Advertisement

কাহিনী (পঞ্চবিংশ পর্ব)

কাহিনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
পঞ্চবিংশ পর্ব




— 'কি? তুমি নিজের পরিচয় ভুলে গেছো আকাশ? তুমি প্রফেসর প্রকাশ ব্যানার্জীর ছেলে, নিজেও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, আর তোমার স্ত্রী হবে একটা কাজের লোক? ছি ছি, কোথায় নেমে গেছে তোমার রুচিবোধ!' রাগীস্বরে বলে উঠলেন প্রকাশ।

— 'তাই তো! চৌধুরীবাড়ির নাম কে না জানে! আমরা শুনে কত খুশি ছিলাম যে ওই বাড়ির মেয়ে ব্যানার্জীবাড়ির বৌ হবে, আর তুমি কিনা!' প্রমীলা বলে উঠল।

____________________________


একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

______________________________


— 'বাবা, আন্টি তোমরা বোধহয় ভুলে গেছো যে শিউলি আর হিয়া, সরি কাহিনী দুজনেই আমার স্টুডেন্ট, আর টিচার এর চোখে তার সব স্টুডেন্টই সমান, আর যদি যোগ্যতার কথাই বলো, তাহলে বলব শিউলি ক্লাস টপার, গোল্ড মেডেলিস্ট, তোমাদের প্রিয় কাহিনী কিন্তু তা নয়, সে সিলভার মেডেলিস্ট। তাহলে ব্যানার্জীবাড়ির বৌ হওয়ার কে বেশি যোগ্য, তা তোমরাই বলো।'

— 'আমার ছেলে হয়ে তুমি যে কিভাবে এত মাথামোটা হলে মাঝে মাঝে সেটাই ভাবি আমি! কাহিনী ওই বাড়ির ছোটমেয়ে, সকলের চোখের মণি, ওর যে বর হবে তাকে ওরা কতটা আদরে আপ্যায়নে রাখবে একবারও ভেবে দেখেছ?'

— 'শুধু কি তাই? চৌধুরীদের অতুল ঐশ্বর্যের অর্ধেক পাবে তুমি, ভাবতে পারছো?' লোভে প্রমীলার চোখ চকচক করতে লাগল।

— 'তাই তো ভাবি, প্রফেসর প্রকাশ ব্যানার্জী এভাবে আমূল বদলে গেল কিভাবে! ভেবেছিলাম তুমি আমাকে বুঝেছ এতদিন পর, কিন্তু না, আমি সম্পূর্ণ উল্টো বুঝেছিলাম!'

— 'আকাশ, ডোন্ট বি ইমোশনাল ফুল! ওসব পেয়ার, মহব্বত দিয়ে জীবন চলে না, জীবন চলে নাম-যশ-প্রতিপত্তি দিয়ে! তোমার জন্মদাত্রী মায়ের মতো ইমম্যাচিয়োর হোয়োনা তো, অসহ্য লাগে আমার!'


এমনিতেই আকাশের মেজাজটা বিগড়ে গিয়েছিল, তার ওপর মায়ের কথা শুনে মাথা গরম হয়ে গেল ওর। ও রাগীস্বরে বলে উঠল, 'সরি বাবা, বিয়ে তো আমি স্মৃতি, মানে শিউলিকেই করব, অনেকদূর এগিয়ে গেছে আমাদের সম্পর্কটা, বাকিটা জীবন আমি ওর সাথেই বাঁচব, তাতে তোমার মত আছে কি নেই আমার জানার দরকার নেই।'

আকাশ গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। চলল হসপিটালের পথে।

সারাটা রাত আকাশ হসপিটালের ওয়েটিং রুমেই কাটিয়ে দিল। সকাল হতেই ওর ঘুম ভাঙল নার্সের ডাকে, 'শিউলি নস্করের বাড়ির লোক কে আছেন?'

আকাশ ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠে পড়ল।

— 'উনি একদম সুস্থ, স্যার আজকেই ডিসচার্জ করে দেবেন ওনাকে।'

— 'সত্যি?'

— 'একদম।'

আকাশের আর তার সয় না, এক রকম ছুটতে ছুটতে গেল ও শিউলির কেবিনের দিকে।

— 'আসুন মিস্টার ব্যানার্জী।' ডাক্তারবাবু হাসিমুখে বললেন, 'আপনার স্ত্রীর তো আর তরই সয় না, যেই শুনেছেন ছুটি হবে, কেবলই জিজ্ঞেস করছেন আকাশ কোথায়।'

— 'এই তো আমি স্মৃতি', আকাশ শক্ত করে শিউলির হাতদুটো ধরল, 'এবার আমরা বাড়ি যাব তো।'


হসপিটাল থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি ভাড়া করল আকাশ, তারপর দুজনে উঠে বসল তাতে।

— 'কি ব্যাপার আকাশ? আজ তুমি গাড়ি নিয়ে এলেনা যে, সব ঠিক আছে তো?'

— 'উফ তুমি না অকারণ চিন্তা করো বড্ড! ডাক্তার যে তোমায় টেনশন নিতে বারণ করলেন, শোনোনি না?'

— 'কথা ঘুরিও না আকাশ। তুমি তো কাল তোমাদের বাড়িতে আমাদের বিয়েটা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিলে, তারপরেই কি ঝামেলা হয়েছে কোনো?'

— 'স্মৃতি, তুমি এখনও পুরোপুরি সুস্থ নও, থাক না এখন এসব!'

— 'তার মানে আঙ্কেল আমায় মেনে নেননি, তাই তো? অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক, উনি হিয়াকে মেনে নিয়েছিলেন চৌধুরীবাড়ির মেয়ে বলে, কিন্তু আমি তো আশ্রিতা মাত্র, আমায় কেন মানবেন উনি?'

— 'স্মৃতি প্লিজ!' আকাশ স্মৃতিকে বুকে টেনে নিয়ে বলল, 'আমি তোমায় ভালোবেসেছিলাম কি বাবার পারমিশন নিয়ে? তাহলে বিয়ে কেন ওনার মতামত নিয়ে করব আমি? আমার জানানো ডিউটি ছিল, জানিয়ে দিয়েছি, ব্যাস, উনি মত দিলেন কি দিলেন না তাতে আমার কিচ্ছু এসে যায়না!' আকাশ বলল, 'তুমি ক'টা দিন চৌধুরীবাড়িতে থাকো স্মৃতি, আমি জানি কষ্ট হবে তোমার, কিন্তু তবু আর যে কোনো উপায় নেই! ততদিনে আমি একটা ভাড়া বাড়ি খুঁজি, পেয়ে গেলেই তোমায় বিয়ে করে সেখানে চলে যাব আমরা, কেমন?'

— 'আকাশ!' স্মৃতির গলায় যেন শোনা গেল এক অজানা ভয়ের সুর, 'তুমি সবসময় আমার পাশে থাকবে তো?'

— 'হাত ছেড়ে দেব বলে তো হাত ধরিনি স্মৃতি।' আকাশ আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল স্মৃতিকে।


এসে গেল চৌধুরীবাড়ি।

— 'স্মৃতি, সাবধানে নেমে এস গাড়ি থেকে। আমার হাতটা ধরো।'

— 'আকাশ, কেন জানিনা ওই বাড়িতে যেতে একদম ইচ্ছে করছে না আমার!'

— 'ভয় পেওনা স্মৃতি। একটা কথা জেনো, আর কেউ থাকুক আর নাই থাকুক, এই আকাশ ব্যানার্জী সবসময় তোমার পাশে থাকবে, প্রমিস।'

শিউলি আকাশের হাতটা ধরে নামল গাড়ি থেকে। বাড়িতে ঢোকার আগে এক অজানা আশঙ্কায় আকাশের হাতটা ছাড়তেই চাইছিল না স্মৃতি।

— 'এভাবে কেউ ভয় পায় বোকা? আমি তোমায় পৌঁছে দিয়েই ভাড়া বাড়ি খুঁজতে যাচ্ছি তো স্মৃতি।'

এইবার শিউলি স্মিত হাসল, 'বেশ, আমি না হয় আর ভয় পাব না, কিন্তু তুমি এখন আগে বাড়ি যাবে, ঠিক করে খাওয়াদাওয়া করে ঘুমিয়ে নেবে, কাল তো এসব কিছুই হয়নি আমি ভালো করেই জানি!'

— 'ওক্কে ম্যাডাম, আপনার আদেশ শিরোধার্য।' হাসিমুখে বিদায় নিল আকাশ।


মনের মধ্যে একটা দ্বিধা নিয়েই চৌধুরীবাড়িতে ঢুকল শিউলি। এমনিতেই খুবই টায়ার্ড ছিল ও, তাই সামান্য কিছু মুখে দিয়েই ঘুমিয়ে পড়ল ও।

  

এদিকে হিয়ার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল শিউলির হসপিটালে ভর্তির কারণটা নিয়ে, তাই শিউলি যখন অঘোরে ঘুমোচ্ছিল, ও চুপিচুপি শিউলির ঘরে ঢুকল, তারপর ঘরের চারিদিক তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল। অনেকক্ষণ খুঁজেও যখন কিছুই পেল না ও, তখন হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছিল, হঠাৎ করেই ওর মনে হল শিউলির বইগুলো একবার দেখা যাক।

যেমন ভাবা তেমনি কাজ। এবার সফল হল হিয়া, টেবিলে রাখা একটা বইয়ের ভাঁজ থেকে ও পেয়ে গেল শিউলির প্রেগন্যান্সি রিপোর্টটা। রিপোর্টটা দেখেই হিয়ার চক্ষুস্থির, 'এ তো দেখি আমায় কিছু করতেই হল না, শিউলি ম্যাডাম নিজেই ব্রহ্মাস্ত্র  তুলে দিলেন আমার হাতে! এবার দেখো সোনা, তোমার কি অবস্থা করি আমি।'


পরবর্তী ভাগ পড়ুন : ষড়বিংশ পর্ব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ