Advertisement

কাহিনী (ষড়বিংশ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ষড়বিংশ পর্ব




হিয়া তাড়াতাড়ি রিপোর্টটা লুকিয়ে নিয়ে এল নিজের ঘরে। মোবাইলে রিপোর্টের একটা ছবি তুলে ও পাঠাল দিপুকে, ক্যাপশনে লিখল, 'ইউ আর গ্রেট, দিপুদা! এর জন্য একটা ট্রিট তো তোমার পাওয়াই উচিত।'

মেসেজটা সিন করেই দিপু কল করল হিয়াকে।

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


— 'হ্যাঁ বলো দিপুদা। থ্যাঙ্কিউ সো মাচ গো, এবার দেখো ওই শালা শিউলিকে শুধু চৌধুরীবাড়িই না, আকাশের জীবন থেকেও তাড়াব কেমন!'

— 'হিয়া তুমি কি বলছ কিছুই বুঝতে পারছি না আমি! শিউলির রিপোর্টটা দেখে তো আমি নিজেই ভীষণ অবাক, তুমি আবার আমায় কেন ক্রেডিট দিচ্ছ?'

— 'এই দিপুদা, তুমি আমার কাছে কেন সাধু সাজছ বলো তো? আমায় কিসের ভয় তোমার?'

— 'আরে বাবা, আমি সাধু কেন সাজব? আমি নিজেই তো সত্যিটা শুনে ভীষণই অবাক।'

— 'ম-মানে?' হিয়া ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, 'ফেস্টের রাতে তো তুমি আর তোমার বন্ধুবান্ধবরা কমন রুমে আগে থেকেই লুকিয়ে ছিলে, তারপর শিউলি ঘরে ঢুকতেই ওর মুখ বেঁধে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে তোমরা, আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম।'

— 'হ্যাঁ হিয়া, আমরা ওকে অ্যাটাক করেছিলাম ঠিকই, কিন্তু তারপর কি হয়েছিল তার এক কণাও দেখছি তুমি জানো না!'

— 'জানিনা কারণ তুমি কিছুই বলোনি! কি হয়েছিল তারপর?'

— 'বললে কি আর তুমি আমায় আস্ত রাখতে? গালাগাল দিয়ে ভূত ভাগাতে না?'

— 'এই দিপুদা এই', দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল হিয়া, 'ফালতু না বকে আসল কথাটা বলো তো! কি হয়েছিল সেই রাতে?'

— 'সেই রাতে আকাশ ব্যানার্জী এসেছিল হিয়া, শিউলিকে বাঁচাতে।' সবটা খুলে বলল দিপু।

— 'আকাশ ব্যানার্জী এসে তোমাদের মারল আর তোমরাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খেলে? সেটা আবার জোর গলায় বলছ এখন? তোমার আদৌ স্পাইন আছে তো? নপুংসক কোথাকার, মরণ হয়না কেন তোমার?'

প্রচন্ড রেগে ফোনটা কেটে দিল হিয়া।

ফোনটা কাটার পরেই হিয়া বিড়বিড়িয়ে উঠল, 'একটা ভুল জিনিস ভাবছিলাম এতদিন? শিউলির কোনো সম্মানহানি হয়নি সে রাতে? আর ও প্রেগন্যান্ট বিকজ অফ আকাশ ব্যানার্জী?' রাগের মাথায় দেওয়ালে এক ঘুঁষি মারল হিয়া, 'ইমপসিবল!'

ও কাকলিকে ডেকে আনল তাড়াতাড়ি। সবটা শুনে কাকলি বলে উঠল, 'সে কি কথা গো? ওই আকাশ ব্যানার্জীর সাথেই তো তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে!'

— 'হ্যাঁ বড়মা, আর বিয়েটা হবেও। আকাশ যে আমায় ভালোবাসে না সেটা আমি জানি, এটাও জানি আমাদের বিবাহিত জীবন সুখের হবে না, তবুও আমি আকাশকেই বিয়ে করব, নইলে শিউলির জীবনটা নষ্ট হবে কি ভাবে?'


ও দিপুকে কল ব্যাক করল।

— 'কি ব্যাপার? আগেরবার গালাগাল কম দেওয়া হয়ে গিয়েছিল? তাই আবার কল করলে নাকি?'

— 'একদম বেকার বোকো না বলছি! যেটা বলব সেটা শোনো আগে।'

— 'বলো।'

— 'ওই রাতে যা হয়েছিল সেটা আমায় বলেছ বলেছ, আর কাউকে বলার দরকার নেই, ওকে?'

— 'আচ্ছা, তাই হবে।'

— 'হ্যাঁ, আর যদি এর নড়চড় হয় তাহলে কয়েকটা চুড়ি পার্সেল করে দেব তোমার ঠিকানায়!'

ফোন নামিয়ে রাখল হিয়া।

— 'হিয়া, তোমার প্ল্যানটা ঠিক কি বলো তো?' কাকলি উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল।

হিয়া সবটা বুঝিয়ে বলল কাকলিকে।


অন্যদিকে শিউলি ঘুম ভেঙে ফ্রেশ হয়ে সবে বই খুলেছে পড়তে বসবে বলে, হঠাৎ ও দেখে, প্রেগন্যান্সি রিপোর্টটা বইয়ের ভাঁজে নেই। গোটা ঘর খুঁজেও যখন ও পেল না রিপোর্টটা, ও ফোন করল আকাশকে চিন্তিত হয়ে।

— 'সর্বনাশ, কি বলছ স্মৃতি? তাহলে নিশ্চয়ই বাড়ির কারোর হাতে পড়ে গেছে ওটা!'

— 'না আকাশ, আমার সেটা মনে হয় না। যদি সেটাই হত তবে তো তুলকালাম হয়ে যেত এতক্ষণে, কিন্তু বাড়িতে সকলে তো দিব্যি স্বাভাবিকই আছে দেখছি।'

— 'তাহলে মনে হয় তোমার ঘরেই কোথাও পড়ে গেছে ওটা। এক কাজ করো স্মৃতি, ঘরের দরজাটা বন্ধ করে একটু সাবধানে খুঁজে দেখো ওটা, দরজা খোলা রাখলে আবার কেউ সন্দেহ করতে পারে।'

— 'আচ্ছা, আমি রাখছি তাহলে, কেমন?'

— 'হুম রাখো। আর স্মৃতি, টেক কেয়ার।'

— 'ওক্কে আকাশবাবু, প্রমিস।'


শিউলি ফোনটা রেখে দরজাটা বন্ধ করবে হঠাৎই তীর বেগে ঘরে ঢুকে এল কাকলি আর হিয়া। বাঁকা হেসে হিয়া রিপোর্টটা দেখাল শিউলিকে, 'এটা খুঁজছিলি?'

হিয়ার হাতে রিপোর্টটা দেখে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল শিউলির, মনে হচ্ছিল ও যেন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না।

এগিয়ে এল কাকলি, ক্রূর হেসে বলল, 'এতদিন আমাদের সবার বুকে বসে অনেক স্বেচ্ছাচারিতা করেছিস, কবে থেকে ভাবছি তোকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করব আমি, পারছিলামই না! আজ ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন, আজ তোকে কে বাঁচাবে?'

— 'আর যদি বেঁচেও যাস শিউলি, ওপস সরি সরি কাহিনী চৌধুরী, এজীবনে কলেজ আর কক্ষনো যেতে পারবি না তুই! আমি কলেজের গ্রুপে তোর এই রিপোর্টের ছবি সেন্ড করে দিয়েছি, ওই গ্রুপে শুধু স্টুডেন্টরাই নয়, স্যার ম্যামরাও আছেন! এবার দেখি কিভাবে গোল্ড মেডেল পাস তুই! মেডেল তো পাবি না বরং ফাউ হিসেবে মুখে কালি মেখে ফিরে আসতে পারিস, কি বলো বড়মা?'

— 'হ্যাঁ হ্যাঁ সে আর বলতে!'

— 'হিয়া এসব কেন করলে তুমি? আমি তোমার কবে কি ক্ষতি করেছি যে....' শিউলির গলা বুজে এল কান্নায়।

— 'যাহ বাবা, আমি কি করলাম? করেছিস তো তুই, দারুণ ফুর্তি করেছিস, আর তাই তো আজ! আর এমন ভাবে বলছিস যেন আমি না বললে কেউ কিছু জানতই না কখনো! একদিন না একদিন তো জানতই সবাই, এসব কি চাপা থাকে নাকি আবার?'

— 'আর কোনো বাড়তি কথা নয় হিয়া। আপদটাকে এই মুহূর্তে বাড়ি থেকে টানতে টানতে বের করে দেব আমি!'


কাকলি সজোরে শিউলির চুলের মুঠি ধরল, টানতে টানতে ওকে নিয়ে এল বসার ঘরে। শিউলি ভীষণভাবে চেষ্টা করল  কাকলির থেকে নিজেকে মুক্ত করতে, কিন্তু হিয়া শিউলির হাতদুটো এত শক্ত করে চেপে ধরেছিল যে ও সফল হল না।

বসার ঘরে শিউলিকে নিয়ে এসেই কাকলি চেঁচিয়ে বাড়ির সকলকে জড়ো করল। বাড়ির সকলে আসতেই কাকলি আর হিয়া সবাইকে রিপোর্টটা দেখাল, আর রসিয়ে রসিয়ে সবটা বলল।


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : সপ্তবিংশ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ