে সায়নী বলে যেতে লাগল, 'তুই আমার মেয়ে নোস, কখনো হতেই পারিস না! যদি হতিস, তাহলে আজকের দিনটা দেখতে হত না আমাদের!'

— 'সেটাই তো দিদিভাই!' হেমনলিনী দেবী বললেন, 'তোমায় তো আমরা সবাই এই বাড়ির মেয়ের মতোই দেখেছি, কাহিনী দিদিভাই যে কলেজে পড়ে সেই কলেজে তোমাকেও ভর্তি করা হয়েছে, সবাই জানে কাহিনী দিদির মতো তুমিও এবাড়ির মেয়েই, আশ্রিতা নও। এখন ভাবো তো, এই খবরটা যদি বাইরে যায়, তাহলে আমাদের বাড়ির কতটা নাক কাটা যাবে! ছি ছি!' 

— 'সত্যিই, ভাগ্যের কি পরিহাস আমার, বাড়ির মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও আমায় বলা হচ্ছে 'মেয়ের মতো'!' শ্লেষের হাসি হেসে বলল শিউলি।

— 'দেখ রে ছোট, দেখ, সাহসটা কতদূর মেয়ের শুধু দেখ! এতকিছুর পরেও দাবি করছে ও কাহিনী! দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি আমি!' শিউলির চুলের মুঠিটা শক্ত করে ধরল কাকলি।

— 'আমায় হাজার মারধোর অত্যাচার করলেও আজ আমি সত্যিটা জোর গলায় বলবই!' শিউলি বেপরোয়া গলায় বলে উঠল, 'আমি জানি আজই এবাড়িতে আমার শেষ দিন, তাই আজ আর চুপ করে থাকব না আমি! এতদিন অনেক সহ্য করেছি, নিজের বাড়িতে সকলের ফাইফরমাশ খেটেছি, তারপরেও উপরি পাওনা জুটেছে অপমান, তাচ্ছিল্য, আরও কত কি! আজ আবার নতুন তকমা জুটেছে চরিত্রহীনা! আর মা, সরি ছোটমা, ঈশ্বর জানেন আমিই কাহিনী চৌধুরী, চাইলে এতদিনে হয়ত প্রমাণ করেও দিতাম, কেন দিইনি জানো? কারণ আমিই চাইনা নিজেকে চৌধুরীবাড়ির মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিতে, শিউলি নস্কর পরিচয়টা আমার কাছে অনেক সম্মানের।' কাকলির দিকে ফিরে শিউলি বলল, 'তোমার কি লজ্জা করবে আমায় এবাড়ির মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিতে, আমারই বরং লজ্জা করে তোমায় আমার বড়মা হিসেবে পরিচয় দিতে!'

কাকলি আরও জোরে চুলের মুঠিটা ধরল শিউলির। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠল শিউলি।

সায়নী হাত তুলল আবার শিউলিকে চড় মারবে বলে, কিন্তু শিউলির চোখদুটো দেখে ওর হাত আর উঠল না।

— 'কি হল ছোটমা? থামলে কেন? মারো আমায়! আর শুধু চড় কেন? রান্নাঘরে যে বড়ো ছুরিটা আছে ওটা নিয়ে এসো, আমার বুকে আমূল বসিয়ে দাও ছুরিটা! যে মা নিজের সন্তানকে চিনে নিতে পারে না এতদিন চোখের সামনে দেখেও, সে যদি নিজের সন্তানকে মেরেও ফেলে, কেউ অবাক হবে না গো!'

— 'দিদি, ওকে আর এক মুহূর্তও টলারেট করতে পারছি না আমি, ও এতটাই লোভী যে এখনও পর্যন্ত আমার মেয়ে বলে দাবি করেছে চলেছে নিজেকে!' সায়নী রাগীস্বরে গর্জে উঠল, 'তুমি যদি এই মুহূর্তে ওকে এই বাড়ি থেকে বের না করে দাও, তাহলে আমিই বেরিয়ে যাব এই বাড়ি থেকে।'

— 'বালাই ষাট! তুই এই বাড়ির ছোটবৌ, তুই কেন বেরিয়ে যাবি? যাবে তো এই ভিখিরির বাচ্চাটা!'

— 'তুই আমার জায়গা নিতে চাস? দেখ শিউলি, লোভ করতে করতে আজ নিজেকে কোথায় নামিয়ে এনেছিস! আজ তুই বাড়ি থেকে বেরোবি, কাল কলেজ থেকে বেরোবি, পরশু এই সোসাইটি থেকেও সবাই তাড়াবে তোকে, তারপর কি হবে তোর? হয় গলায় দড়ি দিতে হবে, নয়তো বিষ খেতে হবে! তুই যা হাড় হাভাতে, হয়তো বিষটাও কিনতে পারবি না, আমায় বলিস, আমি নিজে পার্সেল করে দেব তোকে!' শিউলির গালদুটো টিপে বলল হিয়া।

— 'আকাশ থাকতে তোমার মনের ইচ্ছে কোনোদিনও পূরণ হবে না, জেনে রেখো!' শিউলি বলল।

— 'কি নাম বললি তুই? এই কাহিনী, ও কোন্ আকাশের কথা বলছে? তোদের কলেজের টিচার আকাশ ব্যানার্জী?' সায়নী অবাক গলায় বলে উঠল।

— 'তাছাড়া আবার কি! তুমি তো ওর স্বভাব জানো মা, ভেবেছে স্যারকে সিডিউস করে এক্সট্রা সুযোগ সুবিধা নিয়ে নেবে কলেজ থেকে!'

— 'শিউলি!' গর্জে উঠল সায়নী, 'তোর এত বড় সাহস আমার মেয়ের ভালোবাসা কেড়ে নিতে চাস? যেই শুনেছিস ও আর আকাশ একে অপরকে ভালোবাসে, অমনি ওদের মাঝখানে চলে এলি ওদের জ্বালাতে?'

— 'আমি কারোর মাঝখানে আসিনি মিসেস সায়নী চৌধুরী', শিউলি বলে উঠল, 'আকাশ আর আমি একে অপরকে ভালোবাসি, হিয়া, সরি তোমার প্রিয় কাহিনীই বরং আমাদের মাঝে ঢুকতে চাইছে নির্লজ্জের মতো!'

— 'বাব্বা, কত্ত ডায়লগ রে তোর মাগী!' কাকলি দাঁত কিড়মিড় করে উঠল, 'তা গতরে পিরিতির ফুলটা কে ফোটাল? সত্যি করে বল্ দেখি!'

— 'ও কি বলবে বড়মা, আমি বলছি!' হিয়া দিপু আর শিউলির যে ছবিগুলো তুলেছিল ফেস্টের রাতে, সেগুলো দেখাল, 'এবার বুঝতে পারছ সবাই?'

— 'বলো বলো, যত খুশি মিথ্যে বলো, আমার এই বাড়ির কারোর কাছে কিছু প্রমাণ করার নেই। আমি আর আকাশ সবটা জানি, আর কাউকে বলার প্রয়োজনও বোধ করি না  আমরা।'

— 'কি?' সায়নী অবাক গলায় বলে উঠল, 'তুই বলতে চাইছিস আকাশ....'

— 'কতটা বাড় বেড়েছে দেখ শুধু ছোট! আমাদের হবু জামাইটাকেও ছাড়ল না বাপু!' কাকলি শিউলির চুলের মুঠিটা ধরে সজোরে ঠেলে দিল, 'বেরিয়ে যা শয়তান মেয়েছেলে কোথাকার!'


শিউলি ছিটকে গেল একটা আসবাবের দিকে, ওই আসবাবের কোণে লেগে কপালটা কেটে গেল ওর, রক্ত পড়তে লাগল কপাল বেয়ে। টাল সামলাতে না পেরে ও পড়ে যাচ্ছিল, সঠিক সময়ে আকাশ এসে ধরল ওকে, নইলে ও পড়েই যেত।


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : অষ্টবিংশ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ